সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ

বাড়াতে হবে ‘ডিজিটাল নজরদারি’

| মঙ্গলবার , ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এখন হয়রানি ও অপরাধের আখড়া হয়ে গেছে। ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস, বিদ্বেষমূলক কথা দিয়ে, ছবি বিকৃত করে, ভুয়া পেজ ও আইডি খুলে আজকাল হরহামেশা অনেককে হয়রানি করা হচ্ছে। অনেকে এসবের কারণে নিপীড়নের শিকারও হচ্ছেন। নিগৃহীত হচ্ছেন সামাজিকভাবে। অনেকের জীবন হুমকির মধ্যে পড়েছে। কারও সম্পর্ক ভাঙছে, ভাঙছে সংসারও। কেবল প্রতিকার পাওয়ার উপায় জানা না থাকায় দিনদিন এসব বেড়েই চলেছে।

বিজ্ঞান প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্টারনেটের কারণে যেমন যোগাযোগ বেড়েছে, তেমনি নানা ধরনের সুবিধা পাচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং এই ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে সেই অনুপাতে সচেতন গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে না। যার কারণে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনেক ব্যবহারকারী জড়িয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধের জালে। বলা যায় সুবিধার পাশাপাশি একইসঙ্গে বাড়ছে সাইবার ক্রাইম, বাড়ছে উদ্বেগ।

সাইবার ক্রাইম নিয়ে গবেষণাকারীরা বলেন, একদল নিজের অজান্তেই সাইবার ক্রাইম করছে। প্রতিহিংসা বা একান্ত কৌতূহলের কারণেই তারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আরেক দল জেনেশুনেই অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে সাইবার ক্রাইম করছে। সাইবার ক্রাইমের কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী নারীরা। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন এর তথ্যানুযায়ী, সাইবার হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীদের ৮০ ভাগের বয়স ১৪ বছর থেকে ২২ বছর। অপরাধের শিকার হয়ে একটি বড় অংশই অভিযোগ করেন না।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ফেসবুক আইডি হ্যাকের শিকার হচ্ছেন অনেকেই। এ ছাড়া ই–মেইল আইডি হ্যাক, ফেক আইডি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল করা, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি ও অন্যান্য হ্যারাসমেন্টের শিকারও হচ্ছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘এ কথা পরিষ্কার যে, ভুক্তভোগীদের বিরাট অংশ বিভিন্ন কারণে আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন না এবং এই আইনের আশ্রয় না নেয়ার কারণে অপরাধী বারবার একই অপরাধ করার সাহস পেয়ে যাচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সমাজে বেড়ে যাচ্ছে সাইবার অপরাধ। এখন সময় এসেছে এই সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়ার। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যে বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা উচিৎ তা হচ্ছে, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। জনসচেতনতা তৈরির কাজে রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি সবার দায় আছে। ভুক্তভোগী চাইলে যিনি হয়রানি করছেন তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় অভিযোগ করতে পারেন, আইসিটি অ্যাক্টে তার বা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা তাকে সুরক্ষা দেবে। অন্যদিকে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিতে অভিযোগ করা যাবে, সমাধান মিলবে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব থেকে রক্ষা পেতে চাইলে সচেতন থাকার কোনও বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধও দ্রুত বেড়ে চলেছে। নিরীহ মানুষ নানা ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছেন। আবার সরকারের বিরুদ্ধেও নানা ষড়যন্ত্র চলছে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে। রটানো হচ্ছে নানা ধরনের গুজব। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক অপরাধ যেমন ঘটছে, তেমনি ছড়ানো হচ্ছে উগ্র সামপ্রদায়িকতা। দিন যত যাচ্ছে এই সাইবার অপরাধ তত বাড়ছে।’ তাঁরা বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক ডিভাইস নেই এবং এ বিষয়ক ল্যাবও তেমন গড়ে ওঠেনি। ফলে সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। কেউ কেউ সন্দেহজনকভাবে গ্রেফতার হলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগীকে আবার হুমকি দিচ্ছে। এ ব্যাপারে অপরাধ দমনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবং অপরাধীদের নিরুৎসাহিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে ‘ডিজিটাল নজরদারি’।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে