চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে উত্তেজনার নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ তিন যুগ পর হতে যাচ্ছে চাকসু নির্বাচন। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শেষ হওয়ার পর ছাত্রদল ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলো মোট ১০টি প্যানেল ঘোষণা করেছে। সেই ঘোষণার পরই পুরো ক্যাম্পাস সরগরম হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা আলোচনা করছেন, প্রার্থীরা তাদের নানান আশ্বাস দিচ্ছেন, আর ভোটের দিন কেমন হতে পারে সেই কৌতুহলও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।
প্যানেল ঘোষণার পর পুরো ক্যাম্পাস সরগরম : মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর এবং প্যানেল ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের মুখে এখন প্রার্থীদের নিয়ে লেডিস ঝুপড়ি, সোস্যাল সাইন্স ঝুপড়ি, স্টেশনসহ সব জায়গায় চলছে প্রার্থীদের নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা। কোন প্রার্থী কেমন কোন প্রার্থীকে নির্বাচন করলে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করবেন, কোন প্যানেলে কে আছেন, কে কোন প্যানেলে নেতৃত্ব দিবেন ক্যাম্পাস জুড়ে এখন আলোচনার বিষয় হচ্ছে চাকসু নির্বাচন। প্রার্থীরা আস্তে আস্তে নিজেদের পরিচিতি জানান দিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সবার সাথে সাক্ষাৎ করতে চেষ্টা করছেন। শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নেওয়া শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এবারের নির্বাচন তাদের জন্য বিশেষ একটা আমেজ ও অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম। তারা চাচ্ছেন নেতারা তাদের সমস্যা সমাধান করবেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে প্রশাসনকে সবসময় চাপে রাখবেন।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা : শিক্ষার্থীদের আশা নির্বাচনের ফলাফলে এমন নেতৃত্ব আসবে যারা শিক্ষার্থীর স্বার্থ রক্ষা করবে, শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং ক্যাম্পাসে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনবে। এবার শুধু পরিচিত নাম বা রাজনৈতিক প্রভাব দেখে ভোট দেওয়া ঠিক হবে না। তারা কার্যকরী ও দায়বদ্ধ নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষা করছেন।
২০২২–২৩ সেশনের শিক্ষার্থী রিফাত আলী বলেন, প্যানেল ঘোষণা হওয়ার পর ক্যাম্পাসে আলোচনার ঢেউ শুরু হয়েছে। আমরা চাই নেতারা শিক্ষার্থীর স্বার্থের জন্য কাজ করবেন। শুধু দৃষ্টান্তমূলক প্রতিশ্রুতি নয়, কাজ করে নিজেদেরকে প্রমাণ করে প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
১৯–২০ সেশনের আরেক শিক্ষার্থী সোহান মিয়া বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে দায়িত্ব নেওয়া। প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের কাছে নানা আশ্বাস দিচ্ছেন। আমাদের লক্ষ্য নেতাদের কার্যকারিতা যাচাই করা। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া ভোট দিবো কি দিবো না। এই নির্বাচন আমাদের জন্য সুযোগ, আমাদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করার এবং শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়নের জন্য। তাই আমাদের ভোট দিবো তাকে যারে দিলে আমাদের শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করবেন।
প্রতিনিধিদের কাছে প্রত্যাশা জানিয়ে ২০–২১ সেশনের নারী শিক্ষার্থী তানজিনা রহমান বলেন, আমাদের মেয়েদের আবাসিক হলগুলো নানান সমস্যায় জর্জরিত। আমরা আমাদের অধিকার আদায় করার মতো তেমন কোনো যোগ্য ছাত্রনেতা পাইনি। যার কারণে আমাদের হলগুলোতে ডাবলার হয়ে থাকতে হয়। হলের পানির সমস্যা, সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নাই। রিডিং রুম ডাইনিং রুমের বাজে অবস্থা। আর প্রতিনিয়ত আমরা মেয়েরা সাইবার বুলিং ও ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছি। এখন যদি আমাদের নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি আসে, হল প্রতিনিধি আসে তারা যেন আমাদের এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। আমাদের এমনটাই প্রত্যাশা।
প্রার্থীদের আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি : প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিচ্ছেন যে তারা নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। কেন্দ্রীয় সংসদ, হল সংসদ এবং বিভিন্ন হোস্টেল সংসদে শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান, শিক্ষামূলক কার্যক্রম উন্নয়ন এবং হলের সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন রিদয় বলেন, আমরা জয় লাভ করলে আমাদের দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করব। আমাদের লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা এবং শিক্ষাঙ্গনকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থার দুর্গতি নিরসন, যাতায়াত ব্যবস্থা সমস্যা সমাধান, শাটলের নানাবিধ সমস্যা সমাধান, ডাইনিংয়ে খাবারে মান উন্নত করা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে যাবতীয় সমস্যা সমাধানে কাজ করবো।
ছাত্রশিবির প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, নির্বাচন মানে শুধু জয়লাভ নয়। আমরা শিক্ষার্থীদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে চাই। ভোটের দিন শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশ করবে, যা আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ভোটে যদি ভিপি হিসেবে জয় অর্জন করি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সর্বোচ্চ কাজ করে যাব। বিশেষ করে সেশন জট নিরসনে কাজ করবো। কোনো শিক্ষার্থী যেন একাডেমিক হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবো। আবাসন সমস্যা, শাটল সমস্যা, হলের ডাইনিং সমস্যা, খাবারের মান উন্নত, রিডিং রুম সংস্কারসহ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কাজে প্রয়োজনীয় বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করবো। শুধু প্রতিশ্রুতি নয় ভিপি হলে আমাদের কাজে প্রমাণ করবো।
‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেলের ভিপি মাহফুজুর রহমান বলেন, আমরা চাকসু নির্বাচনে নেমেছি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। যেমনি ভাবে আমরা ২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সংগ্রাম করেছি। যদি আমাকে শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে ভিপি হিসেবে জয়যুক্ত করে কাজ করার সুযোগ দেয় তাহলে আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করবো। কোনো শিক্ষার্থী যেন একাডেমিক কাজে কোনো ভোগান্তি পোহাতে না হয় সেই ব্যবস্থা করবো। আবাসিক সমস্যা সমাধান, যাতায়াত ব্যবস্থাসহ শিক্ষার্থীদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানে প্রশাসনকে বাধ্য করবো।
বিভিন্ন প্যানেলের কার্যক্রম : এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোট ১০টি প্যানেল অংশগ্রহণ করছে। প্রত্যেকটি প্যানেল তাদের ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নানা কর্মসূচি নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, হলের উন্নয়ন, লাইব্রেরি সুবিধা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম, এই সব বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ছাত্রদল, ছাত্রশিবির প্যানেল বিশেষভাবে জোর দিয়েছে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে। ছাত্রশিবির প্যানেল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে জোর দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। স্বাধীন প্রার্থীরা মূলত শিক্ষার্থীর স্বার্থ ও শিক্ষার মান উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছেন।
ভোটার ও প্রার্থীর অনুপাত : এবারের নির্বাচনে প্রায় ২৭ হাজার ৬ শত ৩৪ জন ভোটার রয়েছেন। বিপরীতে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৯৩১ জন। যদিও মনোনয়ন নিয়েছেন ১ হাজার ১ শত ৬২ জন প্রার্থী। অর্থাৎ, প্রায় একক প্রার্থী প্রতি ২৭ জন ভোটারের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এই সংখ্যাই প্রমাণ করে, এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা তীব্র। সব প্যানেল এবং প্রার্থীরা নিজেদেরকে সেরা প্রমাণ করতে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তুলনামূলক মেয়েদের হলের তুলনায় ছেলেদের হলে প্রার্থী বেশি। প্যানেল এবং প্রার্থী বেশি হওয়ায় ভোট অনেক ভাগাভাগি হবে। যাদের পরিচিতি এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে নির্বাচনের মাঠে তারা এগিয়ে আছেন।
নির্বাচন কমিশনের অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা হবে। ভোটের দিনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহইয়া আখতার এবং উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে চাকসু নির্বাচনের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তারা বলেন, আমরা আশা করি আমরা শিক্ষার্থীদের সুন্দর সুষ্ঠু একটা নির্বাচন উপহার দিতে পারবো।
চাকসু নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব : চাকসু নির্বাচন কেবল একটি শিক্ষার্থী সংগঠনের নির্বাচন নয়। এটি শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। নির্বাচিত নেতৃত্ব ক্যাম্পাসের নানা সমস্যার সমাধান করতে পারে, যেমন হলের সুবিধা, নিরাপত্তা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা। শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থের জন্য কাজ করবেন, শিক্ষাঙ্গনের মান উন্নয়নে উদ্যোগ নেবেন এবং সুষ্ঠু নেতৃত্ব প্রদান করবেন।
নির্বাচনের উত্তেজনা ও ভবিষ্যৎ : প্যানেল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রমাণ করছে শিক্ষার্থীরা পরিবর্তন চায়। শিক্ষার্থীরা কেবল পরিচিত নাম নয় বরং কার্যকরী, দায়বদ্ধ এবং শিক্ষার্থীর স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম নেতৃত্ব চাইছেন। প্রার্থীরা তাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন বলে আশ্বাস দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার, শিক্ষার মান ও ক্যাম্পাসের উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন। নির্বাচন যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে শিক্ষার্থীরা এবার আরও সচেতন, তাদের ভোটের শক্তি কাজে লাগাতে প্রস্তুত এবং প্যানেল ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে যে সরগরম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আগামী নির্বাচনের ফলাফলের দিকে শিক্ষার্থীদের নজর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা, ২৩ সেপ্টেম্বর প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ২৫ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। আগামী ১২ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।











