সমকালের দর্পণ

ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার হস্তক্ষেপ – বিচলিত বিশ্ব

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ১১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ

১৮১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বৃটিশরা আমেরিকার উপর বেপরোয়া বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছিল। এই বোমাবর্ষণের মাঝেও আমেরিকান সেনানিবাস ফোর্ট ম্যাক হেনরীর উপর আমেরিকান পতাকা উড়ছিল। বিষয়টি আইনজীবী কবি ফ্রান্সিস স্কট কি’ কে দারুনভাবে অনুপ্রাণিত করে, এ থেকে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘The Star Spangled Banner’ তারকা খচিত ঝলমলে পতাকা, এই কবিতার শেষ স্তবক ‘Over the land of the free and the home of the brave’ অর্থাৎ মুক্ত এবং সাহসী মানুষের দেশ। ১৯৩১ সালে এসে ‘The Star Spangled Banner’ হয় আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত। ‘Over the land of the free and the home of the brave’ তথা মুক্ত এবং সাহসী মানুষের দেশের যথার্থ প্রতিফলন আমরা দেখি জোরান কোয়ামে মামদানীর নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়া এবং ১ জানুয়ারী ২০২৬ এ তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। পবিত্র কোরান হাতে সিনেটর বার্ণি স্যান্ডার্সের পড়ানো শপথ বাক্য পাঠ আমেরিকা যে মুক্ত মানুষের দেশ তার বলিষ্ঠ উদাহরণ। গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ মামদানীর নির্বাচিত হওয়া তেমনি আরেক উদাহরণ আমেরিকা যে সাহসী মানুষদের দেশ। নিউইয়র্কের ইতিহাসে মামদানী প্রথম মুসলিম এবং ইমিগ্র্যান্ট মেয়র। আমেরিকার মানুষেরা মুক্ত স্বাধীন বলেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অভিবাসী হওয়া মানুষেরা মুক্ত স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করার অবাধ সুযোগ পেয়েছেন। আমেরিকা এ এক মহান অভিনব রূপ।

অন্যদিকে ২০২৬ এর ৩ জানুয়ারি এই আমেরিকারই প্রশাসন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম’এর নেতৃত্বে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার উপর এক কলংকজনক নগ্ন আক্রমণ পরিচালনা করে। এই আক্রমণে তারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে আটক করে তাকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিউইয়র্কের কুখ্যাত ব্রুকলীন কারগারে নিক্ষেপ করে। এ এক অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় ঘটনা। অবশ্য এধরনের আরো একটি ঘটনা আমেরিকানরা ঘটিয়েছিলেন। সেটি ছিল ২০ ডিসেম্বর ১৯৮৯ সালে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের আদেশে আমেরিকানরা ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নাম দিয়ে এক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পানামা’র জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগা’কে গ্রেফতার করে আমেরিকায় নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে আমেরিকার আদালতে জেনারেল নরিয়েগা’র বিচার হয়, সেই বিচারে নরিয়েগাকে ৪০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। কথিত আছে নরিয়েগাকে আমেরিকানরা আটক করে নিয়ে এসেছিল খালের জন্য আর এবার মাদুরো’কে তেলের জন্য। এ কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই মাদুরোকে গ্রেফতারের পরপরই স্বপারিষদ সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম ঘোষণা করেন ভেনেজুয়েলার বিপুল মওজুদ জ্বালানী তেলের উপর আমেরিকার অধিকার রয়েছে। তিনি ঐ সংবাদ সম্মেলনে আরো ঘোষণা করেন আমেরিকা বৃহৎ তেল কোম্পানীগুলি এখন থেকে ভেনেজুয়েলায় অবাধে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

এসবের বাইরে পুরা বিশ্বকে হতবাক করে ঐ সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম আরো ঘোষণা করেন, যতদিন ভেনেজুয়েলায় নতুন সরকার ঘটিত না হবে ততদিন আমেরিকা ভেনেজুয়েলার শাসন ব্যবস্থা চালাবে। একটি সার্বভৌম দেশে উলঙ্গ হামলার পর কি নির্লজ্জ এক ঘোষণা। প্রসঙ্গক্রমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম ভেনেজুয়েলা আক্রমনের পর মনরো ডকট্রিন’এর বিষয়টিও টেনে এনেছেন। মনরো ডকট্রিন’ আসলে কী? পাঠকদের জন্য বিষয়টি তুলে ধরছি। ১৮২৩ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো সেদেশের পররাষ্ট্র নীতি ঘোষণা করতে গিয়ে যে কৌশলের কথা উল্লেখ করেন কালক্রমে সেটিই মনরো ডকট্‌্িরন হিসাবে ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করে। এতে তিনি ঘোষণা করেন ইউরোপিয়ান শক্তি বিশেষ করে স্পেন এবং গ্রেট ব্রিটেন, ল্যাটিন আমেরিকান দেশ গুলি থেকে তারা তাদের ঔপনিবেশিক অধিকার হারিয়েছে বা হারাবে সেখানে পুনরায় আর কখনো উপনিবেশ স্থাপনের প্রয়াস নিতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি তার ডকট্রিনে তিনটি মৌল বিষয় নির্ধারণ করেন। Non-Colonization: The Americas were not open to future colonization by European powers। আমেরিকা মহাদেশ ইউরোপিয় শক্তির উপনিবেশ স্থাপনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না। Separate Spheres: The US and Europe would remain in distinct political systems, with the Americas distinct from the Old World. ইউরোপ এবং আমেরিকা স্ব স্ব রাজনৈতিক বন্দোবস্তে’ পরিচালিত হবে, আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরাতন বিশ্ব তথা ইউরোপ এশিয়া, আফ্রিকার চেয়ে ভিন্নতর।

Non-Interference: The US would not meddle in European internal affairs, and Europe should not interfere in the independent nations of the Western Hemisphere. আমেরিকা ইউরোপের অভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে তেমনি আমেরিকা মহাদেশেও ইউরোপিয়দের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।

মনরো ডকট্রিনে অউপনিবেশ, হস্তক্ষেপ থেকে বিরত এবং ইউরোপ আমেরিকার স্ব স্ব স্বাতন্ত্র্যের কথা বলা হলেও এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনরো ডকট্রিনের দোহাই দিলেও দেখা যাচ্ছে আমেরিকাই এখন হস্তক্ষেপের নির্লজ্জ এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

ভেনেজুয়েলার উপর এই কলংকজনক নগ্ন আক্রমণ পরিচালনা পৃথিবীর অন্যান্য পরাশক্তি গুলিও যদি উদাহরণ হিসাবে ধরে নিয়ে একই পন্থা অবলম্বন করে তখন পৃথিবীময় কী অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে তা অকল্পনীয়। ধরুন রাশিয়া এতদিন যুদ্ধের পর ইউক্রেনের জেলেনস্কি’কে, চীন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গেল তখন কেমন হবে। পৃথিবীতে ন্যায় নীতি আইন কানুন বলে কিছু কি তখন অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয়? প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান বিশ্বকে তেমন একটি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

ইতিপূর্বেও দেখা গেছে আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থি বলে, স্বীয় জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার অভিপ্রায়ে যারা পথ চলার চেষ্টা করেছেন সেই সমস্ত নেতাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিলির সালভেদর আলেন্দে, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুলুম্বা, লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, পাকিস্তানের ইমরান খান, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, শ্রী লংকার রাজাপাকশে, নেপালের কে পি শর্মা ওলি এবং সর্বশেষ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো।

মাদুরো’কে ইতিমধ্যে অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি নিউয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে তার বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাস এবং অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। অভিযোগ গুলি খণ্ডন করলে প্রতিটিই ধোপে টিকে না। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট কিভাবে অবৈধ অস্ত্রের অধিকারী তা অন্য একটি দেশ বিচার করবে এটি একেবারেই হাস্যকর! তার দেশে অর্থাৎ ভেনেজুয়েলায় যে শয়ে শয়ে যুদ্ধ বিমানের হামলা, যত্রতত্র বোমাবর্ষণ, অসংখ্য মানুষ হত্যা এসবের বিচারে আন্তর্জাতিক আইন কানুন এখন কী করবে।

অবশ্য আন্তর্জাতিক বিশ্ব ইতিপূর্বেও আমেরিকার অনেক অন্যায় নির্মম আক্রমণ সয়ে গেছে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য ১৯৪৫ সালের ৬ এবং ৯ আগস্ট জাপানের নাগাসাকি হিরোসিমাতে পারমানবিক বোমা বর্ষণ। ১৯৫০ এ কোরিয়ায় বোমা বর্ষণ, একই সালে চীনে বোমা বর্ষণ। যথাক্রমে ১৯৫৪, ১৯৬০, এবং ১৯৬৭ ৬৯ গুয়েতেমালায় ক্রমাগত বোমাবর্ষণ। ১৯৫৮ ইন্দোনেশিয়ায় নির্বিচার বোমাবর্ষণ। ১৯৫৯১৯৬১ কিউবা আক্রমণ। কঙ্গোয় আক্রমণ পরিচালনা করে ১৯৬৪ সালে সেদেশের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট লুলুম্বাকে হত্যা। লুলুম্বাকে শুধু হত্যাই করা হয়নি তার মৃতদেহকে এসিড ভরা ড্রামে পুরে কঙ্গোর সীমানার বাইরে নিক্ষেপ করা হয়। লাওস এ ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত ক্রমাগত আক্রমণ পরিচালনা, ভিয়েতনাম যুদ্ধে ১৯৬১ থেকে এক নাগাড়ে ১৯৭৩ পর্যন্ত আমেরিকানরা বোমাবর্ষণ করে অবশেষে নিধারুন পরাজয় বরণ করে। কম্বোডিয়ায় ও আমেরিকানরা ১৯৬৯৭০ সালে নির্বিচার বোমা হামলা চালায়। গ্রানাডায় ১৯৮৩, লেবানন, সিরিয়ায় ১৯৮৩৮৪ সাল বোমাবর্ষণ করে। লিবিয়ায় একাক্রমে ১৯৮৬, ২০১১ এবং ২০১৫ সালে আমেরিকানরা বোমা বর্ষণ করে দেশটিকে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে নিয়ে যায়। এভাবেই ১৯৮০ সালে আল সালভেদরে, নিকারাগুয়ায়, ১৯৮৭ এবং ২০২৫ সালে ইরানে, ১৯৮৯ সালে পানামা’য় ১৯৯১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত ইরাকে, ১৯৯৩, ২০০৭৮ এবং ২৯১১ সোমালিায়, ১৯৯৪৯৫ বসনিয়ায়, ১৯৯৮ সুদানে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত আফগানিস্তানে নির্বিচার আক্রমণ, ইয়েমেনে ২০০২, ২০০৯, ২০১১, ২০২৪২৫, পাকিস্তানে ২০০৭ এবং ২০১৫ আমেরিকানরা অবাধে আক্রমণ চালিয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতা ভেনেজুয়েলা।

ভেনেজুয়েলা আক্রমণ পর পরই আমেরিকা সেদেশের জ্বালানী তেল বিক্রি লব্ধ আয়ের হিস্যা দাবী করে বসে আছে, এদেশে সরকার চালানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে পাশাপাশি কিউবা, কলম্বিয়া, গ্রীনল্যান্ডকে হুমকি দিয়ে রেখেছে। প্রয়োজনে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এইসব দেশের বিরুদ্ধেও।

আমেরিকান প্রেসিডেন্টের বেপরোয়া এসব কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক রীতি নীতি, আইন ইত্যাদি শুধু হুমকির মুখেই পড়েনি বরং বিপর্যস্ত হতে চলেছে।

আমেরিকা কর্তৃক ভেনেজুয়েলা আক্রমন, এর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ভেনেজুয়েলানরা স্বশস্ত্র প্রতিবাদের প্রত্যয় ঘোষণা করেছে।

প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন খোদ আমেরিকার নিউইর্য়কের সদ্য নির্বাচিত মেয়র মামদানী। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলা আক্রমণ যে আন্তর্জাতিক আইন কানুনের পরিপন্থি এবং আমেরিকার সংবিধান অন্য একটি সার্বভৌম দেশে আক্রমণ চালানোর মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন যে সমর্থন করে না সে কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন চরম এক নৈরাজ্যের মুখোমুখি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট; সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে বিল্ডিংয়ের কেয়ার টেকারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা