সমকালের দর্পণ

জ্বালানি ব্যবহারে অবরোধ বিরতি এবং জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

এটি এখন প্রতীয়মান যে, ইউক্রেন–রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা–ইউরোপের এবং ইরানে আমেরিকা–ইসরাইলের যুদ্ধ করে আসছে। আর দুটি যুদ্ধ বিশ্বে বর্তমানে নতুন এক প্রেক্ষাপট সৃষ্টির অবকাশ সৃষ্টি করেছে। এটি ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, ভূকৌশল সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

যুদ্ধক্ষেত্রে ‘যুদ্ধবিরতি’ এ পর্যন্ত সামরিক পরিভাষায় একটি প্রচলিত গ্লসারি বা যুদ্ধে সাময়িক বিরতির একটি জানা বিষয় ছিল। এবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এক্ষেত্রে নতুন একটি পরিভাষার জন্ম দিয়েছেন, ‘এনার্জি সিজফায়ার’”। এই ‘এনার্জি সিজফায়ার’–কে বাংলায় ‘জ্বালানি ব্যবহারে অবরোধ বিরতি’, একই সঙ্গে ‘জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি’ হিসেবে ধরে নিয়ে আমাদের আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

প্রথমে আসি, এই জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি কেন এবং কার স্বার্থে। উত্তর একেবারে সোজা ২+২=৪–এর মতো। এই জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি আমেরিকা কর্তৃক আমেরিকার স্বার্থে।

এবার আসি, এই জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি কেন। কারণ আমেরিকা তার দীর্ঘ সামরিক এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায়ও ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালির অবরোধ অবমুক্ত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ক্রমাগত তার স্বার্থ রক্ষায় আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় অবস্থান মজবুত করার জন্য একের পর এক ভূকৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ক। কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালির অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষমতা। খ। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান ঘাঁটিসমূহে ব্যাপক আক্রমণের মাধ্যমে সেগুলো ব্যবহার–অনুপযোগী করা। গ। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান তাঁবেদার সরকারসমূহের মনে আমেরিকান নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা। এবং ঘ। ইয়েমেনের আনসার আল্লাহ হুতিদের বাব আল–মান্দেবের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ আরও অনিশ্চিত করে তোলা।

এ সমস্ত কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তেমনি প্রায় প্রতিদিনই জ্বালানি তেলের দাম চড়া হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কবল থেকে আমেরিকাও নিস্তার পায়নি।

জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি সামনে রেখে আমেরিকায় এই নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ধরাশায়ী হতে চলেছেন। ইতিমধ্যে এটাও পরিলক্ষিত হয়েছে, ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০% আমেরিকান সাধারণ মানুষের অবস্থান। এ অবস্থান নিশ্চিতভাবে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি–জনিত অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের কারণে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। এবং এও অনুধাবন করেছেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধমুক্ত করা, বাব আল–মান্দেব এবং হুতিদের বিষয় তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। সুতরাং জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এর দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে রাশিয়ার কাছে হাত পাতা ছাড়া তাঁর গত্যন্তর নেই।

‘জ্বালানি ব্যবহারে অবরোধ বিরতি’ এবং ‘জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি’ ঘোষণার পরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, “Lower prices for Americans, especially our Great Farmers, Ranchers, and Truckers is my Greatest Priority.” অর্থাৎ আমেরিকানদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্য, বিশেষ করে মহান কৃষক, বৃহৎ খামারি এবং ট্রাকচালকদের জন্য এটি আমার অগ্রাধিকার। এ থেকে প্রমাণিত, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘জ্বালানি ব্যবহারে অবরোধ বিরতি’ ঘটিয়েছেন আমেরিকানদের স্বার্থে, ইউক্রেন বা ইউরোপীয়দের স্বার্থে নয়।

রাশিয়ার সঙ্গে সফল আলোচনার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, “To be honest, we have massive amount of oil coming into our country, and it is diesel which is what we want.” ট্রাম্পের কথা হলো, ‘সত্যি বলতে, আমাদের দেশে প্রচুর জ্বালানি তেল আসছে, এবং এটি ডিজেল, যা আমরা চাচ্ছিলাম।’

রাশিয়ার আমেরিকায় প্রচুর জ্বালানি তেল সরবরাহের মাঝে অনতিবিলম্বে থাকছে ৩০০,০০০ (তিন লক্ষ) মেট্রিক টন, নভেম্বর মাসে ৫০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) মেট্রিক টন, পরবর্তীতে আরও ৪ (চার) মিলিয়ন মেট্রিক টন।

এই জ্বালানি তেললব্ধ অর্থ নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার অর্থনীতিকে যেমন শক্তিশালী করবে, তেমনি যুদ্ধসক্ষমতাকেও বাড়াবে।

আন্তর্জাতিক তথা ভূরাজনীতিতে আমেরিকার এই দ্বিচারিতায় বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমেরিকা ইরানের তেল বিক্রির ওপর দীর্ঘদিন অবরোধ আরোপ করে চলেছে। ইরান–রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর উচ্চ হারে ট্যারিফ আরোপ করে আমেরিকা, আর এখন নিজের বেলায় রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি। এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, কী দুর্ভাগ্য ইউরোপ–ইউক্রেনের! ইউরোপীয়রা ইউক্রেনকে অস্ত্রসহায়তা দিচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে, ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ করছে, আর আমেরিকা এখন সেই রাশিয়াকে জ্বালানি তেল কেনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দিচ্ছে, শক্তিশালী অর্থনীতি আর যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে ইউক্রেন তথা ইউরোপকে কাবু করতে। কী বিচিত্র এই বিশ্ব, সেলুকাস!

আমেরিকার রাশিয়ার জ্বালানি তেল কেনার মাধ্যমে একদিকে ইরানের দিক থেকে সৃষ্ট চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যকে নিয়ন্ত্রণ এই দ্বিবিধ লক্ষ্য কাজ করেছে নিশ্চিতভাবে। এবং এর মাধ্যমে আমেরিকার ওপর বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক চাপ থেকে নিজেকে অবমুক্ত করার প্রয়াসও রয়েছে।

এতদ্‌সত্ত্বেও আমেরিকান একদল সিনেটর (যাঁদের মধ্যে চারজন রিপাবলিকান এবং তিনজন ডেমোক্র্যাট) বলেছেন,

“The deal is a violated US law.” এ জ্বালানি আমদানি চুক্তি আমেরিকান আইনের বরখেলাপ। কারণ আমেরিকান কংগ্রেস “explicitly banned Russian energy imports in 2022 to prevent American dollars from financing Putin’s brutal war against Ukraine.” ইউক্রেনে পুতিনের নির্মম যুদ্ধে আমেরিকান ডলার যেন কোনো ধরনের ইন্ধনের কারণ না হয়, সেই কারণে রাশিয়ান জ্বালানি তেল আমদানির ওপর ২০২২ সালে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এই জ্বালানি আমদানি ইউরোপে আমেরিকার মিত্রদের নিদারুণ বেকায়দায় ফেলেছে। প্রথমত, এই চুক্তি সম্পর্কে মোটেও তারা অবগত ছিল না। ইউক্রেনের একদল আইনপ্রণেতা তাঁদের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, “The United States should not provide Putin with a financial lifeline while Russia continues to kill Ukrainian civilians.” অর্থাৎ আমেরিকার কোনো অবস্থাতেই পুতিনকে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো জীবনীশক্তি জোগানো উচিত হবে না।

কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস্ট স্ট্রিটিং এ চুক্তির সমালোচনা করে বলেছেন, এখন যুদ্ধে কোনো প্রকার ইন্ধন নয়, বরং যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগী হওয়াই উচিত।

ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অনেকটা উপায়ান্তর না পেয়ে বলেছেন, “The deal is a gift to Putin that amounts to an investment in a war that must be ended.” এ চুক্তি পুতিনের জন্য এক মূল্যবান উপহারস্বরূপ। যে যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ হওয়ার কথা, সেখানে এটি একটি বিনিয়োগের মতো। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, তিনি চুক্তির বিস্তারিত জানার অপেক্ষায়। ‘জ্বালানি ব্যবহারে অবরোধ বিরতি’ এবং ‘জ্বালানি ক্ষেত্রের ওপর আক্রমণ বিরতি’ সত্ত্বেও রাশিয়া এখনও ইউক্রেনে অবিরাম আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আমেরিকার বর্তমান দৈনিক ডিজেলের চাহিদা যেখানে গড়ে প্রতিদিন ৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল, সেখানে রাশিয়া থেকে চুক্তি মোতাবেক যে ডিজেল আসবে, তা দিয়ে তার প্রয়োজন কতটুকু মিটবে, সেটি দেখার বিষয়। আর এখানেই প্রশ্ন আসে, আমেরিকা ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় না এসে বরং সময়ক্ষেপণে রত। এটি আমেরিকার অর্থনীতিকে যেমন সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতিকেও এক চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিতে গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম
পরবর্তী নিবন্ধফটিকছড়িতে ব্যাটারি রিকশার ধাক্কায় বাইক আরোহী নিহত