সমকালের দর্পণ

আশা আশঙ্কার মেঘ এখনও জাতির ভাগ্যাকাশে

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ১ মার্চ, ২০২৬ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নির্বাচন অন্তর্ভূক্তিমূলক হয়নি। এটা বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এক নেতিবাচক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ ১৮ মাসেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে পুরা জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরে নিবেদিত থাকতে পারত এটা না করে তারা বরং ক্রমাগত জাতিকে বিভক্তির বিভাজনের পথে ঠেলে দিয়েছেন। এসব করা হয়েছে মবোক্রেসি, গণগ্রেফতার এবং বিচারহীনতার শিকার হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে বন্দি থাকতে বাধ্য করার মাধ্যমে। এ দায়বদ্বতার জবাবদিহির জন্য সচেতন মানুষের কাটগড়ায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে একদিন দাঁড়াতেই হবে। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বি এন পি’ও এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান খুব একটা পরিষ্কার করেনি। হয়ত এটা তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশও হতে পারে। যাই হোক দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে বি এন পি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) ইতিমধ্যে বাংলাদেশে সরকার গঠন করেছে।

মন্ত্রী পরিষদ গঠিত হওয়ার পর দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল ড. খলিলুর রহমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হওয়া। প্রথমত ড. খলিল বি এন পি’র ত্যাগী বা সম্মুখ সারির তেমন কেউ না। দ্বিতীয়ত অন্তর্বর্তী সরকার চলমান থাকা অবস্থায় বি এন পি ড. খলিলের পদত্যাগের জোরালো প্রস্তাব তুলেছিলেন। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে থেকে আবার রাজনৈতিক সরকারে আসার নৈতিকতার প্রশ্নটিও সামনে এনেছেন। তবে এটা ধ্রুব সত্য ড. খলিল পররাষ্ট্র ক্যাডারের একজন চৌকষ অফিসার। তিনি ৭৬ সালের বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে নানা চড়াইউৎরাইয়ের পর তিনি দেশ ছাড়েন, সেই সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

দীর্ঘ সময় পার করে ২০২৪ এ বাংলাদেশে সরকারের পট পরিবর্তনের পর প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে ড. খলিল সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। এই পদে থেকে তিনি সময়ে সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নানা বিষয়ে তার প্রভাব খাটানোর প্রচেষ্টায় রত ছিলেন বলেও ওয়াকিফহাল মহলে এক ধরনের ধারনা প্রচলিত ছিল।

তবে ড. খলিল যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্কে জড়ান এবং সমালোচনার মুখে পড়েন তা হল মায়ানমারের রাখাইন স্টেটে মায়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আরাকান আর্মিকে মানবিক কড়িডোর দেওয়ার প্রস্তাবে এবং আরাকান আর্মি’র সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি প্রকাশ করলে। এটি সংশ্লিষ্ট মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে সেনাপ্রধানও বিষয়টি নিয়ে তার অভিমত তুলে ধরেন। বিষয়টি আলোর মুখ না দেখলেও এ থেকে সৃষ্ট উত্তাপ মায়ানমারের সাথে আমাদের সম্পর্ককে অনেকটা তলানীতে নামিয়ে দেয়।

একইভাবে ভারতীয় পূর্ব অঞ্চল নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের নানা বক্তব্য ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ককে টালমাটাল করে।

গোধের উপর বিষপোড়া যোগ হয়, টি২০ বিশ্বকাপ’কে নিয়ে, এটিও অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য তেমন ইতিবাচক কিছু বয়ে আনেনি বরং বাংলাদেশের উপর আই সি সি তে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে দেখা গেল এক পাকিস্তান ছাড়া অন্য ১৮ দেশ বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট দেয়। এ ভোটাভুটি বহিঃবিশ্বে আমাদের নির্বান্ধবতাকে উলঙ্গভাবে প্রকাশ করে। আরো লজ্জার বিষয় বিসিবি’ সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল পাকিস্তান গিয়ে হাজির হন, পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলতে রাজী করানোর জন্য। অথচ নিজের দেশের খেলার খবর নাই! বিষয়টি যে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ভবিষ্যৎ এ ভোগাবে, এ বিষয়ে আমাদের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার তামিম ইকবাল খান সতর্ক করলে এক ক্রিকেট বোর্ড পরিচালক তামিমকে ভারতীয় দালাল তকমা লাগিয়ে দেয়। সেলুকাস কি বিচিত্র এই ক্রিকেট বোর্ড! যে তামিম ভাঙা এক হাত গলায় ঝুলিয়ে আরেক হাতে ব্যাট করে দলকে জিতান দেশকে জিতান সেই তামিমকে কোথাকার কোন এক খয়ের খাঁ তকমা দেয় ভারতীয় দালাল বলে!

বাস্তবে দেখা যায় বাংলাদেশী কোচ জনাব সালাউদ্দিন’এর ভাষ্য অনুযায়ী ড. আসিফ নজরুল মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমকে টি২০ ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা থেকে বঞ্চিত করেন। এর পিছনে রাজনৈতিক ধর্মীয় উত্তেজনার আশ্রয়ে কোন পক্ষকে লাভবান করে দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করেছে কিনা তাও এখন তদন্ত হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য যাই হোক, সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য বাংলাদেশী কোটি ক্রিকেট ভক্ত মানুষ নিজেদের দলের খেলা দেখে নির্মল এক আনন্দ আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। উল্লেখ্য ১৯৯৮ সালের জুন মাসে প্রথম আইসিসি টি২০ চ্যাম্পিয়নশীপ শুরু হয় এই বাংলাদেশ থেকেই। আরো বেদনার, আরো দুর্ভাগ্যের ইতিপূর্বেও সাকিব মাশরাফিকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন কোন অযোগ্য অর্বাচীন নির্বোধ নোংরামির আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে এসব বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনায় নিতে হবে।

এর মাঝেই সাংসদদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দুটি শপথ গ্রহণের গুজব চাওড় হয়। জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে এর শেষ দেখার। শেষ দৃশ্য হল সাংসদ হিসাবে শপথ গ্রহণের পরপরই বিএনপি ঘোষণা করে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নার্থে দ্বিতীয় কোন শপথ গ্রহণ করবেন না। তাদের কাছে সংসদ সার্বভৌম। অন্য দ্বিতীয় কোন শপথ সংসদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানতে পারে বা সংসদকে খাটো করতে পারে তেমন কোন বিষয়ে তারা জড়াতে রাজী নন। জনাব আলী রিয়াজ চিৎপটাং। এরই মধ্যে আমাদের দেশের আইন পেশার দুইজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহমুদ এবং ড. স্বাধীন মালিক স্পষ্টই বলেছেন, আমাদের সংবিধান এ ধরনের কোন দ্বিতীয় শপথের বিধান বিদ্যমান নাই। এ প্রসঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতির জারী করা অধ্যাদেশেরও কোন আইনগত বৈধতা নাই। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ () বলা আছে কেবল জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন তবে শর্ত হল এই একই অনুচ্ছেদ () তে বলা আছে তিনি এমন কোন অধ্যাদেশ জারি করবেন না ‘যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না’। সুতরাং রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারী করতে পারলেও সংবিধান পরিবর্তন হয় তেমন কোন অধ্যাদেশ তিনি জারী করতে পারেন না। কাজেই সনদের উপর অনুষ্ঠিত গণভোট এবং জুলাই সনদ নিশ্চিতভাবেই একটি জটিল আবর্তে নিপতিত হল। এসব বুঝে শুনেই বিএনপি সংবিধান সংশোধনী পরিষদের দ্বিতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি এটি নিশ্চিত।

আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের মাঝে একধরনের অস্থিরতা এবং ভীতি কাজ করে গেছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান, তা না হলে তারা তড়িঘড়ি আওয়ামী লীগকে যেমন নিষিদ্ধ করেছে, যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের অতি চালাক কিছু মানুষ বলেন নিষিদ্ধ করা হয়নি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে, সে যাই হোক একই দ্রুততার সাথে ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ অপর এক অধ্যাদেশ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) শিরোনামে’ ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ গ্রহণকারীদের দ্বারা সংঘটিত সব ধরনের ফৌজদারী অপরাধ থেকে দায় মুক্তি দেওয়া হয়।

গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ ‘দায়মুক্তি’ এতে বলা হয়েছে এ অধ্যাদেশের অধীনে কোন আদেশ বা নির্দেশ পালন করা কোন কাজের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানি বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোনও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

আমার ইতিপূর্বের লেখা ‘রাজনৈতিক ঘূর্ণাবতে স্বদেশ’ এ আমি আমাদের সংবিধানের নিম্নের অংশটুকু উদ্ধৃত করেছিলাম, গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে পাঠকদের সদয় জ্ঞাতার্থে তা আবারও পুনঃউল্লেখ করছি

সংবিধানের প্রথমভাগ ‘প্রজাতন্ত্র’ অনুচ্ছেদ ৭ এর () এ সংবিধানের প্রাধান্য, বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।

৭ এর () এ বলা হয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনও আইন যদি সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে।

৭ এর ক () এও বলা আছে ‘কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যকোন অসাংবিধানিক পন্থায়।

() এই সংবিধান বা ইহার কোন অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে কিংবা

() এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে

তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে’।

এবার আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগ মৌলিক অধিকার এ কী উল্লেখ আছে দেখা যাক। মৌলিক অধিকারের অনুচ্ছেদ ‘২৬ এর () রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই বিধানের সহিত যতখানি অসমঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।

এরপর ও অনুচ্ছেদ ২৭ কি বলে দেখুন ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী’।

উপরোক্ত পাঠ আমি আমাদের পবিত্র সংবিধান থেকে উদ্ধৃত করলাম। আমার জানামতে যেহেতু আমাদের সংবিধান স্থগিত করা হয়নি সেহেতু এসব বিষয় কীভাবে বিবেচিত হবে তা সংশ্লিষ্ট সবার বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মনে করি। একই সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের জারী করা অধ্যাদেশ সমূহের ব্যাপারে নির্বাচিত সরকারের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকার ঘিরে আমাদের বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং আইন অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার বেশ কিছু সময় একান্তে আলাপের সুযোগ হয় এ বিষয় এবং নতুন সরকারকে ঘিরে আশার কথা পরবর্তী লেখায় আলোচনা করব আশা করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,

সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফিরে আসুক বিনয় ও সম্মান
পরবর্তী নিবন্ধরাউজানে সড়কে মাটি, দুর্ঘটনার শঙ্কা