সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে চট্টগ্রাম

মোঃ আলমগীর নূর | শুক্রবার , ১৭ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক সম্ভাবনার প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই বন্দরনগরী শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। তাই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় ‘সবার আগে চট্টগ্রাম’ উন্নয়নের প্রশ্নটি কোনো আঞ্চলিক আবেগ নয়; বরং এটি একটি অপরিহার্য জাতীয় উন্নয়ন দর্শন ও রাষ্ট্রীয় কৌশল। ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, বীর চট্টগ্রাম সবসময়ই বাংলাদেশের গৌরব ও সংগ্রামের প্রতীক। মহান স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে চট্টগ্রামের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় রাজস্ব আয়, আমদানিরপ্তানি, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম দেশের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। দেশের অর্থনীতির গতিশীলতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবাহ অনেকাংশেই এই বন্দরনগরীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর অবকাঠামোগত উন্নয়নকে নতুন গতি দিয়েছিলেন। সড়ক যোগাযোগ, শিল্প সম্প্রসারণ, বন্দর উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে চট্টগ্রামের টেকসই অগ্রযাত্রার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানও নীতিগতভাবে চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও জনগণের প্রতি আন্তরিকএমন প্রত্যাশা চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের। ‘৩৬ জুলাই’ পটভূমিতে পরিবর্তনের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার সামনে এসেছে, সেখানে আধুনিক ও বিশ্বমানের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তোলাকে সর্বোচ্চ উন্নয়ন অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। তবে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি চট্টগ্রাম এখনও জলাবদ্ধতা, কর্ণফুলী নদীর দূষণ ও দখল, পাহাড় কাটা, পরিবেশ বিপর্যয়, যানজট এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে। অন্যদিকে কর্ণফুলী টানেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বেটার্মিনাল এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো মেগা প্রকল্প চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে চট্টগ্রাম’এই উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়নে চট্টগ্রামের সকল মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র, জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের একটি অভিন্ন উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়ী সমাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদেরও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর চট্টগ্রামের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। কারণ, চট্টগ্রামের উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র অঞ্চলের সম্মিলিত দায়িত্ব ও জাতীয় কর্তব্য। বিশ্বের সফল বন্দরনগরীসিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা সাংহাইয়ের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশাসন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিই একটি নগরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও কর্ণফুলী নদী পুনরুদ্ধার, স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক গণপরিবহন, স্মার্ট লজিস্টিকস ব্যবস্থা, ব্লু ইকোনমির বিকাশ এবং পরিবেশবান্ধব নগরায়ণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সর্বোপরি, আধুনিক বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রাম গড়ে তোলার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম প্রধান এজেন্ডায় পরিণত করতে হবে। বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুসংহত রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে জাতীয় সমৃদ্ধির মূল শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। কারণ, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; বরং তা সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী : মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি
পরবর্তী নিবন্ধনারীর প্রতি সকল বৈষম্য দূর হোক