ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা বাড়ছে। মানুষের নিরাপত্তার শঙ্কা। নিরাপদে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে কিনা। শহীদ ওসমান হাদীর হত্যার পরও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৪০ টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেও ফল আসেনি। সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র ব্যবহার করে নানা রকম অপরাধ সংগঠিত করছে। আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচনের পূর্বে বৈধ অস্ত্র জমা নেয়া হত। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাড়াশি অভিযান পরিচালিত হত। এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি বেশি। বিশাল এক শক্তিশালী রেজিম গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। কিন্তু তাদের অনুসারীরা রয়ে গেছে। তাঁরা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দেশের বাইরে থেকে ও পলাতকরা ষড়যন্ত্র করছে নির্বাচন বানচালের। চট্টগ্রামের রাউজানে ৫ ই আগস্ট পরবর্তীতে এ পর্যন্ত ১৯ জনকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রাম বিএনপি দলীয় প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হয়। ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা দেয়। এই ধরনের নির্দেশনা আগেও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইন শৃঙ্খলার কোনও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও স্থানে খুনের ঘটনা ঘটছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে এর শঙ্কা আরও বাড়ছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানও চলছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়। এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করতে পারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় সফলতা হিসেবে দেখা হয়। অনেকে জেলে বসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে আবার অনেকেই দেশের বাইরে থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হত্যাকাণ্ডে ১৫ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে।
উদীচি শিল্পীগোষ্ঠির কেন্দ্রীয় কার্যালয় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকেই বিদেশে বসে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে দেশের ভেতর স্থিতিশীলতা নষ্টের চেষ্টা করছে। সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদেরও ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে তাদের চরিত্র হননের হীন উদ্দেশ্য চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের উস্কানীমূলক বক্তব্যে উৎসাহিত হয়ে অতি উৎসাহী কেউ কেউ মব সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যার ফলে দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলী স্টার ও ছায়ানটের মতো ভবনে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও অনেকটা বিনা বাধায় কিছু উচ্ছৃঙ্খল জনতা এইসব অপরাধ সংঘটিত করতে পেরেছে। গত ২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদকের বাসায় কয়েকজন সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এভাবে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্য দিবালোকে মোটর সাইকেল থেকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয় ওসমান হাদীকে। সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠালেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। আজ পর্যন্ত প্রকৃত খুনীদের গ্রেফতার করা যায়নি। গত ১৬ মাসে প্রায় ১১৩টি মাজারে হামলা চালানো হয়েছে। শুধু ঢাকা এবং চট্টগ্রামে ৬৪টি মাজারে হামলা এবং দরগাহে ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হকের কবর ও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তৌহিদী জনতা। ওই ঘটনায় একজন নিহত ও অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা কবর থেকে মরদেহ তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মানুষ যে কত নিষ্ঠুর, নির্মম হতে পারে এই ঘটনা তার প্রমাণ। বাংলাদেশে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা আর কখনো হয়নি। এসব মব সন্ত্রাসের কারণে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ পরিবেশে।
এক প্রতিবেদনে দেখা যায় গত পাঁচ মাসে রপ্তানি আয়ে বড় পতন হয়েছে। অন্য বছরের তুলনায় একই সময়ে ৩০%-৪০% পর্যন্ত রপ্তানি আয় কমে গেছে। আগামী জুন মাস পর্যন্ত এই খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। বৈশ্বিক চাহিদার সংকোচন, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নীতি সহায়তা ঘাটতির কারণে রপ্তানি আয়ে এমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মনে করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে দেশের অব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিরতা, মব সন্ত্রাস, নিরাপত্তা সংকটসহ নানা কারণে দেশের রপ্তানি আয়ে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে সংশ্লিষ্টদের বিদেশ সফর, বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন ও বিডার নানারকম উদ্যোগ সত্ত্বেও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেই বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রায় ৫৮ শতাংশ কমে গেছে। অথচ বিনিয়োগ আকর্ষণে এই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম প্রচার প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তাই একটা নির্বাচিত সরকার ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরানো কঠিন। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারই পারে একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে। আর এই স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিনটি মূল এজেন্ডা হলো বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। বিচার চলমান প্রক্রিয়া। সংস্কারের বিষয়ে কমিশনগুলো তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো মতামতের ভিত্তিতে ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সেই সনদে স্বাক্ষর করেছে। দু’একটি দল ছাড়া। এখন তিনটি মূল এজেন্ডার মধ্যে তৃতীয়টি হলো একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা। মূলত একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থতার কারণে বিগত সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছে। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের অভাবে বিগত সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিল। বিগত তিনিিট নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। যে কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় তাহলে আবারও নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সংকটে পড়বে দেশ। সেই জন্য প্রথমেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। পেশী শক্তিমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। বিভিন্ন স্থানে ঘাপটি মেরে থাকা সন্ত্রাসীদের নির্বাচনের পূর্বেই গ্রেফতার করতে হবে। নিজেদের আজীবন ক্ষমতা থাকার মানসিকতার জন্য অতীতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংকটে পড়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার হীন চক্রান্তে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তারা ধ্বংস করেছিল। দেশকে গণতন্ত্র হীনতার আবর্তে নিক্ষেপ করে স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করেছিল। তাই অতীতের মত একই রকম ভাবে নির্বাচন ব্যবস্থার উপরে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে আবারও গভীর সংকটে পড়বে দেশ। বর্তমান টালমাটাল বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন করে দেশ সংকটে পড়লে সেখান থেকে টেনে তোলা সম্ভব হবে না। তাই নির্বাচনের আয়োজনে যত ষড়যন্ত্র হোক যত হুমকি আসুক এই মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন এখন জাতির প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা পূরণ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সব রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও উপ–সচিব, সিসিসিআই











