সংরক্ষিত আসন আলোচনায় চট্টগ্রামের দেড় ডজনেরও বেশি নেত্রী

মোরশেদ তালুকদার | বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সংরক্ষিত আসনে চট্টগ্রামের দেড় ডজনেরও বেশি নেত্রী ও কর্মী বিএনপির মনোনয়ন চান। অথচ সংরক্ষিত ৫০ আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য বরাদ্দ আছে ৩৬ আসন। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি প্রত্যাশা করছেন চট্টগ্রামের নেত্রীরা। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দাবি, তারা বিগত সময়ে দলের আন্দোলনসংগ্রামে ছিলেন। বিএনপি সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করবে। এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বিএনপি জোটের জন্য বরাদ্দকৃত ৩৬ আসনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম থেকে ২টি সংরক্ষিত আসনের বিপরীতে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার পরিকল্পনা আছে। এক্ষেত্রে দলের জন্য ত্যাগের পাশাপাশি প্রার্থীর শিক্ষা এবং সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে সংরক্ষিত আসনের জন্য প্রার্থী বাছাই করা হবে।

এদিকে গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের জন্য তফশিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তপশীল অনুযায়ি আগামী ১২ মে সকাল ৮টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত নির্বাচন ভবনে ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২১ এপ্রিল বিকেল চারটা। মনোনয়নপত্র বাছাই ২২ ও ২৩ এপ্রিল, আপিল আবেদনের সময় ২৬ এপ্রিল, আপিল নিষ্পত্তি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ২৯ এপ্রিল এবং প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংসদীয় মনোয়ন বোর্ড বা স্থায়ী কমিটির সভায় সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে। এর আগে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করবে দল। তবে দল যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে তিনি বিনা ভোটেই নির্বাচিত হবেন। কারণ দল ও জোটের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান প্রার্থী হলে আর ভোটের প্রয়োজন হয় না।

এদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম বিতরণের কোনো ঘোষণা দেয়া না হলেও চট্টগ্রামের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের বেশিরভাগই গতকাল তফশিল ঘোষণার পর থেকে ভিড় করছেন রাজধানীর দলীয় কার্যালয়ে। ধর্না দিচ্ছেন দলের সিনিয়র নেতাদের। করছেন তদবির।

আলোচনায় যারা :

চট্টগ্রামের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে দলের মধ্যে আলোচনায় এগিয়ে আছেন নগর বিএনপির সাবেক মহিলা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক ডা. কামরুন নহার দস্তগীর, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেত্রী ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি। আলোচনায় আরো আছেন দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম রিকু, উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি মেহেরুন নেছা নার্গিস, নগর মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি আফরোজা বেগম, উত্তর জেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদা খানম ও সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম।

এছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশী আছেন চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট আয়েশা আকতার সানজী, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন, নগর মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক কামরুন নাহার লিজা, জাসাসের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক নাজমা সাঈদ। এছাড়া কিছু রাজনৈতিক পরিবার থেকেও সংরক্ষিত নারী আসনে দলের সমর্থন পেতে তদবির করছেন বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী ও পুত্রবধুর বিষয়ে গুঞ্জন রয়েছে।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের রাজনৈতিক অবস্থান :

আলোচনায় থাকা ডা. কামরুন নহার দস্তগীর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক। চার দশকেরও বেশি সময় মাতৃস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত আছেন। ছিলেন ড্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্য ও উপদেষ্টা এবং নগর বিএনপির মহিলা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ছিলেন। তার স্বামী চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা দস্তগীর চৌধুরী।

ডা. কামরুন নাহার দস্তগীর বলেন, আমার প্রয়াত স্বামী দস্তগীর চৌধুরী স্বপ্ন দেখতেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দুর্গখ্যাত বীর প্রসবিনী চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থে বন্দর নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানীর সকল সুযোগ সুবিধা থাকবে, যার সুফল পাবেন চট্টগ্রামবাসী। তার এই স্বপ্নকে মনে প্রাণে লালন ও ধারণ করে আমার রাজনৈতিক জীবনের দায়িত্বশীলতা, সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও ত্যাগের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে প্রতিটি পথচলা। তার (দস্তগীর চৌধুরী) উত্তরসূরী হিসেবে আমি অদ্যাবধি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নীতি আদর্শের উপর জীবন অতিবাহিত করছি। পাশাপাশি জনসেবা, চিকিৎসাসেবা, নারী উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বে আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা জাতীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে চাই। সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত মিশন ভিশন বিনির্মাণে নিজেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীর মতোই নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।

চট্টগ্রাম থেকে যারা আলোচনায় আছেন তাদের মধ্যে এগিয়ে থাকাদের একজন ব্যারিস্টার সাকিল ফারজানা। তিনি হাটহাজারী থেকে বিএনপির ব্যানারে চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ প্রয়াত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে। সাকিলা ফারজানা নিজেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম পাশ করে ইউনিভর্সিটি অব লন্ডন থেকে আবার এলএলবি সম্পন্ন করেন। এছাড়া লন্ডনের দ্য সিটি ল’ কলেজ থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। ২০০৯ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করে সক্রিয় হন রাজনীতিতে। ‘রাজননৈতিক মামলায়’ ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট গ্রেপ্তার হয়ে ১০ মাস ৮ দিন কারাভোগও করেন। বর্তমানে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তিনি।

বিএনপির ঘনিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন ‘রাজনৈতিক মামলা’ উচ্চ আদালতে পরিচালনা করেন সাকিলা ফারজানা। ওই জায়গা থেকে দলের হাইকমান্ডের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে তার। এছাড়া হাটহাজারী উপজেলায়ও দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তিনি। দল এসব কিছুর মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদী সাকিলা ফারজানার অনুসারীরা। এ বিষয়ে সাকিলা ফারজানা আজাদীকে বলেন, দল থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। দল বললে ফরম নিব। যেহেতু দল করি, তাই দলের একটা গাইডলাইন তো ফলো করতে হবে। এককথায় দলীয় সিদ্ধান্তের উপর সবকিছু নির্ভর করছে।

এদিকে মনোনয়ন প্রত্যাশী নগর মহিলা দলের সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মনি ২০০৫ সালে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এছাড়া ২০১০ এবং ২০১৫ সালেও নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ সাল থেকে তিন ধাপে নগর মহিলা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৭টি ‘রাজনৈতিক মামলা’র আসামিও হয়েছেন তিনি। আজাদীকে মনোয়ারা বেগম মনি বলেন, গত ১৭ বছর রাজপথে ছিলাম, আন্দোলনসংগ্রামে ছিলাম এবং মামলাহামলা নির্যাতনের শিকার হয়েছি। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে মিছিল করেছি। আশা করছি দল এসব ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী নগর মহিলার দলের সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরী আজাদীকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতি করে আসছি। গত ১৭ বছর নারীদের ঐক্যবদ্ধ করে দলের আন্দোলনসংগ্রামে ছিলাম। দল নিশ্চয় এসবের মূল্যয়ন করবে।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম রিকু আজাদীকে বলেন, ২০১৫ সালের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভকালে গুলিবিদ্ধ হই। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির যাবতীয় কার্যক্রম ও কর্মূসচিতে সক্রিয় ছিলাম।

এদিকে মনোনয়ন প্রত্যাশী দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি আফরোজা বেগম পটিয়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯২ সালে কমার্শিয়াল ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের মহিলা সম্পাদকের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। পরবর্তীতে উপজেলা ও জেলা বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত তিনি। আজাদীকে আফরোজা বেগম বলেন, আমি ফ্যাসিস্টদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ২০১৮ সালে নির্বাচনের পর আমাকে ৭২ ঘণ্টা নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রাখে তারা। মইজ্জেরটেকে আমার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। আন্দোলনসংগ্রামে ছিলাম। আশা করছি দল তার মূল্যায়ন করবে।

এদিকে ২০১২ সালে দলের ‘চলো চলো ঢাকা চলো কর্মসূচি’তে গিয়ে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গুম করা হয় ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি নেতা শহীদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানকে। তার স্ত্রী সুলতানা পারভীনও মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি মনে করেন, গুম পরিবারগুলোর কথা জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে তাকে সংরক্ষিত আসনে এমপি করে কাজ করার সুযোগ দেয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে কারখানার টিনের শেড ভেঙে দুই শ্রমিকের মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে যেভাবে সাহায্য করল পাকিস্তান