সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বিষয় নয়, বিষয় হলো আপনি বাংলাদেশি

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ২১ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে দল–মত–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সকলে মিলে সেই কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশটি গড়ে তুলি। যেই বাংলাদেশের জন্য দল–মত–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন সময় অকাতরে আমরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছি। আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, আপনি মুসলমান হোন, আপনি বৌদ্ধ হোন, খ্রিস্টান হোন–যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।

প্রধানমন্ত্রী গত রাতে নগরের জেএম সেন হলে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল রাত ৮টা ১৫ মিনিটে জেএম সেন হল পূজামণ্ডপে এসে পৌঁছান। সেখানে তাকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরের নেতৃবৃন্দ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিরা। এর আগে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি পূজামণ্ডপে আসেন প্রধানমন্ত্রী।

যা বললেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এইটুকু বলার জন্য–এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার, এই দেশ আমাদের সকলের। আমরা মুসলমান হই, আমরা হিন্দু হই, আমরা বৌদ্ধ হই, খ্রিস্টান–যেই হই না কেন, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকটি মানুষ বাংলাদেশি, যে ধর্মেরই হই না কেন। যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে আমরা বড় হচ্ছি, আমরা এই দেশের নাগরিক। আমাদের একমাত্র পরিচয়; ধর্মের পরিচয় না, আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিন্তা করে দেখুন, আমি একজন মুসলমান। আমাকে রাজনৈতিক কারণে বাধ্য হয়ে ১৭টি বছর বিদেশে থাকতে হয়েছিল। এখন মুসলমান হিসেবে আপনি হয়তো বলতে পারেন, আমরা সকলেই জানি ঠিক আছে। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু–সংখ্যাগরিষ্ঠ এই শব্দে বাংলাদেশে যদি কাউকে যাচাই–বাছাই করতে হয় তাহলে মুসলমান হিসেবে আমি হয়তো সংখ্যাগুরু। কিন্তু যখন আমি লন্ডনে ছিলাম সেখানে কি সংখ্যাগুরু ছিলাম? সেখানে তো অন্য ধর্মের মানুষ বেশি। আমি তো ওখানে সংখ্যালঘু ছিলাম। কাজেই সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু কোনো বিষয় নয়। বিষয়টি একটি–আপনি বাংলাদেশি। এই দেশের আইন আপনার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, আমার জন্যও সেভাবে প্রযোজ্য। এই দেশের ওপরে আপনার যে অধিকার আছে, এই দেশের ওপরে আমারও একই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দেবে, এই রাষ্ট্র আমাকেও তাই দেবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি যেসব কথাগুলো বলব, এই কথাগুলো হয়তো আপনারা আজকেও শুনেছেন, হয়তো গতকালকেও শুনেছেন অথবা গত পরশু দিনও শুনেছেন। একই কথা আমি আপনাদের সামনে বলব। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, একই কথা আপনি কেন বলবেন? শুনানোর জন্য নতুন কী বলবেন? বিষয়টা নতুন–পুরাতনের বিষয় না; বিষয়টা হচ্ছে আমি জিনিসটাকে কীভাবে চিন্তা করি, আমি জিনিসটাকে কীভাবে দেখি, আমি কীভাবে বিষয়টাতে বিশ্বাস করি।

তিনি বলেন, দেখুন ১৯৭১ সালে এই বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এই প্রিয় মাতৃভূমিকে ছিনিয়ে এনেছিল। সেদিন যুদ্ধের মাঠে কয়েক লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। যারা যুদ্ধ করেছিলেন, যারা শহীদ হয়েছিলেন সেদিন কিন্তু আমরা দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান। আমরা কোনো ধর্ম দেখিনি, আমরা শুধু দেখেছি তারা মুক্তিযোদ্ধা, তারা দেশকে স্বাধীন করতে চেয়েছিল, তারা দেশকে স্বাধীন করেছে।

তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এবং সে সময়ও ছাত্র–জনতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মী রাজপথে নেমে এসেছিল গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য। জনগণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, জনগণের কথা বলার অধিকার, জনগণের ভোটের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সেদিনও কিন্তু আমরা দেখিনি আমার পাশের কর্মীটা কোন ধর্মের বা আমার সামনে বা আমার পেছনের কর্মীটা কোন ধর্মের।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেশিদিন আগের কথা না। দুই থেকে সোয়া দুই বছর আগের কথা। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট মাস। এই দেশের মানুষ, এই দেশের ছাত্র–জনতা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ সমগ্র বাংলাদেশে সেদিন রাজপথে বেরিয়ে এসেছিলেন। মা–বোনেরা বেরিয়ে এসেছিলেন, বিভিন্ন বয়সের মানুষ বেরিয়ে এসেছিলেন, শিশুরাও বেরিয়ে এসেছিল, তরুণেরা বেরিয়ে এসেছিল, যুবকেরা বেরিয়ে এসেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ সারা রাজপথে, দেশের প্রত্যেকটি জেলায়। স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কেউ কিন্তু আমরা জিজ্ঞেস করিনি গুলি খাওয়া মানুষটি কি মুসলমান নাকি হিন্দু, নাকি বৌদ্ধ, নাকি খ্রিস্টান।

তিনি বলেন, স্বৈরাচার গুলি করেছে, ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে। বাকিরা তাদেরকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে, যাবার পথে কেউ মারা গিয়েছে অথবা যাবার পথে বেঁচে থাকলেও বিভিন্নভাবে আহত হয়েছে। কেউ জিজ্ঞেস করেনি কী তার ধর্মপরিচয়। ডাক্তার তো জিজ্ঞেস করেনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে কী তার ধর্মপরিচয়–তারপরে চিকিৎসা হবে!

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের বিষয়টি তুলে ধরেছি। বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন–বিষয়টি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান–সেটিও আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। লক্ষ্য–উদ্দেশ্য একটিই ছিল সেদিন, আজও তাই। কী সেটি? একটি বাংলাদেশ গড়া যেখানে আমরা সকলে শান্তিতে থাকব, একটি বাংলাদেশ গড়া যেখানে আমরা সকলে মিলেমিশে থাকব। এটিই ছিল যারা শহীদ হয়েছে একাত্তরে, এটিই ছিল লক্ষ্য–উদ্দেশ্য। যারা বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে তাদের লক্ষ্য, এটিই ছিল জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতা যারা জুলাই যোদ্ধা ছিল, জুলাই শহীদ হয়েছে তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য–উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে, শারদীয় এই অনুষ্ঠানে আপনাদের সকলের কাছে, আমার বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ভাই, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বোনের কাছে সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা রেখে, কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার সহযোগিতা কামনা করছি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএনপি চেয়ারমানের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হক, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, মোস্তফা কামাল পাশা, সরওয়ার জামাল নিজাম, এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ান, সাঈদ আল নোমান, হুমাম কাদের চৌধুরী, সরওয়ার আলমগীর, এনামুল হক ও শাজাহান চৌধুরী।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখতে গতকাল বিকেল থেকেই জেএমসেন হলের সামনে মোমিন রোডে ভিড় করেন শত শত উচ্ছ্বসিত জনতা। লালখান বাজার, কাজীর দেউড়ি, জামালখান সড়কের পাশে অবস্থান নেন বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ লোকজন।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকাল ৯টায় রাজধানীর তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক বিমানে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখান থেকে রংপুরে যান তিনি। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে দুটি পথসভায় অংশ নেন এবং রংপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। পরে বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে সামরিক বিমানে রাজশাহীতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় যোগ দিয়ে ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। এরপর রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল বা সরকারের হস্তক্ষেপ থাকবে না.
পরবর্তী নিবন্ধমাতামুহুরী নদীর দুই স্থানে অভিযান, চারটি শ্যালো মেশিন জব্দ ও ধ্বংস