কক্সবাজারের চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীর অন্তত শতাধিক পয়েন্টে শ্যালো মেশিন ও শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। এসব যন্ত্র দিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে সরকারি কোষাগারে ১ টাকা রাজস্ব তো জমা হচ্ছেই না, তার ওপর মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্গে নদীর এসব পয়েন্ট মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, পার্বত্য অববাহিকার এই মাতামুহুরী নদীর প্রতিটি পয়েন্ট অনেক আগে থেকেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেখানে গোসলসহ প্রাত্যহিক কাজকর্ম সারতে নামলেই চোরাবালিতে তলিয়ে প্রাণ যাচ্ছে অনেকের। এতে বেশি প্রাণ হারাচ্ছে দুরন্ত কিশোর–কিশোরী ও কৌতুহলী শিশুদের।
শ্যালো মেশিন ও ড্রেজারে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়ে উঠার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের এক কর্মী গতকাল বিকেলে দৈনিক আজাদীকে বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে গিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য চোরবালির সৃষ্টি হয়েছে। এই চোরাবালির সৃষ্টি হয় মূলত নদীর তলদেশ তথা ভূগর্ভ থেকে শক্তিশালী শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে ২০ থেকে ৫০ ফুট গভীর থেকে বালু তুলে ফেলায়। আর সেই বিশালায়তনের গর্ত ভরাট হয় পলি জমে গিয়ে। আর উপরের স্তরে থাকে বালু আচ্ছাদিত হয়ে। এই অবস্থায় যখনই সেখানে কোনো মানুষ ওই স্থানে গোসল করতে নামে বা সেখানে পাড়া দেয় তখনই মুহূর্তের মধ্যে গভীরে চলে যায় সে ব্যক্তি। মূলত চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে আটকা পড়ে গেলে সেখান থেকে আর স্বাভাবিকভাবে ওপরে উঠা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। যতই উপরে উঠার চেষ্টা করে ততই তলিয়ে যেতে থাকে। আর এভাবেই নির্মম পরিণতি ঘটে মানুষের।
ওই ডুবুরি জানান– মূলত আজকে (গতকাল) নদীর যে স্থানে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তাও চোরাবালির স্থান ছিল। হয়তো এখান থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীর এই পয়েন্টটিও চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। এই বিষয়টি সবার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সচেতন হতে হবে স্থানীয়সহ সকলকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজারের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী দৈনিক আজাদীকে বলেন, অন্যান্য নদীর মতোই পার্বত্য অববাহিকার এই মাতামুহুরী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। পাহাড় সাবাড়, বৃক্ষরাজি নিধনসহ বর্ষাকালে ভারী বর্ষণের সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে ভাটির দিকে নেমে আসা বালু ও পলিতে নদীর তলদেশের এই অবস্থা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এই মাতামুহুরী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে থাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের রমরমা চলছে। আর সেসব স্থানই হয়ে উঠছে চোরাবালির স্থান তথা একেকটা মৃত্যুফাঁদ। তাই সাঁতার জানলেও চোরাবালির বিষয়টি সবার মাথায় না থাকলে সমূহ বিপদ ঘটে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই মাতামুহুরী ট্র্যাজেডি দিবস হিসেবে পালন করে থাকেন স্থানীয়রা। কারণ এই দিনে একই স্থানে দুরন্তপনায় মেতে উঠা চকরিয়া গ্রামার স্কুলের একদল শিক্ষার্থী ফুটবল খেলতে নামে মাতামুহুরী নদীর ভরাট চরে। খেলা শেষে অনেকেই ফিরে গেলেও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গোসল করতে নামে ওই স্থানে। এ সময় একসঙ্গে পাঁচজন শিক্ষার্থী নদীর চোরাবালিতে তলিয়ে যায়। এরপর ডুবুরি দলের ডাক পড়লে তারা এসে ওই চোরাবালির স্থান থেকে একে একে উদ্ধার করে তাদের লাশ। মূলত ওই স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। এর অংশ হিসেবে বালু তোলার স্থানে বিশালায়তনের গভীর গর্ভের সৃষ্টি হয়ে তা চোরাবালিতে পরিণত হয়। আর সেখানে গোসল করতে নেমে এ নির্মম পরিণতি ঘটে তাদের।
মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রতিনিয়তই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার যারা নিষেধাজ্ঞা না মেনে এমন কাজ করেই যাচ্ছেন তাদের উত্তোলিত বালু জব্দপূর্বক নিলাম দিয়ে আহরিত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হচ্ছে। এসি ল্যান্ড–চকরিয়া আরও বলেন, মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলতে গিয়ে যেভাবে নদীকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করা হচ্ছে তা খুবই দুঃখজনক। এখন থেকে কোনো অবস্থানেই অবৈধভাবে কাউকে আর বালু তোলার সুযোগ দেওয়া হবে না।