‘শেষ থেকে শুরু’ ও কিছু ইতিহাস

শাহরিয়ার পারভেজ | শুক্রবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিতে একুশের প্রথম স্মরণিকা প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম থেকে। স্মরণিকাটির নাম ছিল “শেষ থেকে শুরু”। দেওয়ান বাজার চাটগাঁ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদক ছিলেন লেখক ও নাট্যকার সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী। সহসম্পাদক অঞ্জন কান্তি দাশ। প্রকাশক দীপক দাশ। মুদ্রক সুভাষ দত্ত দি ইন্টার্ন প্রেস নন্দনকানন। বৈরী ঐ সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম শহরের কিছু অগ্রণী মুখ। ছিলেন সুভাষ দত্ত, সৌমন কান্তি দে, তপন কান্তি দত্ত, প্রদীপ কান্তি দেওয়ানজী, অরবিন্দু চৌধুরী, আরতি সেন, সমীর কান্তি চৌধুরী, সমীর সাহা, ফজলুর রহমান, অমলেন্দু বড়ুয়া, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ সিরাজদ্দৌলা ও মিলন কান্তি গুপ্ত। পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন শিশির বিন্দু দাশ, শ্রীনাথ সাহা, হেমেন্দ্র লাল দাশ, কালিপদ পারিয়াল, রনধীর দাস, পরিমল বিকাশ সেন গুপ্ত, মনোরঞ্জন চৌধুরী, মুকন্দ লাল দাশ, আবদুল সোবহান চৌধুরী, আবু সাঈদ ও মোস্তফা কামাল।

তৎকালীন নিউ মার্কেটের নিচতলার ইসটারণ ফটোগ্রাফিক এজেন্সিস এবং দেওয়ান বাজারের জনকল্যাণ ফার্মেসী দুটো বিজ্ঞাপন দেয় প্রকাশনার জন্য। বাকি টাকা সবাই যে যার সামর্থ্যমতো দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য দেওয়ান বাজারের আবদুল সোবহান চৌধুরী সেসময় একশ টাকা দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক এই সংকলনটির যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম তিন গুণী আমাদের সবার প্রিয়জন সুদীপ দেওয়ানজী, প্রদীপ দেওয়ানজী এবং অমর বিন্দু চৌধুরী।

কবিতা প্রবন্ধ স্মৃতিকথা সব নিয়ে চব্বিশ পাতার এই সংকলনটির মূল্য রাখা হয়েছিল তিনটি দশ পয়সা। সম্পাদকীয় লিখেছেন সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী।

কবিতার সূচিতে “একুশের গান” (মাহবুব উল আলম চৌধুরী), “একুশ ও অতঃপর” (অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক), “রক্তে আমার মা” (ইউসুফ পাশা), “হারিয়ে যেতে চাই” (প্রদীপ দেওয়ানজী), “সাক্ষী দিনটি” (সৌমেন কান্তি দে), “অম্লান সেদিন” (শফিকুল মান্নান), “অনন্ত দিনের ধ্বনি” (সুভাষ দত্ত), “এখনো কেন” (সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী)

প্রবন্ধ লিখেছেন “আরো কয়েক পা” (অধ্যাপক তপন চক্রবর্তী, “ভাষা প্রসঙ্গে” (অঞ্জন কান্তি দাশ), “চেতনার প্রশ্নে” (অমর বিন্দু চৌধুরী)

প্রিন্টার্স পেইজের পরের পাতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছিল

কোটি কোটি ছোট ছোট মরণেরে লয়ে,

বসুন্ধরা ছুটিছে গগনে,

অঞ্জলি ভরিয়া বিশ্ব মৃত্যু উপহার

ঢালিতেছে কাহার চরণে;

এ ধরণী মরণের পথ,

এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ, যত বর্ষ বেঁচে আছি

তত বর্ষ মরে গেছি মরিতেছি প্রতি পলে পলে;

জীবন্ত মরণ মোরা, মরণের ঘরে থাকি

জানিনা মরণ কারে বলে!

কবিগুরুর পাশাপাশি পুরো সংকলন জুড়ে আছে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হানের কবিতা আর উদ্ধৃতি।

একুশের শহীদেরা চলে গেছে রক্তবীজ বুনে’’ কবিতা দিয়ে শুরু সংকলনটির। প্রথম কবিতা ছিল কবি, সাংবাদিক এবং ভাষা সৈনিক একুশের প্রথম কবিতার কবি মাহবুবউলআলম চৌধুরী’র একুশের গান। কবিতার পরে আছে অধ্যাপক তপন চক্রবর্ত্তী’র “আরো কয়েক পা” শীর্ষক প্রবন্ধ। একুশের জয়গান নিয়ে কবিতা লিখেছেন অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক “একুশ ও তারপর” শীর্ষক কবিতায়।

ভাষা নিয়ে লিখেছেন অঞ্জন কান্তি দাশ। ভাষা প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে তিনি লেখেন, “ইতিহাসের পাতা হইতে পাওয়া জীবের জন্ম শুরু হইবার পর পরই, ভাষার জন্মের নিদর্শন আমরা খুঁজিয়া পাই। কারণ মানব জীবনের উপলব্ধি, চৈতন্য ও অনুভূতির বিকাশ মানবের সৃষ্টিত ভাষার মধ্যে। ভাষা ছাড়া মানব জীবন ছন্দহীন, বোবা, পঙ্গু।”

ভাষা শহীদদের অকাতরে নিজের শরীরের তাজা রক্ত ঢেলে নিজেদের উৎসর্গ করাকে উপজীব্য করে ইউসুফ পাশা “রক্তে আমার মা” শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন

একদিন বুড়িগঙ্গার সেই সাদা পানি

বুকের রক্ত দিয়ে ওরা লাল করে গেল।

আজ আমরা সেখানে রক্ত স্নান করে,

রক্তভেজা পা ফেলে ফেলে

বাংলার গলা জড়িয়ে

মায়ের আদল ভেবে চুমু খেতে চাই।

সংকলনটির প্রতিটি পাতায় দেশ মাতৃকার প্রতি অম্লান ভালোবাসা যে কারো নজর কাড়বে। এটি শুধু সংকলন নয়। দেশের প্রতি ভাষার প্রতি শব্দের প্রতি আমাদের ভালোবাসা।

প্রাবন্ধিক অমর বিন্দু চৌধুরী’র তাঁর প্রবন্ধের শেষাংশে প্রজন্মকে নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এভাবে– “আনুষ্ঠানিকভাবে কোন ঘটনাকে পালন করিতে গিয়া কয়েকটি গান বা নাটকের মধ্যে প্রকাশ করা যায়। সংবাদ পত্রে প্রবন্ধ আর কবিতার মাধ্যমে সমাজের সীমিত গণ্ডির উপর আঘাত হানা যায়। কিন্তু তাহা কয়টি মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হইতেছে? সুতরাং গালভরা বড় বড় বুলি না আওড়াইয়া আমাদের জীবনে আত্মোপলব্ধি ও আত্মচেতনার বিকাশ ঘটাইয়া, সমাজের বুকে তাহা প্রতিফলিত করিয়া এই পবিত্র ভূমিতে অত্যাচারের যে ঘৃন্য আঁচড় পড়িয়াছে তাহা মুছিয়া দিবার প্রয়াসে আগাইয়া আসাই আমাদের বাঙ্গালীত্ব শোধের প্রকৃষ্ট প্রকাশ বলিয়া পরিগণিত হইবে।”

অমর বিন্দু চৌধুরী’র, জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৯ মার্চ, নিত্যানন্দ ধাম, অভয় মিত্র লেন, চট্টগ্রামে। জে এম সেন স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। মাধ্যমিকপ্রবর্তক বিদ্যাপিঠ এবং চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক (পাস)। কলেজের ছাত্রাবস্থায় নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বোমাবর্ষণ করা হয় তখন তিনি ফিরিঙ্গি বাজারের মামার বাড়িতে। তাই শহর ছেড়ে চলে যান গ্রামে। তারপর সীমানা পেরিয়ে শরণার্থী হিসেবে ফাজিলপুর সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরার উদয়পুরে পৌঁছান। সেখানকার জোলাবাড়ি ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর দেশে ফিরেন। তারপর ১৯৭২ সাল থেকে আবার লেখাপড়া শুরু করেন। লেখাপড়া শেষে চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১০ সালে উচ্চমান বহিঃসহকারী পদে থেকে অবসরে যান। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন।

এই ব্যতিক্রম অনুভূতির

যন্ত্রণা থেকে আমি হারিয়ে যেতে চাই

কোন রুদ্ধ গুহার নিকষ তমাসায়।

যেখানে

পলাশের ম্লান বর্ণ

মায়ের বুকে বুলেট বিদ্ধ কঙ্কালের হাসি

গভীর জলরাশিতে বিম্বিত

উড্ডীন শকুনের প্রতিচ্ছবি

আমার অনুভূতির মিছিলটাকে

অবিন্যস্ত করে দেবেনা।

হারিয়ে যেতে চাই” শীর্ষক কবিতাটির কবি আমাদের প্রদীপ কান্তি দেওয়ানজীদা। এই সংকলনটির প্রকাশনার সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন সরাসরি প্রথম থেকেই। বিশিষ্ট নাট্যজন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রদীপ দেওয়ানজী; সদ্যপ্রসূত বাংলাদেশে যে ক’জন মানুষ সাংস্কৃতিক জাগরণের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

প্রদীপ দেওয়ানজী ১৯৭৬ সালে ‘আবু দেওয়ান’ ছদ্মনামে লিখেছেন প্রথম নাটক ‘আসবে সুঠাম সময়’। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ পরিষদ আয়োজিত সাহিত্য প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার জিতে নেয় নাটকটি। এরপর একাধারে লিখেছেনঅবাক রাজার অবাক কাণ্ড, রাকস, দাবি, অয়নের জবানবন্দি, সুশীল প্রতিবাদ, চোর সাধুচরণ, সনাতনী, কাদামাখা মাইক্রোবাস, দ্যাট ইজ হোয়াই, টাকা মানুষ, প্রস্তুতি সভা, মনিব মানবিক, কয়াগ্রামে পালাবদল। লিখেছেন শিশুতোষ নাটকরক্ত রাজা সবুজ পরী, ইচ্ছে, মন ভালো চশমা, বোকা চালাক আর চালাক বোকা, গোপাল ভাঁড়ের দুই কাণ্ড, একাত্তরে কুপোকাত। একাত্তর সালে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক চট্টগ্রামে পরিচালিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নির্মম সাক্ষী ফয়েজ লেকের বধ্যভূমি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘বধ্যভূমি’ তাঁর বহুল আলোচিত একটি নাটক।

সৌমেন কান্তি দে রচিত “সাক্ষী দিনটি” কবিতার চরণগুলো আমাদের নিয়ে যায় বায়ন্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্তমাখা দিনটিতে

ঝকঝকে আগুন!

কচি কাঁচা কয়েকটি পলাশ টুপটাপ ওই।

সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার

কালো গলা পীচ লালে লাল,

বারুদের ক্লেদাক্ত গন্ধভরা বাতাসটুকুর

ক্ষীণ সংলাপ,

সাক্ষী দিনটি।

কবি শফিকুল মান্নান এর “অম্লান সেদিন” কবিতায় একাত্তরের উদাত্ত আহ্বান। যুদ্ধ যেন শেষ হয়েও হয় না।

আবার এলো ফিরে

সংগ্রামের বজ্র নির্ঘোষে সেদিন।

অদম্য প্রাণ স্পন্দন মৃত্যুর মুখোমুখি প্রতিশ্রুত

কতগুলো তরুণযুবক।

চক্রান্তে চক্রান্তে কালো সাপের প্রচণ্ড ছোবলে,

রিক্ততার সাহারায় আগুনের ফুলকি লয়ে

সবেগে ছুটছে আপনারে ভুলে সম্মুখ পানে,

নাতারা থামবেনা।

তারপর। সেই রাজপথ

যেন তীব্র হতে তীব্রতর,

দেহখানি তার বহ্নির রঙ্গে রঞ্জিত।

অনন্ত দিনের ধ্বনি” কবিতায় একুশ নিয়ে জয়গান গেয়েছেন কবি সুভাষ দত্ত।

দীর্ঘ দিনের যত অর্গল

একুশে’র চলার পথে

ভেঙ্গে গেছে চিরতরে

মুক্ত প্রাণের দুর্জয় শপথে।

মিছিলে মিছিলে জনতার কণ্ঠে

একুশ’ অনন্ত দিনের ধ্বনি

যুগযুগান্তরে আঁধার পথে

যত ক্লান্ত প্রাণের সঞ্জিবনী।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত “শেষ থেকে শুরু” সংকলনটির প্রচ্ছদ ও সম্পাদকীয় লিখেছিলেন লেখক ও নাট্যকার সুদীপ দেওয়ানজী।

তাঁর জন্ম ১৯৫২ সালের ২ মার্চ মিরসরাই এর মলিয়াইশ গ্রামে। সমাজতত্ত্ব বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন। পেশায় ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। বাংলাদেশ টেলিভিশন ঢাকা ও বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত গীতিকার। তিনি অনেক নাটক লিখেছেন। এই সংকলনে তাঁর কবিতাটি ছিল সবার শেষে। একজন সম্পাদকের সবকটি সব গুণই বিদ্যমান। ৫৪ বছর আগে একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের যে চিত্র ছিল তা আজও আমরা দেখতে পাই।

বছরের পর বছর এভাবে আর কতদিন ভাষা শহীদদের অবমাননা হবে। যারা একদিন বিবেকের তাড়নায় নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে। তাদের এই নিঃস্বার্থ দান কেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না। আমাদের আত্মসচেতনতা কখন ফিরবে?

সংকলনটির প্রসঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি কবি জিন্নাহ্‌ চৌধুরী’র প্রতি। ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর উপস্থাপনা ও গ্রন্থনায় সংকলনটি নিয়ে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন জিন্নাহ ভাই। যাতে সংকলনটির সম্পাদক সুদীপ কান্তি দেওয়ানজী বইটির উপর আলোকপাত করেন। কৃতজ্ঞতা জানাই সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রদীপ দেওয়ানজী’র প্রতি। তাঁর উৎসাহে আজকের এই নিবন্ধ। সবশেষে বলব ভাষা আন্দোলনকে জানুন। সর্বস্তরে মাতৃভাষা প্রচলন করুন।

মানুষের এ এক চিরন্তন যাত্রা।

জ্ঞানের জন্যে।

আলোর জন্যে।

সুখের জন্যে।

তবু আলো নেই।

তবু অন্ধকার!”

(জহির রায়হান)

পূর্ববর্তী নিবন্ধআনজুমান ট্রাস্টের মাসব্যাপী ইফতার মাহফিল শুরু
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য ও শব্দ বিলুপ্তি প্রসঙ্গ