‘সংগীতে হয় শ্বাসের ব্যায়াম, দেহের ব্যায়াম নাচে; এই ব্যায়ামই সহজ ব্যায়াম, নেই কিছুই এর কাছে’- এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে অনেকটা খেলার ছলেই ২০০৯ সালে রসায়নে অনার্স পড়ুয়া সংগীত শিল্পী উজ্জ্বলচন্দ্র নাথ রনি প্রতিষ্ঠা করেন ধ্রুপদ সংগীত নিকেতন চট্টগ্রাম। যা এখনো সগর্বে সংগীত জগৎকে আলোকিত করে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালে প্রকৌশলী বাবুল চন্দ্র নাথের কাছে সংগীতে হাতেখড়ি তার। এরপর পর্যায়ক্রমে তালিম নেন প্রয়াত সংহিতা বণিক ও সন্তোষ রায় এবং সন্ধ্যা ঘোষ দস্তিদার ও রাজিয়া বেগমের কাছে। শাস্ত্রীয় সংগীতে অগাধ ইচ্ছা তাকে টেনে নিয়ে যায় বিশ্ববরেণ্য সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ জগদানন্দ বড়ুয়ার কাছে। ওস্তাদজী মারা যাওয়ার পর তাঁরই সুযোগ্য শিষ্য শিল্পী স্বরূপ দেবনাথের কাছে তালিম শেষ করে পুনরায় শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষার জন্য সংগীত গুরু ফারুক আহমেদকে বরণ করে নেন। সংগীতের পাশাপাশি আবৃত্তি এবং নাট্যকলায় আকৃষ্ট হয়ে সুরকার, গীতিকার ও নাট্যকার অ্যাডভোকেট বিশ্বজিৎ দাশের নিকট অভিনয়ের তালিম নেয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু নাটক মঞ্চস্থকরণের মাধ্যমে গড়ে তোলেন ‘থিয়েটার ধ্রুপদ’। বর্তমানে সংগীত, নৃত্য, তবলা, চিত্রাংকন ও নাট্যকলা নিয়ে ‘ধ্রুপদ’এর ৪টি শাখা পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৯ সালে সরাইপাড়া শাখা, ২০১৪ সালে হালিশহর শাখা, ২০১৫ সালে রহমতগঞ্জ শাখা এবং ২০১৭ সালে বালুছড়া শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
মাত্র দুজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা ‘ধ্রুপদ’ এর শিক্ষার্থী সংখ্যা এখন শতক এর ঘরে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য পাশে পেয়ে যান তাঁরই দুই ভাই-বোন। সংগীত, তবলা ও নাট্যকলা পরিচালনার দায়িত ভার হাতে তুলে নেন শিল্পী উৎপল চন্দ্র নাথ অনিক এবং নৃত্য বিভাগের পরিচালনার দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন শিল্পী রিয়া দাশ চায়না। এই প্রতিথযশা দুই শিল্পীর অবদান অনস্বীকার্য, যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠাতার পাশাপাশি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধ্রুপদ সংগীত নিকেতন, চট্টগ্রাম ও থিয়েটার ধ্রুপদ, চট্টগ্রামকে।
প্রতিষ্ঠাতা উজ্জ্বল চন্দ্র নাথ রনি নিজস্ব প্রযোজনায় উৎপল চন্দ্র নাথ অনিক ও রিয়া দাশ চায়নার সহযোগিতায় গীতি নৃত্যনাট্য পরিচালনা করেছেন ৩টি মহিষাসুর মর্দিনী, মহিষাসুর বধ এবং নিমাই-সন্যাস; নাটক পরিচালনা ও মঞ্চস্থ করেছেন ৪টি বাল্যলীলায় শ্রীশ্রী ঠাকুর, শ্রীশ্রী রামঠাকুর, সন্যাস যাত্রায় নিমাই এবং ভক্ত শ্যামাচরণ। এছাড়াও স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বৈশাখী মেলা, বসন্ত উৎসবসহ চট্টগ্রামের ছোট-বড় সকল মঞ্চে ধ্রুপদ এর শিল্পীরা সফলভাবে পরিবেশনা করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও বালুছড়া, পটিয়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, মীরসরাইসহ ফেনী, কুমিল্লা কক্সবাজারেও ‘ধ্রুপদ’ এর শিল্পীরা সফলভাবে পরিবেশনা সম্পন্ন করেছেন।
বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক একাডেমি, তান-প্রাণ সাংস্কৃতিক বিদ্যানিকেতন, অনুকূলচন্দ্র সৎসঙ্গ এবং ধ্রুব সাংস্কৃতিক পরিষদ বাংলাদেশ থেকে সংগঠনটি পেয়েছে সম্মাননা স্মারক, এছাড়াও পেয়েছে অসংখ্য শুভেচ্ছা স্মারক। ওস্তাদ জগদানন্দ বড়ুয়ার হাত ধরে ধ্রুব পরিষদ বাংলাদেশ থেকে ‘সঙ্গীত মুলংল’ এবং ‘সংগীত পারিজাত’ উপাধি প্রাপ্তিসহ গোল্ড মেডেল পেয়েছে।
ধ্রুপদ সংগীত নিকেতনের সংগীত, তবলা ও নাট্য বিভাগের পরিচালক শিল্পী উৎপল চন্দ্র নাথ অনিকের সহযোগিতায় চট্টগ্রামের বিশিষ্ট গুণীজনেরা ধ্রুপদ সংগীত নিকেতনের উপদেষ্টা হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন। সেই বিশিষ্টজনদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর প্রদীপ চক্রবর্তী ও স্কুল পরিদর্শক ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী, অধ্যাপক স্বদেশ চক্রবর্তী, পলাশ কান্তি নাথ রণী, পার্থ দাশ, অধ্যাপক পিন্টু ঘোষ, শিল্পী ফারুক আহমেদ, অপু বর্মণ, মিতালী রায় প্রমুখ।
পাহাড়তলী কলেজের রসায়নের শিক্ষক ও ধ্রুপদের প্রতিষ্ঠাতা উজ্জ্বল চন্দ্র নাথ রনি ধ্রুপদ সংগীত নিকেতন, চট্টগ্রামকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে চায়। সংগীত, তবলা ও নাট্য বিভাগের পরিচালক এবং ‘কন্ঠ সাধন’ গ্রন্থের প্রণেতা উৎপল চন্দ্র নাথ অনিক চাইছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ধ্রুপদকে নিয়ে কাজ করতে। এর পাশাপাশি নৃত্য বিভাগের পরিচালক রিয়া দাশ চায়না বলেছেন, সাংগীত চর্চার পাশাপাশি শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা সহ সমাজ উন্নয়নে কাজ করতে চায় ধ্রুপদ।












