শিশুমনের বিকাশে শিশুসাহিত্যের ভূমিকা

নেভী বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ

শিশু শব্দটি যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি স্পর্শকাতর। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা কেবল শারীরিক বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে তার মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। শিশু তার চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে, অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধির জগতে প্রবেশ করে। তার অর্জিত উপলব্ধি একসময় আচরণে, চিন্তায় ও জীবনবোধে প্রতিফলিত হয়। এভাবেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে শিশুর ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে, বিকশিত হয় চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা।

শিশুর এই সামগ্রিক বিকাশের পেছনে যেমন প্রয়োজন সুষম পুষ্টি, শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি, তেমনি অপরিহার্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও সৃজনশীল পারিপার্শ্বিক পরিবেশ। পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই শিশুর মনন পরিপূর্ণতা লাভ করে। আর এই বিকাশের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিশুসাহিত্য।

প্রাচীনকাল থেকেই শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ, ভাষার সঙ্গে পরিচয় এবং কল্পনাশক্তির বিকাশে ছড়া, কবিতা, গান ও গল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে আজও অমলিন হয়ে আছে ‘হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম’, কিংবা ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ, ঐখানেতে বাস করে কানাবগির ছা’। ঘুমপাড়ানি গানের মায়াবী সুরে কত শিশুই না ঘুমিয়ে পড়েছে ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো, বাটা ভরা পান দেব, গাল ভরে খেয়ো’। আবার চাঁদের সঙ্গে শিশুর কল্পনার নিবিড় বন্ধন তৈরি করেছে সেই চিরপরিচিত আহ্বান– ‘আয় আয় চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’। এসব ছড়া, কবিতা ও গান শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; এগুলো শিশুর ভাষাবোধ, স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি ও আবেগীয় বিকাশেরও সহায়ক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মা–বাবা, কাকা–কাকিমা, দাদা–দাদি, নানা–নানি, মাসি–পিসিদের স্নেহমাখা কণ্ঠে উচ্চারিত এসব ছড়া ও গল্প শিশুর বেড়ে ওঠার পেছনে এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিশুরা ক্রমেই ডিজিটাল মিডিয়ানির্ভর হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের খাওয়ানো, খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা কিংবা ঘুম পাড়ানোর জন্য মা–বাবা ও পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোন, কার্টুন, ভিডিও, গেমস কিংবা বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কনটেন্টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ফলে শিশুর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সরাসরি কথোপকথন, গল্প বলা, ছড়া আবৃত্তি, সৃজনশীল খেলাধুলা এবং বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেও আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন আমাদের শিশুসাহিত্যিকেরা। সময়ের চাহিদা, নতুন প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব ও পরিবর্তিত জীবনযাত্রাকে বিবেচনায় রেখে তাঁরা নিয়মিত লিখে চলেছেন ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও নানা ধরনের সৃজনশীল রচনা। তাঁরা কেবল লেখনীর মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিশু–কিশোরদের মধ্যে সাহিত্যপ্রীতি গড়ে তোলা, নতুন লেখকদের উৎসাহিত করা এবং পাঠাভ্যাসকে জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে আয়োজন করে চলেছেন নানা সাহিত্যিক অনুষ্ঠান ও উৎসব।

এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ২০২৬, দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৬’। বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি আয়োজিত এই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে। উৎসবকে ঘিরে শিশু–কিশোর, লেখক, সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে এক আনন্দমুখর সাহিত্যিক পরিবেশ তৈরি হবে এমনটাই প্রত্যাশা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকলম জীবনের পরম সুহৃদ
পরবর্তী নিবন্ধপ্রার্থনার নীরব শক্তি, মায়ের হৃদয় থেকে মানবতার বিস্তৃত আকাশে