চট্টগ্রাম শহরের লাগোয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম–১৩ তথা আনোয়ারা–কর্ণফুলী সংসদীয় আসনটি। এ আসনে দুই উপজেলা মিলে মোট ১৬টি ইউনিয়ন। তারমধ্যে আনোয়ারায় ১১টি আর কর্ণফুলীতে ৫টি। দুই উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৪৬ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ৭১৪ আর নারী ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫৩২ জন।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী, বৃহত্তর সুন্নি জোট মনোনীত মোমবাতি প্রতীকে এসএম শাহ জাহান, জাতীয় পার্টি মনোনীত আব্দুর রব চৌধুরী, সিংহ প্রতীকে এমডিএম প্রার্থী মো. এমরান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী মু. রেজাউল মোস্তফাসহ ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী প্রচার–প্রচারণার শুরুর পর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তর সুন্নী জোট মনোনীত প্রার্থী বিরামহীনভাবে পথসভা, উঠান বৈঠক ও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিন প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের প্রচার–প্রচারণায় বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর যোগ্যতা, সক্ষমতাসহ সব বিষয় চিন্তা করে সাধারণ ভোটাররা যোগ্য ব্যক্তিকে তাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করবেন।
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ভোটের মাঠে ততই উত্তাপ বাড়ছে। কৌশলগত কারণে প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দিলেও নির্বাচনী মাঠে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় সাধারণ ভোটাররা খুশি। এলাকাবাসী ভোটের পরিবেশ শান্ত রেখে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা মনে করছেন এবারের নির্বাচনে ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সংখ্যালঘু, নারী ও তরুণ ভোটাররা নির্বাচনের টার্নিং পয়েন্ট। এরাই ভোটের সব হিসাব–নিকাশ পাল্টে দিবে। তাই বিএনপি, জামায়াত ও বৃহত্তর সুন্নি জোট প্রার্থী নানা কৌশল নিয়ে ভোট পরিচালনা করছে।
তবে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার নির্বাচনী মাঠ জরিপে পেশাজীবী ও সাধারণ ভোটারদের সমর্থনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন বলে মত প্রকাশ করেছে। ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী এবং বৃহত্তর সুন্নি জোট মনোনীত মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী এসএম শাহ জাহানও আটঘাঁট বেধে নেমেছেন প্রচার–প্রচারণায়। তাছাড়া এমডিএম প্রার্থী মোহাম্মদ এমরান ব্যক্তিগতভাবে প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। জাতীয় পার্টি প্রার্থী আব্দুর রব চৌধুরীও আজ রোববার থেকে মাঠে নামবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ভোটের মাঠে এখনো দেখা মেলেনি ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ এর প্রার্থী মু. রেজাউল মুস্তফার।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরওয়ার জামান নিজাম বলেন, আনোয়ারা–কর্ণফুলীর জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমার প্রধান লক্ষ্য। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, টেকনিক্যাল কলেজ, বিদেশগামী কর্মীদের প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিনোদনের জন্য পারকি সৈকতের আধুনিকায়নসহ বড় বড় মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। আমি বিগত তিনবারের এমপি থাকাকালীন এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার মান উন্নয়নে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ, কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং নারী শিক্ষার উন্নয়নে জোর দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবার মানবৃদ্ধি এবং মাদক, চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সর্বোপরি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, টেকসই বেড়িবাঁধ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা, মহাসড়কে যানজট নিরসন, বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করণে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সাথে সরকারি সেবা প্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড/হেলথ কার্ড/কৃষি কার্ডসহ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়ন করতে ও আনোয়ারা–কর্ণফুলীর জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
জামায়াতে ইসলাম মনোনীত ও ১১ দলীয় জোট প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান বলেন, মহান আল্লাহতালা যদি দয়া করেন এবং জনগণ যদি সুযোগ দেন তাহলে আনোয়ারা–কর্ণফুলীর উন্নয়নে পরিকল্পিত মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর স্বপ্নের ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়ন, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের আসন সংখ্যা বাড়ানোসহ সেবার মান নিশ্চিত করব। নারী শিক্ষার উন্নয়নে মহিলা কলেজ ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আনোয়ারা–কর্ণফুলীতে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত স্লুইচগেট নির্মাণ, দুর্নীতিমুক্ত টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কর্ণফুলীকে দূষণমুক্ত করণে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হবে। এছাড়া এলাকার যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থান, খেলার মাঠ নির্মাণসহ নানান প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। সেই সাথে যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সর্বোপরি আনোয়ারা–কর্ণফুলীকে পরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইনশাল্লাহ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে।
বৃহত্তর সুন্নি জোটের মাওলানা এস এম শাহজাহান বলেন, আনোয়ারা–কর্ণফুলীর বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, দেয়াঙ পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমার প্রধান লক্ষ্য। এই এলাকাটি পীর–আউলিয়া ও সুফিবাদী ভোটার অধ্যুষিত। সুফিবাদী ভাবধারার শতাধিক দরবার ও মাজার রয়েছে। সুন্নি জনতা এবার ঐক্যবদ্ধ। ইনশাআল্লাহ মোমবাতির জয় হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর আমরা অনেকগুলো সরকার দেখেছি, অনেক এমপি–মন্ত্রী দেখেছি। ওরা নিজেদের ভাগ্যবদল করেছে, জনগণের জন্য কিছুই করেনি। পরিবর্তনের জন্য এবার মোমবাতিতে ভোট দেয়ার আহ্বান জানাই।












