রোজাদারের জন্য রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের বিশেষ পুরস্কার

ফখরুল ইসলাম নোমানী | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ

কোনো বিশেষ আমলের জন্য জান্নাতের নির্ধারিত প্রবেশদ্বার নেই। তবে রোজাই একমাত্র আমল যার জন্য রয়েছে নির্ধারিত জান্নাতের দরজা যার নাম রাইয়ান। যে দরজা দিয়ে শুধু রোজাব্রত পালনকারী ব্যক্তি প্রবেশ করবে। রোজাভঙ্গকারী ব্যক্তি রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। রোজাদারদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের উপর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ করেছেন এবং রোজাদারদের জন্য বিপুল সওয়াবের ওয়াদা করেছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে আল্লাহতায়ালা বলেন, রোজা আমার জন্য আমিই রোজার প্রতিদান দিব। রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। যেদিন তোমাদের কেউ রোজা রাখে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে চেঁচামেচি না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় সে যেন বলে আমি রোজাদার। ওই সত্তার শপথ যার হাতে রয়েছে মুহাম্মদের (সা.) প্রাণ, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের সুবাসের চেয়ে উত্তম। রোজাদারের জন্য রয়েছে দুইটি খুশি। যখন রোজাদার ইফতার করে তথা রোজা ভাঙে তখন একবার খুশি হয়। আবার যখন তার রবের সাক্ষাত পাবে তখন একবার খুশি হবে। রমজান মাসের অসংখ্য ফজিলত রয়েছে। এ ফজিলতের মধ্যে অন্যতম একটি হলো রোজাদারদের জন্য জান্নাতে বিশেষ একটি দরজার সুসংবাদ। মহান আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও ক্ষমালাভের জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সারা বছর এই মাসের প্রতীক্ষায় থাকেন। রহমত ও বরকতের দিক দিয়ে রমজান মাস বছরের অন্য ১১ মাস থেকে বেশি মর্যাদাপূর্ণ। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাস আসার দুইমাস আগে থেকে রমজানের প্রস্তুতি শুরু করতেন। রজব মাস থেকেই রমজান মাস পাওয়ার জন্য দোয়া করতে থাকতেন। রমজানের প্রতি রাতেই অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজানের রোজা রাখে আল্লাহ পাক তার বিগত জীবনের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতের ৮টি দরজা রয়েছে। একটি দরজার নাম হচ্ছেরাইয়ান। এ দরজা দিয়ে রোজাদারগণ ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যক্তি সেই রাইয়ান দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে সে আর কখনো পিপাসিত হবে না। এ সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেন, জান্নাতের একটি দরজা আছে যার নাম হচ্ছে-‘রাইয়ান’ কেয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাদারগণ প্রবেশ করবে অন্য কেউ নয়। এই বলে ডাকা হবে রোজাদারগণ কোথায়? তখন রোজাদারগণ উঠে প্রবেশ করবে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। তারা প্রবেশ করার পর সে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।

যারা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করে নিজের জন্য দিনের বেলা খাদ্য, পানীয় ও স্ত্রী সম্ভোগ নিষিদ্ধ করেছে, পরকালে আল্লাহ তাদের নানা পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন। যার একটি হলো আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা নির্ধারণ করবেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ রোজাদারকে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করবেন। তবে হাদিসে বর্ণিত রোজাদার শব্দের ব্যাখ্যায় তিনটি মত পাওয়া যায় : . যারা রমজানের রোজা যথাযথভাবে পালন করবে খ. যারা বেশি বেশি রোজা রাখে গ. যাদের ইবাদতে রোজার পরিমাণ বেশি হবে। যেহেতু রোজাদার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে তাই তাদের জন্য বিশেষায়িত জান্নাতের দরজার নাম রাখা হয়েছে রাইয়ান বা তৃপ্তিকর। আরবী ১২টি মাসের মধ্যে রমজান ছাড়া অন্য কোন মাসের নাম আল্লাহপাক কোরআনে উল্লেখ করেননি। শুধুমাত্র রমজান মাসের নাম উল্লেখ করায় বোঝা যায় এটি অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ মাস। এটি কোরআনুল করিমের মাস। এই মাসেরই লাইলাতুল কদরের রাতে আল্লাহ কোরআন নাজিল করেছেন সমগ্র মানবজাতির হেদায়েতের জন্য। রোজা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো পরহেজগার হতে পারো। এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য। গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জান্নাতের উপযোগী হওয়া নিজেকে পরিশুদ্ধ করার জন্য।

রোজার কারণে আগের সব গুনাহ মুছে ফেলা হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও নেকির আশায় রমজান মাসের রোজা রাখে (এবং রাতে) দণ্ডায়মান হয় (সালাত পড়ে) তার আগের গুনাহসমূহ মাফ করা হয়। হাদিসে আছে রোজা কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। কেয়ামতের দিন রোজা ও কোরআন সুপারিশ করবে। কোরআন বলবে হে আমার রব আমি তাকে রাতে ঘুমোতে দিইনি। আপনি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রোজা ও কোরআন উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। রোজাদারের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মজলুমের দোয়া, রোজাদারের দোয়া ও মুসাফিরের দোয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, যুবকদের মধ্যে যাদের বিয়ে করার সক্ষমতা নেই তারা যেন রোজা পালন করে। কারণ রোজা জৈবিক তাড়না দমন করে। রোজার কারণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিনও রোজা পালন করে আল্লাহ তার মুখমণ্ডলকে জাহান্নামের আগুন থেকে ৭০ বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেন। অতএব উপরোল্লিখিত হাদিস থেকে বুঝা যায় যে রমজান মাসে রোজা রাখলে জান্নাতের পথ সুগম হয়। আল্লাহতায়ালার নৈকট্য সহজে লাভ করা যায়। জীবন অধ্যায়ের পাপরাশি মুছে যায়। হাদিসে আরও উল্লেখ রয়েছে ইফতারের সময় দোয়া কবুলের সময়। আল্লাহতায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আর এই সময়ের দোয়া হচ্ছেআল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিরাহমাতিকাল্লাতি ওয়াসিয়াত কুল্লা শাইয়িন আন তাগফিরা লি জুনুবি। আল্লাহ সবাইকে এই মাসে রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের সৌভাগ্য অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভাষার মিছিলে নিভৃতচারী নারীরা
পরবর্তী নিবন্ধমক্কায় শয়তানকে পাথর মারার স্তম্ভের নকশাকার বাংলাদেশের ইব্রাহীম