রান্নাঘর থেকে করপোরেট অফিস স্থানীয় নারীদের ভাষাগত ও পেশাগত উত্তরণ

রোকসানা বন্যা | শনিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৫২ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজার ভ্রমণ করেনি এমন মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে খুবই কম। সাগরের নীলাভ জলরাশি, বিশালাকার ঢেউ আর সুউচ্চ পাহাড় নিয়ে গড়ে ওঠা দেশের এই পর্যটন নগরী বরাবরই মোহনীয়। কিন্তু এবারের কক্সবাজার সফর আমার সামনে এক অন্য চিত্র তুলে ধরল। পর্যটন রাজধানীর খোলস ছেড়ে কক্সবাজার এখন এক প্রচণ্ড ব্যস্ততম নগরী। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের পরবর্তী সময়ে দেশিবিদেশি অসংখ্য এনজিওর পদচারণা এই শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজার শহরের কলাতলী বা সুগন্ধা মোড়ে দাঁড়ালে এক ভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়ে। সাগরের ঢেউ দেখতে আসা পর্যটকদের ভিড় নয়, বরং শত শত সাদা রঙের ফোরহুইলার গাড়ির দীর্ঘ সারি। গন্তব্য উখিয়া বা টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প। আর এই গাড়িবহরের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকেন কর্মব্যস্ত নারীরা। এক সময়ের নিস্তরঙ্গ পর্যটন শহরটি এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত এক ‘হিউম্যানিটারিয়ান হাব’। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন নারী, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান।

এই সময়ে শহরের অলিগলি জুড়ে শুরু হয় এক ভিন্ন ব্যস্ততা। টেকনাফ বা উখিয়ার ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য নারীপুরুষের সমান ছোটাছুটি। এক সময় যে মেয়েরা কেবল গৃহস্থালি কাজের পর অলস সময় কাটাতো, তারা এখন ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে ছুটে যাচ্ছে কর্মস্থলে। এই দৃশ্য দেখে মনে হয়, এটি যেন বাংলাদেশের ভেতরে অন্য এক আধুনিক দেশ। তরুণতরুণীরা একসাথে কাজ করছে, আড্ডা দিচ্ছে, আর নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ছে। এই শহরকে এখন আর অলস পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এক অদম্য কাজের শহর মনে হয়। বিদেশি সহকর্মীদের সাথে কাজ করতে গিয়ে তাদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক এবং রুচিতেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।

এনজিওতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কক্সবাজারের স্থানীয়, এবং দেশের নানা প্রান্তের নারীদের জন্য এনজিওর এই কর্মযজ্ঞ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে এখানকার বেতন কাঠামো তাদের জীবনযাত্রাকে করেছে ঈর্ষণীয়। একজন মাঠকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেও একজন নারী মাসে ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা আয় করছেন। দক্ষতা ভেদে এই অঙ্কটা ৫০,০০০ থেকে ১,০০০০০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজারে একটা সময় যারা আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলতে পারতেন না, আজ তারা সুন্দর করে প্রমিত বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলছেন। শুধু উচ্চশিক্ষিত নয়, নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরাও আজ ব্যস্ত। বিদেশি কর্মকর্তাদের বাসায় একবেলা কাজ করেও তারা দিনে প্রায় ১০০০ টাকা পাচ্ছেন। ফলে বেকারত্বের অভিশাপ ঘুচেছে, সন্তানদের পাঠাচ্ছেন ভালো মানের স্কুলে। ​নারীদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণের পেছনে রয়েছে এনজিওগুলোর চমৎকার কর্মপরিবেশ। ​নিরাপদ দুর্গম ক্যাম্পে যাতায়াতের জন্য প্রতিটি সংস্থার রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা, যা নারী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। প্রতিটি এনজিওতে কঠোর সেফগার্ডিং বা যৌন হয়রানি বিরোধী নীতি থাকায় মেয়েরা নির্ভয়ে কাজ করতে পারছে।

শুরুতে কিছুটা জড়তা থাকলেও, আর্থিক উন্নতির ফলে এখন সমাজ ও পরিবার তাদের এই কাজকে সম্মানের চোখে দেখছে।

জীবনযাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়ার ​এই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে শহরের জীবনযাত্রাতেও। রাস্তার পাশে বা ঝুপড়ি দোকানে দাঁড়িয়ে কর্মব্যস্ত মেয়েরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিচ্ছে। এই দৃশ্য এখন স্বাভাবিক। অফিস ছুটির পর বন্ধুদের সাথে কোনো রেস্টুরেন্টে বসে গিটার বাজিয়ে গান করা, আড্ডা, হাসিআনন্দে সারাদিনের ক্লান্তি উড়িয়ে দিচ্ছে তারা। আগে যে উৎসুক মানুষরা মেয়েদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতো, সেই মানসিকতা এখন বিলুপ্তপ্রায়। কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই, সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। ভিন্ন দেশের ও ভিন্ন শহরের মানুষের বসবাসের কারণে এখানকার মানুষের চিন্তাচেতনাও হয়েছে আধুনিক।

তবে এই নতুন যুদ্ধে জয়ী হওয়া সহজ ছিল না। এনজিওতে কাজের যেমন সুবিধা আছে, তেমনি আছে কিছু কঠিন বাস্তবতা। ​শারীরিক ও মানসিক ধকল প্রতিদিন ভোরে উখিয়াটেকনাফ যাওয়া এবং ধুলোবালিক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশ কাটিয়ে রাতে ফেরা চরম ক্লান্তিকর।

একটা সময় কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষের কাছে চাকরি মানেই ছিল পর্যটন বা লবণ শিল্প। কিন্তু বর্তমানে এনজিও খাতের কারণে এ অঞ্চলের নারীদের গড় আয় গত এক দশকে প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

পর্যটন নগরী ​কক্সবাজারের এই পরিবর্তনটা খুব প্রয়োজন ছিল। সুউচ্চ দালান বাড়ছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের মনে। রাখাইন মেয়েরা গলিতে বসে পিঠা বিক্রি করছে, কেউ ফুটপাতে পসরা সাজিয়েছে কাউকে আজ আর দয়া নয়, বরং নিজের শ্রমে বাঁচতে দেখা যায়।

কক্সবাজারের এই রূপান্তর সময়ের দাবি ছিলো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই কর্মচঞ্চলতা শহরটিকে একটি গ্লোবাল সিটির রূপ দিচ্ছে। এই অগ্রযাত্রায় স্থানীয় নারীরা যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার সুফল ভোগ করবে পুরো বাংলাদেশ।

সমুদ্রের নীল জলরাশি নয়, এখন তাদের চোখেমুখে স্বাবলম্বী হওয়ার রঙিন স্বপ্ন। প্রথাগত শৃঙ্খল ভেঙে কক্সবাজারের নারীরা এখন উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অদম্য। সাগরের গর্জনের মতোই অদম্য এই নারীদের অগ্রযাত্রা আগামীতে কক্সবাজারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্বাচন দোরগোড়ায় নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্ন
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় তরুণের গলাকাটা লাশ উদ্ধার