রাজনৈতিক সংস্কার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান। বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তবে বাস্তব চিত্রে নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ পরিলক্ষিত হয়।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাঠামো ও নীতিকে উন্নত করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে, বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে।
রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো, নীতি ও প্রক্রিয়ার এমন পরিবর্তন যা সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি দমন এবং বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
জনগণ আশা করে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের কার্যকলাপের জন্য জবাবদিহি করবেন। দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি হ্রাস করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশা জনগণের মধ্যে দৃঢ়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব নাগরিকের জন্য সমান আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জনগণের অন্যতম দাবি। নীতিনির্ধারণে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রত্যাশা ক্রমবর্ধমান।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। দুর্নীতি একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আস্থাহীনতা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ওঠে, যা গণতান্ত্রিক আস্থাকে দুর্বল, বিভাজন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এক অস্থিরতা এবং আশার চক্রাকারে ঘুরে বেড়িয়েছে। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আমরা সামরিক শাসন, একদলীয়তা, স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে গেছি। ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণ–আন্দোলন এই চক্র ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারপতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতা এসেছে, এবং জনগণের মনে এক প্রশ্ন: রাজনৈতিক সংস্কার কি সত্যিই জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে? প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া, কিন্তু বাস্তবতা কী গড়ে উঠবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে প্রচুর চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত, সময়ের অভাব। নির্বাচনের আগে পূর্ণ সংস্কার সম্ভব ছিল না; ফলে অসম্পূর্ণতায় হতাশা বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলের প্রতিরোধ। পুরনো নেতৃত্ব এখনও প্রভাবশালী; তাঁরা সংস্কারকে ক্ষতি বলে মনে করেন। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সংকট। মুদ্রাস্ফীতি ৯.৮% (বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২৬), বেকারত্ব অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে এতে জনগণের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। চতুর্থত, সামাজিক বিভাজন। আন্তর্জাতিকভাবে, IMF–এর ঋণ শর্তে সংস্কারের চাপ আছে, যদিও ভূ–রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভারতের বাধা হতে পারে। জনগণ সচেতন থাকার কারণে বিভিন্ন দেশে সংস্কার সফল হয়েছে । বাংলাদেশেও তা হতে পারে।
জনগণের দাবি স্পষ্ট। প্রথমত, নির্বাচনী সংস্কার। দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল ভোটার তালিকায় ভুয়া নাম এবং কারচুপি। তারা চায় নিরপেক্ষ কমিশন। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সূচকে বাংলাদেশ ১৪৭তম স্থানে ছিল; জনগণ চায় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এবং দ্রুত বিচার। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক সংস্কার। পুলিশকে রাজনৈতিককরণ থেকে মুক্ত করা এবং সিভিল সার্ভিসকে মেধাভিত্তিক করা। চতুর্থত, সংবিধান সংস্কার। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, সংসদের শক্তিবৃদ্ধি এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা। এই দাবিগুলো শুধু ছাত্র নয়, সকলের মুখে শোনা যাচ্ছে।
১৯৯১–এর গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের পর প্রথম নির্বাচন স্বচ্ছ ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে দলীয় হিংসা এবং দুর্নীতি বেড়েছে। ২০০৭–০৮–এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন করেছে, কিন্তু পরে আওয়ামী লীগের শাসনে বিরোধী দমন এবং BNP–এর সময়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। ফলে, গণতন্ত্রের সূচক (Freedom House ২০২৪ রিপোর্ট) ‘আংশিক স্বাধীন’ থেকে ‘অনস্বাধীন’ হয়েছে। এই প্যাটার্ন দেখলে সন্দেহ জাগে: নতুন সংস্কার কি পুরনো চক্রে ফিরে যাবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো নির্বাচন বা বিশেষ ক্ষেত্রে গণভোট। বাংলাদেশে সামপ্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শাসনব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের দাবি উঠেছে। তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে যখন গণভোটের মতো প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির দাবি অগ্রাহ্য করা হয় বা বিলম্বিত হয়, তখন জনমনে এই আশঙ্কার সৃষ্টি হয় যে পুরানো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এখান থেকেই মানুষের মুখে মুখে ফিরছে সেই প্রচলিত প্রবাদ: ‘যে লাউ সেই কদু’। এই প্রবাদটির মাধ্যমে মূলত বোঝানো হয় যে নাম বা কাঠামোর পরিবর্তন হলেও অন্তর্নিহিত চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
সংবিধান সংস্কারের জন্য বর্তমান সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন। বৈধতা নিশ্চিতকরণের জন্য যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন বা বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনমতের প্রতিফলন থাকলে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়। যখন রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা গণভোটের দাবি এড়িয়ে যায় বা অন্য কোনো বিকল্প পথে হাঁটতে চান, তখন সাধারণ জনগণের মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন দানা বাঁধে।
জনগণ ভয় পায় যে, আগের মতোই একটি গোষ্ঠী নিজেদের পছন্দমতো আইন বা নিয়ম চাপিয়ে দেবে যা পুরানো ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ । নীতি নির্ধারণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে তাকে প্রকৃত গণতন্ত্র বলা কঠিন।
রাজনৈতিক দলের প্রতি জনমতের এই অনাস্থাই মূলত ‘যে লাউ সেই কদু‘ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ, শাসনের নাম বদলালেও শোষণের বা একতরফা সিদ্ধান্তের কাঠামোটি থেকে যাচ্ছে। “যে লাউ সেই কদু” এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু শাসনব্যবস্থার সংস্কার নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। যদি জনগণের দাবি অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে গণভোট বা জনমত যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়, তবেই রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার পালাবদল এলেও জনগণের মৌলিক অধিকার ও মতামতের গুরুত্ব অনেক সময় উপেক্ষিত থেকেছে। গণভোট বা জনমতের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমেই কেবল এই বৃত্ত ভেঙে একটি প্রকৃত জনমুখী ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অন্যথায়, কেবল ক্ষমতার হাতবদল হবে, রাষ্ট্রের চরিত্রের কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে না।
প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধানের অনেকগুলি কারণের মধ্যে অন্যতম রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল সুশাসন কাঠামো, নাগরিক সচেতনতার সীমাবদ্ধতা, কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার অভাব। এই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান ও করণীয় হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। আইনের কার্যকর প্রয়োগ শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। নির্বাচনী সংস্কার বাস্তবায়ন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। নাগরিক সমাজের ভূমিকা বৃদ্ধি মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন। সহনশীলতা, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাগুলোকে স্বীকার করে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং টেকসই উন্নয়নকর্মী।













