রাঙ্গুনিয়ায় প্রথমবারের মতো কফি চাষে বাজিমাত

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া | শনিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

চারদিকে ঘন সবুজ পাহাড় আর মেহগনি–সেগুনের ছায়ায় ঘেরা নির্জন পথ। সেই ছায়াবৃত পাহাড়ি ঢালে নজর কাড়ছে সারিবদ্ধ কফি গাছ। আর গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে কফি ফল। কোনোটি গাঢ় সবুজ, কোনোটি পেকে টকটকে লাল। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে এখন এমনই এক দৃষ্টিনন্দন ও সম্ভাবনাময় দৃশ্য। সমতলের প্রচলিত কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ শুরু করে সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়ায় প্রথমবারের মতো কফির এমন বাম্পার ফলন কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

জানা যায়, চা–এর পর বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক জনপ্রিয় পানীয় কফি। বাংলাদেশে কফির বিশাল চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে বাজারে এর দাম চড়া। এমন পরিস্থিতিতে রাঙ্গুনিয়ায় প্রথমবারের মতো কফি চাষের এই উদ্যোগ দেশীয় বাজারে আমদানি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পাহাড়ি কৃষকদের জন্য এক নতুন অর্থকরী ফসলের পথ খুলে দিয়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কফি ও কাজু বাদাম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প– এর মাধ্যমে রাঙ্গুনিয়ায় প্রথমবারের মতো কফি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলার ইসলামপুর, বেতাগী ও পদুয়া– এই তিনটি ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪ হেক্টর জমিতে এরাবিকা জাতের কফি আবাদ হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়ার অন্তত ৩০ জন কৃষক প্রথমবারের মতো নতুন এই জাতের কফি চাষ শুরু করেছেন। কফি চাষ সম্প্রসারণে ২৫টি প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে চারা, সার, কীটনাশক, শেড ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদিত কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ইসলামপুরে একটি কফি প্রসেসিং (প্রক্রিয়াজাতকরণ) মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পাহাড়ি ছায়াযুক্ত স্থানে কফি গাছ সবচেয়ে ভালো জন্মায়। মার্চ–এপ্রিল মাসে সেচ দিলে ফলন ভালো হয়। বীজ কিংবা কলম– দুইভাবেই কফি আবাদ করা যায়। একবার বাগান রোপণ করে সঠিকভাবে যত্ন নিলে ৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ফলন পাওয়া যায়। প্রতি হেক্টরে প্রায় ৭৫০ থেকে ১,০০০ কেজি কফি উৎপাদন সম্ভব।

রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়নের ঢেমিরছড়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ মাহাবুবুল আলম রাঙ্গুনিয়ায় কফি চাষের অন্যতম পথিকৃৎ। ২০২৩ সালে উপজেলা কৃষি অফিসের প্রদর্শনী প্রকল্পের আওতায় তিনি প্রথম কফি চাষ শুরু করেন। কৃষি অফিস থেকে তিনি ৩৫০টি কফির চারা, সার, কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পান। নিবিড় পরিচর্যা আর পরিশ্রমের পর চলতি বছরে এসে তার বাগানের গাছে বাম্পার ফলন এসেছে।

মাহাবুবুল আলমের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, ছায়াবৃত পাহাড়ের ঢালে প্রায় ৩০০টি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল–সবুজ কফি। বাগানের সৌন্দর্য যেমন নজরকাড়া, ফলনও তেমনই আশা জাগানিয়া। কৃষক মাহাবুবুল আলম বলেন, প্রথমবারের মতো কফি চাষ করতে গিয়ে শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। তবে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় বাগান গড়ে তুলি। পরিচর্যা ও অন্যান্য খাতে আমার প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রথমবারই গাছে যে ফলন এসেছে, তা সত্যি আনন্দের। কাঁচা বা কাঁচা–পাকা কফির ফল (চেরি) পাকা অবস্থায় প্রতি কেজি ১২০০ টাকা, কিছুটা প্রক্রিয়াজাত করে ১৫০০ টাকা এবং পাউডার তৈরি করে বিক্রি করতে পারলে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, অনলাইনেই অনেকে যোগাযোগ করে তার বাগান থেকে কফি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাজারে এর দারুণ চাহিদা রয়েছে। সরকারি সহায়তায় সহজ উপায়ে প্রসেসিং ও বাজারজাতকরণের সুবিধা পেলে পাহাড়ে কফি চাষ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। নিজের প্রায় ১২ কানি জমিতে কফি চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

বেতাগী ইউনিয়নের উপ–সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাজান বলেন, মাহাবুবুল আলমকে প্রদর্শনী প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৫০টি কফি চারা দিয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে। সাধারণত কফির চারা রোপণের আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে ফলন দিতে শুরু করে। কফির ফলকে চেরি ফল বলা হয়। জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মাসে গাছে ফুল আসে এবং আগস্ট মাস থেকে ফল পাকতে শুরু করে। প্রথম চাষেই কৃষকেরা সার্বক্ষণিক কারিগরি সহায়তার সুফল পাচ্ছেন।

উপজেলা উপ সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার প্রণব চন্দ্র মজুমদার জানান, নতুন ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ প্রশংসনীয়। কলমের চারা প্রথম বছর থেকেই ফলন দেয়, তবে গাছের বৃদ্ধি ও মজবুত কাঠামোর জন্য প্রথম বছর ফল না নিয়ে গাছকে কিছুটা সময় দিলে পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় কফি একটি একেবারেই নতুন ও অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ফসল। তিনটি ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো কফি চাষে সাফল্য মিলেছে। কৃষকেরা পাকা কফির ফল নিয়ে কৃষি অফিসে আসছেন। প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধার্থে ইসলামপুরে প্রসেসিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। রাঙ্গুনিয়ার মাটি ও জলবায়ু কফি চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। তাই ভবিষ্যতে এ চাষ আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

পাহাড়ের পতিত ও ছায়াযুক্ত জমিতে প্রথমবারের মতো কফি চাষ রাঙ্গুনিয়ার কৃষিতে এক নতুন অর্থকরী বিপ্লব এনে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় বিপণন ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে রাঙ্গুনিয়া খুব শীঘ্রই দেশের কফি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাবে বলে প্রত্যাশা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধবান্দরবানে খালি নেই হোটেল মোটেল