মানুষের যত্নে কিডনি সুরক্ষা, পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার

বিশ্ব কিডনি দিবস ২০২৬

ডাঃ সাদিয়া সুলতানা | বুধবার , ১১ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ

প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস (World Kidney Day) । এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো কিডনি রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরা। ২০২৬ সালের বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য— “Kidney Health for All: Caring for People, Protecting the Planet.” বাংলায় যার ভাবার্থ “সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণী রে।”

এই প্রতিপাদ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিডনি স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত বিষয়ের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই কিডনি রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানুষের পাশাপাশি পরিবেশের বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD)-এ আক্রান্ত। গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো পর্যায়ে কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয় যে দেশে চার কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে ভুগছেন এবং প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ বর্তমানে কিডনি রোগের প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচিত। এর পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে রোগটি অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত হয়, যখন কিডনির কার্যক্ষমতা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

এই বাস্তবতায় কিডনি রোগ প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগের অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব হয়। এর ফলে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি কমে, রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

কিডনি সম্পূর্ণভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিলে রোগীকে সাধারণত Kidney Replacement Therapy (KRT)—যেমন ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের ওপর নির্ভর করতে হয়। যদিও এই চিকিৎসা জীবনরক্ষাকারী, তবে এর সাথে পরিবেশগত প্রভাবও জড়িত। ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ায় প্রচুর পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার হয় এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ফলে আধুনিক নেফ্রোলজিতে এখন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

সাসটেইনেবল বা টেকসই নেফ্রোলজির ধারণা অনুযায়ী ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করা, চিকিৎসা বর্জ্য কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থাকে উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, সম্ভব হলে হোম-বেসড চিকিৎসা পদ্ধতিকে উৎসাহিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

কিডনি সুস্থ রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান করা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা, ধূমপান পরিহার করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলা—এসব অভ্যাস কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম কিডনি চিকিৎসায় একটি উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে অত্যাধুনিক ডায়ালাইসিস ইউনিট, অভিজ্ঞ নেফ্রোলজিস্ট টিম এবং সমন্বিত কেয়ার মডেলের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগীদের জন্য মানসম্মত সেবা প্রদান করা হচ্ছে। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জটিল চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যা রোগীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে।

বিশ্ব কিডনি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় “Caring for People and Protecting the Planet” একে অপরের পরিপূরক। মানুষকে সুস্থ রাখতে হলে প্রকৃতিকে সুস্থ রাখা জরুরি। কিডনি আমাদের শরীরের নীরব রক্ষক; সেই রক্ষককে সুরক্ষিত রাখতে হলে আমাদের নীতি, অভ্যাস এবং উন্নয়নচিন্তায় পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।

আজ বিশ্ব কিডনি দিবসে আসুন আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি নিজের কিডনির যত্ন নেব, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করব এবং অন্যদেরও কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করব। কারণ—সুস্থ কিডনি মানেই সুস্থ জীবন।

লেখক
ডাঃ সাদিয়া সুলতানা
এমবিবিএস, এমডি
অ্যাটেন্ডিং কনসালটেন্ট, নেফ্রোলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম

পূর্ববর্তী নিবন্ধনারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ফ্যামিলি কার্ড মাইলফলক
পরবর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় নকল সাবান কারখানা সিলগালা