রাউজানে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন গিয়াস কাদের, ঐক্যের বার্তা

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ

রাউজানের দুই সন্তান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকার। দুই যুগের বেশি আগে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব থেকে বিএনপির এই দুই নেতার বিরোধের শুরু; যার প্রভাব পড়ে রাউজানেও। বিভক্ত হয়ে পড়েন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। যারা বিভিন্ন সময়ে সংঘাতেও জড়ান পরস্পরের সঙ্গে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নেতার মনোনয়ন দৌড়ে কর্মীদের এ বিভেদ ও দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়।

শেষ পর্যন্ত গিয়াস কাদের দলের চূড়ান্ত মনোয়ন পাওয়ায় মনোবল ভেঙে পড়ে গোলাম আকবর অনুসারীদের। কিছুটা ‘শঙ্কা’ও প্রকাশ করেন তারা। কিন্তু তাদের আশ্বস্ত করে গিয়াস কাদের দিয়েছেন ঐক্যের বার্তা। বললেন, সবাইকে সাথে নিয়ে চলতে চান তিনি।

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা আজাদীকে জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম(রাউজান) ছিল এবার আলোচনার শীর্ষে। মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার নির্দিষ্ট তারিখ শেষ হওয়ার আগেই চট্টগ্রামের ১৫ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে বিএনপি। কিন্তু আটকে ছিল রাউজান। এখানে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকার দুজনকেই প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়া হয়। এর মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর গোলাম আকবরকে ও ২৩ ডিসেম্বর গিয়াস কাদেরকে এ প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়। অবশ্য তারও আগে গিয়াস কাদেরকে ৪ ডিসেম্বর দলের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এছাড়া গোলাম আকবর খোন্দকারকে দেয়া প্রত্যয়নপত্রে ২৭ ডিসেম্বর এবং গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দেয়া প্রত্যয়নপত্রে তারিখ ছিল ২০ ডিসেম্বর।

এদিকে ৯ জানুয়ারি সংবাদিকদের সাথে গুডস হিল বাসভবনে মতবিনিময় করে গিয়াস কাদের জানান, তিনি দলের সর্বোচ্চ লেবেল থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছেন। তখন গোলাম আকবর খোন্দকার দাবি করেন, তাকে এলাকায় গিয়ে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দলের মাননীয় নির্দেশ দিয়েছেন। চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে দুজনের দৃঢ় অবস্থানে তাদের কর্মীদের মধ্যে নেতার প্রতি আস্থার সঙ্গে ছিল অস্বস্তিও। শেষ পর্যন্ত গতকাল গিয়াস কাদেরকে দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয়।

জানা গেছে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা চিঠির মাধ্যমে গিয়াস কাদেরের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর পাঠানো চিঠিতে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দের অনুরোধ জানানো হয়।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া দুই প্রার্থীর মধ্যে একজনকে (গিয়াস কাদের) বিএনপি চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়ায় তাকেই প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। অর্থাৎ অপর প্রার্থী আজ মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলেও দলীয় প্রতীক পাবেন না।

এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম৬ আসনের বিএনপির প্রার্থী হিসেবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। গিয়াস উদ্দিন কাদেরের প্রতিনিধিও একটি চিঠি জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি আমরা নির্বাচন কমিশন থেকেও এ সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছি।

এদিকে গিয়াস কাদেরের মনোনয়ন পাওয়ার খবরে হতাশা দেখা যায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার অনুসারীদের মাঝে। এর মধ্যে যারা এলাকায় বেশি সক্রিয় ছিলেন তারা কিছু শঙ্কা প্রকাশ করেন।

গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী রাউজান উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী আজাদীকে বলেন, যেহেতু বহুদিন ধরে দ্বন্দ্বসংঘাত ছিল, তাই এখন অনেকে শঙ্কিত। এরপরও আমরা আশা করব, ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারা সদাচরণ করবেন। দ্বন্দ্ব ভুলে দলের প্রার্থীর জন্য কাজ করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা ধানের শীষ এবং বিএনপির প্রার্থীর জন্য কেন্দ্র যেভাবে নির্দেশনা দেবে সেভাবে কাজ করব। সেন্ট্রাল নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নির্ধারণ করব।

গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী রাউজান উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ আজাদীকে বলেন, দল যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে তার জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। আশা করছি সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে কাজ করবেন।

কী বললেন গিয়াস কাদের : গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী আজাদীকে বলেন, জাতীয়তাবাদী চেতনার ঐক্য চাই। দ্বিতীয়ত, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে রাউজানকে সন্ত্রাসমুক্ত করব ও শান্ত করব। মনোনয়ন প্রত্যাশী গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীদের হেনস্থা হওয়ার শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে গিয়াস কাদের বলেন, আমি সকল জাতীয়তবাদী শক্তির ঐক্য চাই। সকল জাতীয়তাবাদী প্রেরণার নেতাকর্মীদেরকে আমি জাতীয়তাবাদী ছায়াতলে আনতে ইচ্ছুক।

উল্লেখ্য, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী। অষ্টম (২০০১) ও নবম (২০০৮) সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে বিএনপির প্রার্থী হলেও পরাজিত হন।

এদিকে রাউজান উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রাউজানে কোণঠাসায় ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। শীর্ষ নেতারা ছিলেন এলাকা ছাড়া। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে সক্রিয় হন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে পূর্বের ন্যায় দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েন তারা। যথারীতি এদের এক গ্রুপ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং অপর গ্রুপ গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী। ৫ আগস্টের পরর বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে জড়ান তারা। ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে ১৯টি খুনের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণেই সংঘটিত হয়েছে এসব হত্যাকাণ্ড। অবশ্য গিয়াস কাদের দাবি করেছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী রাউজানে সংঘটিত ১৯টি হত্যাকান্ডের শিকার ১৩ জনই তার অনুসারী। বাকি ৬ জন পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতার কারণে হত্যার শিকার।

জানা গেছে, গত জুলাইয়ে রাউজানে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গোলাম আকবর খোন্দকারসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও পথচারী আহত হয়েছেন। এ সময় কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার জের ধরে উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত এবং গিয়াস কাদেরের দলীয় পদ স্থগিত করা হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগণভোটে অংশ নিয়ে হ্যাঁ-তে সিল দিন : প্রধান উপদেষ্টা
পরবর্তী নিবন্ধপবিত্র শবে বরাত ৩ ফেব্রুয়ারি