চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ আহসান হাবিব পলাশ বলেছেন, পুলিশের লুট হওয়া যেসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো নির্বাচনের আগে কেউ ‘বের করার সাহস পাবে না’। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর নাসিরাবাদে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, যারা লুকিয়ে থাকে, বিভিন্ন সংগঠনের কথা–আপনারা হয়ত না বললেও আমরা কিছু কিছু জানি, ছোটখাটো সংগঠন বা অনেকে আপনারা বলতে চান বিভিন্ন সময় তারা লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারা বের করার সাহস পাবে বলে আমরা মনে করি না, এই নির্বাচনের আগে।
উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, অস্ত্র উদ্ধার তো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে। কিন্তু অস্ত্র এখনো যেগুলো আমরা পাইনি, সেগুলো এখনো আমাদের জন্য কেউ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বের করতে সাহস পাবে বলে আমার মনে হয় না।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর হামলা চালানো হয় দেশের থানা–ফাঁড়ি, পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায়। লুট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় সব। পুলিশের গাড়ি পোড়ানোসহ লুট করা হয় অস্ত্র–গুলি। সে সময় লুট হওয়া বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি। অনেক অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে গেছে এবং ছিনতাই–ডাকাতির মত কর্মকাণ্ডে সেসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে বলে খবর আসছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এখনো এক হাজার ৩৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং আড়াই লাখ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এসব অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য দিতে পারলে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে সরকার। পিস্তল, শটগানের খবর দিলে ৫০ হাজার টাকা, চায়নিজ রাইফেলে এক লাখ, এসএমজির ক্ষেত্রে দেড় লাখ টাকা, এলএমজির জন্য ৫ লাখ টাকা দেওয়া হবে। আর প্রতিটি গুলির জন্য দেওয়া হবে ৫০০ টাকা। নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
অস্ত্র উদ্ধারে কোন বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে কিনা জানতে চাইলে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, আমাদের অপারেশন সবসময় চলছে। যখনই খবর পাচ্ছি, তখনই করছি। আপনারাও আমাদের সাহায্য করেন। অস্ত্র উদ্ধার যে কোনো সময় করা যায়। এটার জন্য বিশেষ অভিযান প্রয়োজন নেই।
রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় কয়েকটি বসতঘরে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৭ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডিআইজি পলাশ। গত ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে হিন্দু বৌদ্ধ ও পাহাড়িদের বাড়িতে আগুন দেওয়ার একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে ‘বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য’ ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেন ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে ‘সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি নেই’–এটা প্রমাণ করা। বাংলাদেশে হিন্দু বৌদ্ধ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ‘নিরাপদ নয়’–এমন ধারণা আন্তর্জাতিকীকরণ করা, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। অর্থাৎ এই জনগোষ্ঠী যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে তারা ভোটের পরিবেশ পাবে না। এ কথাগুলো বলবার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, তাদের আরেকটা জিনিস ছিল যে এই জিনিসগুলোকে ফোকাস করা। সেই পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে ফোকাস হয়নি বলে আস্তে আস্তে তাদের কার্যক্রমের গতি বেড়ে গেছে। সর্বশেষ দুয়েকটা ঘটনায় পুরো বাড়িই ভষ্মীভূত হয়েছে। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছি, তাদের আরো কিছু পরিকল্পনা ছিল। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করা। এবং আরো দুয়েকটা ঘটনা ছিল সেটা আমরা এই মুহূর্তে বলছি না। আরেকটু বড় ধরনের নাশকতার কথাও ভাবা হচ্ছিল।
ডিআইজি বলেন, যদি আমরা গ্রেপ্তার করতে না পারতাম, তাহলে তারা এরকম একটা কাজ করত। মিডিয়া ফোকাস পাওয়ার জন্য মেইনলি। এই জনগোষ্ঠী নিরাপদ নয় আন্তর্জাতিকভাবে এটা প্রমাণ করার জন্য। এই জনগোষ্ঠী যদি বিব্রতকর অবস্থায় থাকে তাহলে বলার সুযোগ পাওয়া যাবে যে তাদের তো ভোটকেন্দ্রে যাবার সুযোগ নাই। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের অনেকেই ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্য’ বলে মন্তব্য করেন ডিআইজি। তিনি বলেন, দুয়েকজন সদস্য রয়েছেন যারা ভাবছেন যে এই কার্যক্রমগুলো করার মাধ্যমে যদি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে তাদের অনেক নেতানেত্রী দেশে ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। তাদের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। তাদের যে কিছু নেতাকর্মী জেলে রয়েছে, তাদের বেরোনর পথ সুগম হবে। মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থ লগ্নিকারী ও বাস্তবায়নকারী সবারই তথ্য আমরা পেয়েছি। জড়িত সবাইকে পুরোপুরি গ্রেপ্তার করা এখনো সম্ভব হয়নি। তদন্তের স্বার্থে আমি নামগুলো আপনাদের সামনে প্রকাশ করতে চাচ্ছি না এ মুহূর্তে। তদন্তের মাধ্যমে পুরো বিষয়টা বের হয়ে আসবে। বের হয়ে এলে আশা করি এরকম ঘটনাগুলো আর এই এলাকায় ঘটবে না।
নিষিদ্ধ সংগঠন বলতে কোন সংগঠনের কথা বলছেন? এ প্রশ্নে ডিআইজি বলেন, আপনারা নিজেরাও জানেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন কারা রয়েছে। তাদের সদস্যরা রয়েছেন। এই ঘটনায় যে সম্পৃক্ত ব্যক্তি রয়েছেন তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে সমস্ত ঘটনা বিবৃত হয়েছে। তার আলোকে আমাদের এই বক্তব্য। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ২–৩ জন এবং পরিকল্পনাকারী ও অর্থ লগ্নিকারী সেই সংগঠনের সদস্য। তাদের ধরতে পারলে বাকি কাজটুকু সহজ হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এসব ঘটনায় বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর বাইরে থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যানারের বিষয়ে আহসান হাবিব পলাশ বলেন, লেখার মধ্যে তিন ধরনের বক্তব্য রয়েছে। যিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন তার কিছু ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল। সেই ব্যক্তিগত শত্রুতার নামগুলো এসেছে। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক কিছু ব্যক্তির নাম এসেছে আরেকটা ব্যানারে। আর তৃতীয়ত, পুলিশ সদস্য যারা রয়েছেন তাদেরকে এক ধরনের হুমকি এবং তাদের আমরা ধরতে পারব না এ সম্পর্কিত প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পুরো কার্যক্রমে ১৬–১৭ জনের নাম পেয়েছি আমরা। এখানে শুধুমাত্র কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠী রয়েছে তা নয়।
তিনি বলেন, এই গ্রুপের মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সবাই আছে। মূল কাজটাই হচ্ছে হিন্দু বৌদ্ধ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা । তারা যেন এটা দেখে রাস্তায় নেমে আসে। হই হুল্লোড় করে সরকার বিব্রত হয়, এটাই। এখনো এসব ঘটনায় জড়িত ১০–১২ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের ধরলে হয়ত জানা যাবে এর পিছনে কারা আছে। এটা বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার প্রতিফলন না বলে মন্তব্য করে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, যে বাংলাদেশের মুসলমান মানুষ হিন্দুর উপর আক্রমণ করছে বিষয়টা তা মোটেও নয়। এই ১৬–১৭ জন লোকের একটা প্যাকেজ। তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অথচ আমাদের সবাইকে ব্লেইম নিতে হচ্ছে যে আমার বোধহয় হিন্দু গোষ্ঠীর উপর চড়াও হচ্ছি। বাস্তবতা কিন্তু সেটা নয়। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা মূলত রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও রাঙামাটি এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় এসব ঘটনা ঘটানো সম্ভব হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ডিআইজি।
এসব ঘটনায় মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মোহাম্মদ পারভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, কেরোসিন তেলের দুটি কন্টেনার ও একটি বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে তেলমাখা একটি লুঙ্গি ও একটি পুরোনো কালো শার্ট। এছাড়া একটি মোবাইল ফোন ও ঘটনাস্থলে যাতায়াতে ব্যবহৃত হওয়া একটি সিএনজি অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অগ্নিসংযোগ, উসকানি ও সামাজিক সমপ্রীতি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে আমাদের যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল কিন্তু আমরা যেতে পারিনি। আমরা কাজ করব সেখানে। কোন কোন জায়গায় যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। বাকি জায়গাতেও দুয়েক দিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে।
ভোটের আগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ডসহ নানা ঘটনায় কোনো চ্যালেঞ্জ বোধ করছেন কিনা–এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, আমার তো কোন চ্যালেঞ্জই মনে হচ্ছে না। চট্টগ্রাম রেঞ্জে প্রায় ৫৪টার মত আসন রয়েছে। আমি কোথাও কোনো চ্যালেঞ্জ বোধ করছি না। কোনো জায়গায় ভোটের পরিবেশে বিঘ্ন হওয়ার মত কোনো ঘটনা ঘটছে না। ভোটের আগে অনেক সময় ছোটখাটো ঘটনা ঘটে। বিভ্রান্তিমূলক তথ্য আসে। সোশাল মিডিয়াতে অনেকে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট করে। এগুলো তো সবগুলো বিশ্বাস করার প্রয়োজন নাই। এবং আমি কোনো রকমের চ্যালেঞ্জ ও থ্রেট অনুভব করছি না কোনো জায়গা থেকে। চট্টগ্রামে তো নয়ই।
চট্টগ্রাম জেলার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র তো থাকেই। স্বাভাবিকভাবে এবারও ঝুঁকিপূর্ণ কিছু ভোট সেন্টার রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা জনবল বাড়িয়ে দিই এবং আমাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিই। আমাদের টহল টিম সেই জায়গাগুলোতে বাড়িয়ে দিই। আমি মনে করি না, আমাদের লেভেলে ঝুঁকিপূর্ণ হইলে এটা বড় কোনো থ্রেট হবে ভোটের জন্য।
ডিআইজি বলেন, রাউজান বা সাতকানিয়ায় কিছু ঘটনা ঘটছে। এগুলো আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু প্রত্যেকটা ঘটনা আমরা তদন্ত করে বের করতে সক্ষম হচ্ছি। আমরা মনে করি না, ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত করার কোনো ঘটনা এখানে ঘটবে। সুস্থ সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করবে।












