
বাংলা সাহিত্যের এক যুগান্তকারী প্রতিভা, আধুনিক নাট্য রচনার পথিকৃৎ মাইকেল মধুসূদন তাঁর সৃষ্টিসম্ভার অকাতরে ঢেলে দিয়েছেন দেশ ও জাতির জন্য। নাটকে জ্বালিয়েছেন নতুন দ্বীপশিখা। সবকিছু উজাড় করে, নিজেকে নিঃশেষ করে তিলে তিলে দগ্ধ হয়েছেন তিনি। বাংলার মহাকবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদনের মর্মান্তিক করুণ পরিণতি আজও আমাদের বেদনাসিক্ত করে তোলে। তাঁর জন্মদিনে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি।
১৮৫৮ সালে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় ‘রত্নাবলী’ নাটক দেখার পর তিনি ক্ষুব্ধ হন। তাঁর অভিযোগ ছিল, এসব সংস্কৃত নাটকে আধুনিক চিন্তা–চেতনার ছোঁয়া নেই। অতঃপর তিনি ঘোষণা দেন নিজেই নাটক লিখবেন। প্রকৃত অর্থে ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘শমিষ্ঠা’ নাটকই বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও মৌলিক নাটক। প্রথম ঐতিহাসিক ও বিয়োগান্ত নাটক ‘কৃষ্ণকুমারী‘ প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ রচনার জন্য মাইকেল বিখ্যাত হন তার প্রথম প্রয়াস দেখা যায় ‘পদ্মাবতী‘ নাটকে। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে। ‘সুভদ্রা’ ‘রিজিয়া‘,‘’মায়াকানান’ নামে আরো তিনটি নাটক রচনা করেন তিনি। তাঁর দুটি বিখ্যাত প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এটা নিঃসন্দেহে বল্য যায়, তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য জীবনের প্রেরণা ছিল নাটক।
জন্ম থেকে মৃত্যু (১৮২৪–১৮৭৩) মাত্র ৪৯ বছর। একদিকে প্রাণপ্রাচুর্যে সৃষ্টির নেশায় ব্যাকুল, আরেকদিকে দুঃখ–হতাশা–গ্লানি প্রতি মুহূর্তে তাকে অস্থির করে তুলেছে। সমাজের কুসংস্কারকে তিনি ঘৃণা করতেন। তথাকথিত সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আশৈশব উচ্চকণ্ঠ। আত্মপ্রত্যয়ী ও দৃঢ়চেতা মাইকেল মধুসূদনের জীবননাট্যও ছিল নাটকীয় ঘাত–প্রতিঘাতের মতো। তিনি খ্রিষ্টান হলেন, বাবা ত্যাজ্যাপুত্র করলেন। দেবকীর সঙ্গে বিয়ের কথা চলছিল, সেটিও এক সময় ভেঙে যায়। প্রথমে রেবেকা, পরে হেনরিয়েটার সঙ্গে বিয়ে। মাদ্রাজ ও বিলেতে যাওয়া। হতাশা ও দুঃখ–দারিদ্র্যের মধ্যেও একের পর এক লিখেছেন নাটক, মহাকাব্য এ চতুর্দশপদী কবিতা। অভাব–অনটন, অর্থাভাব, এরই সঙ্গে অপরিমিত মদ্যপান– এভাবেই ভাগ্যবিড়ম্বিত মাইকেল জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটে।জীবনীমূলক নাটক লেখার জন্য একেবারে নাটকীয় উপাদান। মাইকেলের জীবন–চরিত নিয়ে রচিত হয়েছে একাধিক নাটক ও যাত্রাপালা। যেমন:বনফুলের শ্রীমধুসূদন (১৯৩৯), মহেন্দ্র গুপ্তের মহাকবি মাইকেল (১৯৪২), অজয় চক্রবর্তীর মহাকবি (১৯৫২) নিতাই ভট্টাচার্যের মাইকেল মধুসূদন (১৯৪৩), বিধায়ক ভট্টাচার্যের যাত্রাপালা বিদ্রোহী মাইকেল (১৯৬৬) এবং ১৯৯৩ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় আইডিইল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মুহম্মদ শফির রচনায় মহাকবি মধুসূদন নাটক। মধুসূদন চরিত্রে অভিনয় করেছেন এমন কয়েকজন বিখ্যাত অভিনেতার নাম– নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী, নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরী, যাত্রানট স্বপন কুমার প্রমুখ। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে মাইকেলের জীবনীমূলক নাটা মঞ্চায়নের সূচনা হয়।
আজ থেকে ৫৩ বছর আগে ১৯৭৩ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোরের সাগরদাঁড়িতে মধুকবির ১৪৯তম জন্মজয়ন্তীতে মঞ্চস্থ হয় যাত্রাপালা ‘বিদ্রোহী মাইকেল মধুসূধন‘। এই মহৎ পালা মঞ্চায়নের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন যশোরের তদানীন্তন জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ। চট্টগ্রামের বাবুল অপেরার পরিবেশনায় মাইকেল যাত্রার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে সামগ্রিক যাত্রাশিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন স্বনামধন্য নট অমলেন্দু বিশ্বাস। এই ঘটনার ২০ বছর পর বনফুলের শ্রীমধুসূধন মহিলা সমিতিতে মঞ্চস্থ হয় নাগরিক নাট্য সমপ্রদায়ের পরিবেশনায়। মধুকবির চরিত্রে অভিনয় করেন সালেক খান। বিভিন্ন ভূমিকায় ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত, ইনামুল হক, লাকী ইনাম, বিপাশা হায়াত প্রমুখ। নির্দেশনায় ছিলেন জামাল উদ্দিন হোসেন। দীর্ঘ বিরতির পর ‘বিদ্রোহী মাইকেল’ যাত্রাপালা নতুন বিন্যাসে মঞ্চায়ন শুরু হয় ২০০৭ সালের অক্টোবর থেকে। এ পর্যায়ে মাইকেলের রূপসজ্জায় মঞ্চে উপস্থিত হন অমলেন্দু বিশ্বাসের ছেলে মিঠু বিশ্বাস। পরবর্তী পর্যায়ে অরুণ কুমার কুন্ডের রচনায় ভিন্নধর্মী মাইকেলের অভিনয় করেন নাট্য ব্যক্তিত্ব অনন্ত হীরা।
লেখক : বিশিষ্ট যাত্রানট ও গবেষক; বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ফেলো।







