ডাক্তারমামার শিশু–চেম্বারের বয়স তিরিশ বছর। তিরিশ বছরে অনেকে হয়তো তিরিশ–বার এভারেস্ট চূড়োয় আরোহণ করেছেন, কেউবা চাঁদে ভ্রমণ করেছেন তিরিশবার, অথবা কেউ কেউ মেঘনীল আকাশ হতে পেড়ে এনেছেন তিরিশটা রুপালি তারা। কিন্তু ডাক্তারমামার জগত বলতে কেবল চেম্বার। শিশু–মেলার চেম্বার। সেখানে প্রতিদিন ঘটে রহস্যময় ঘটনা। তবে গতকালের মতো এরূপ ঘটনা এত বছরের চেম্বার–জীবনে আর কখনো ঘটেনি।
যমজ শিশু রুম্্বা–সোফিয়া। ভাই–বোন। একজন যদি হয় ফুলকুমার, অন্যজন যেন ফুলপরী। দূর থেকে বোঝা যায় রুম্বার হাত দুটো কিছুটা নীলচে। সে এসেছে নীল ফুলহাতা শার্ট সাদা ফুলপ্যান্ট পরে। সোফিয়ার হাত দুটো গোলাপি বর্ণের, চোখের মণি নীল–যা সচরাচর এ দেশে দেখা যায় না। তার পরণে গোলাপি রঙের পোশাক।
যমজ শিশুর ক্ষেত্রে ডাক্তারমামা তিন–তিনটা বার্তা পরিবেশন করেন। প্রথমত দু’জনের জন্য আলাদা রঙের পোশাক নির্বাচন করা। দ্বিতীয়ত আলাদা আলাদা দিনে জন্মদিন উদ্্যাপন। তৃতীয়ত দুজনকে আলাদা আলাদা বাজারজাত নামের ওষুধ প্রদান। এতে করে তাদের আলাদা ব্যক্তিসত্তা প্রকাশ পায়। সেই হিসাবে তাদের আজকের পরিধেয় পোশাকের মাহাত্ম্য ঠিক আছে।
রুম্বা–সোফিয়ার মায়ের নাম রোজি। তিনি আগেরদিনের এপয়েন্টমেন্ট মতো দুই সন্তানকে নিয়ে চেম্বারে এসেছেন। ডাক্তারমামার চেম্বারে প্রবেশমাত্র দু’জনের উচ্ছাসপূর্ণ সম্ভাষণ– ‘ডক্টর আঙ্কেল, হাউ আর ইউ?’
প্রত্যুত্তরে চেয়ার ছেড়ে ওঠেন ডাক্তার। কাছে গিয়ে বলেন-‘স্বাগতম, সুস্বাগতম। আমি বেশ ভালো আছি। তোমরা আছো কেমন? রুম্্বা–সোফিয়া একসাথে জবাব দিলো-‘ভেরি ফাইন’। তারপর তাদের সে কি হাসির কল্লোল। তাতে রুমে জ্বলে ্ওঠলো হাজার পাওয়ারের বিদ্যুৎ। ডাক্তারমামা চেম্বারের খেলনাগুলো তাদের খেলতে দিলেন। সেসব নিয়ে দুজন ছুটতে লাগল চেম্বারের ভেতরে, এদিক ওদিক।
‘এদের কেন এনেছেন? এরা তো দি্ব্যি ভালো। শিশুশাস্ত্র মতে– শিশু যদি ঠিকমত খায়–দায়, ঠিকঠাক বাড়ে, খেলাধুলা করে বুঝতে হবে তাদের কোনো অসুখ নেই’– ডাক্তার মামার বচন।
ওদের মা রোজি জানান– ‘ওরা কিছু খায় না ’।
‘শোনেন, শিশু তার প্রয়োজনমাফিক খাবার ঠিকই খেয়ে নেয়। হয়তো সকালে খেলে দুপুরে খায় না, দুপুরে খেলে রাতে খায় না, কিন্তু সে তার খাবারের পরিমাণ সাপ্তাহিক হিসেবে ঠিক রাখে। সুতরাং একবেলা, বা কোনো একদিন না খেলে জোরাজুরি করতে নেই। তবে বাচ্চারা খাবারের স্বাদ খুব বোঝে। যেমন–তেমন রান্না ওরা পছন্দ করে না ’।
মা এক গাল হেসে আবারো বলেন– ‘ওরা কোনো কিছু খায় না ’।
‘ হ্যাঁ আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী না খেলেও ক্ষতি নেই। যেহেতু ওদের বাড়ন স্বাভাবিক ’। রুম্্বা ও সোফিয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করে মামা জিজ্ঞেস করেন– ‘তোমরা কী কী খেতে পছন্দ কর? চিপস্, জুস, আইসক্রিম কি তোমাদের খুব পছন্দ ’!
দু’জনই একবার বামে, একবার ডানে মাথা নেড়ে বলে ‘নো নো নো। আমরা খাই না ’।
‘বা: বা: তোমরা কতো সুবোধ! ভালোর শিরোমণি। ধন্য তোমাদের মা ’।
এরকম উপাধি পেয়ে দ’জন খুশিতে টয়টম্বুর। সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিয়ে গেয়ে উঠল-‘ইয়েস ইয়েস ইয়েস’।
মাকে লক্ষ্য করে ডাক্তার–মামা জানতে চান– ‘আর কি কি সমস্যা ওদের’?
মা বললেন– ‘ওদের আপনাকে দেখাতে এনেছি’।
গলার স্টেথোখানা ওদের হাতে দিয়ে খেলতে দেন মামা। তাতে ওরা বেশ ঘটা আনন্দ পেল। এরপর প্রথমে রুম্্বাকে পরীক্ষা করতে গেলেন। হাতের পালস্ দেখলেন। সে কি নাড়ি যে পাওয়া যাচ্ছে না ! ফুসফুসে স্টেথো বসালেন। না, নেই শ্বাসপ্রশ্বাস ধ্বনি। হৃৎপিন্ড পরীক্ষাতেও মিলছে না কোনো হৃদ্স্পন্দন। স্টেথোর চেস্ট–পিজে কয়েকবার টোকা দিলেন ডাক্তারমামা। তারপর বিচলিত স্বরে বললেন– ‘হ্যাঁ ভালো আছে’। অত:পর দ্রুত সোফিয়াকে পরীক্ষা করতে যান মামা। তদ্রুপ অবস্থা। নেই পালস, নেই ব্রেথ সাউন্ড, হার্ট সাউন্ড।
মাথা চক্কর দিতে লাগল ডাক্তারের। বিড়বিড় করে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন– এরা বেঁচে আছে কি করে! নার্ভাস উচ্চারণে মায়ের দিকে তাকিয়ে জানান– ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ এরা পুরো সুস্থ ’।
সপ্রতিভ মা রোজি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা এঁকে জানান– ‘এদের কোনো অসুবিধা নেই। নতুন শিশুতো ! তাই আপনাকে দেখাতে এনেছি ’।
‘ নতুন ! এরা তো বেশ বড়সড় হয়েছে ’।
‘ হ্যাঁ এরা আমার রোবট শিশু ’।
ডাক্তার–মামা সবসময় স্কুলের ফলাফলে সেরা ছিলেন। আজ মনে হলো পরীক্ষায় তিনি ফেল মেরেছেন। আপনমনে মিলাতে চেষ্টা করেন-‘তাইতো! ওদের খেতে হয় না। পালস নেই। ফুসফুস ও হার্টের ধ্বনি নেই। সব তাহলে এ কারণেই! তবে একটা জায়গায় ভুল হয়েছে–তাদের হাতের তালু পরীক্ষা করা হয়নি। কিন্তু এখন তা শোধরানোর উপায় নেই’।
তবুও ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে ডাক্তারমামার বাণী-‘হ্যাঁ। তা যাই হোক শিশু তো শিশুই। সব শিশু দেখতে সুন্দর। আর সকল শিশুই আমার প্রিয়’।
‘তোমরা আবার এসো রুমবা–সোফিয়া। বিদায় বেলায় চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে দেন ডাক্তার মামা। তাঁর হৃদয় বাষ্পীভূত, চোখ জলার্দ্র। রুমবা–সোফিয়া তা দেখতে পায়নি। বরং হাসিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে সহাস্য–হাতগুলো বেলুনের মতো উড়িয়ে আওয়াজ তুলল– ‘বাই বাই , আওয়ার সুইট ডক্টর আঙ্কেল’।
লেখক: প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।











