তেহরানের প্রায় সব ট্রাফিক ক্যামেরাই বহু বছর ধরে হ্যাক করে রেখেছিল ইসরায়েল। জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তারা যখন তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিট সংলগ্ন কার্যালয়ে কাজে যেতেন, ইসরায়েলিরা তাদের ওপর নজরে রাখত বলে উঠে এসেছে ব্রিটিশ দৈনিক ফিনানশিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে।
গত শনিবার তেহরানের ওই কম্পাউন্ডেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ফিনানশিয়াল টাইমস লিখেছে, একটি ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের জন্য বেশ সুবিধা করে দিয়েছিল, যা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ওই কমপ্লেঙের ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে ইসরায়েলকে জানার সুযোগ করে দিয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, জটিল অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ওই কমপ্লেক্সের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ছিল তাদের ঠিকানা, দায়িত্ব পালনের সময় এবং কর্মস্থলে যাওয়ার পথ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, তারা সাধারণত কাকে নিরাপত্তা ও পরিবহন সেবা দিতেন, তাও বের করে ফেলে ইসরায়েলিরা। খবর বিডিনিউজের।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা একে বলেন ‘প্যাটার্ন অব লাইফ’। এই চেষ্টা ছিল বহু বছর ধরে চালানো এক গোয়েন্দা অভিযানের অংশ, যা শেষ পর্যন্ত ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার সুযোগ করে দেয়। শনিবার সকালে খামেনি ঠিক কখন কার্যালয়ে থাকবেন এবং কারা তার সঙ্গে যোগ দেবেন সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে ইসরায়েল ও সিআইএ যেসব কৌশল ব্যবহার করেছিল, তার মধ্যে রিয়েল–টাইম ট্রাফিক ডেটায় নজরদারি হল একটি।
এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলের ওই কমপ্লেক্সে একটি বৈঠকের তথ্য পান ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এবং সে অনুযায়ী হামলার সময় এগিয়ে আনা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, খামেনিও যে সেখানে উপস্থিত থাকবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছিল সিআইএ। ফিনানশিয়াল টাইমস লিখেছে, পাস্তুর স্ট্রিটের আশপাশের প্রায় এক ডজন মোবাইল ফোন টাওয়ারের কিছু অংশ ইসরায়েল অচল করে দিতে সক্ষম হয়, যাতে ফোন করলে ব্যস্ত দেখায় এবং খামেনির নিরাপত্তা টিম সম্ভাব্য সতর্কবার্তা না পায়। ইসরায়েল তাদের শত্রু দেশের রাজধানীতে এমন গোয়েন্দা জাল বিছাতে সক্ষম হয়েছে মূলত দীর্ঘদিন ধরে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। তাতে বড় ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ৮২০০, মোসাদের বসানো বিপুল সংখ্যক গুপ্তচর এবং সামরিক গোয়েন্দাদের প্রতিদিনের ব্রিফের মাধ্যমে পাওয়া বিপুল তথ্যভাণ্ডার। সোশাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস নামে পরিচিত একটি গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ইসরায়েল শতকোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করেছে। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ভেতরে মোসাদের শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেবার হামলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে এক ডজনের বেশি ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ফিনানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমরা প্রথমে তাদের চোখ অন্ধ করে দিয়েছিলাম। জুনের যুদ্ধ এবং সামপ্রতিক হামলায় ইসরায়েলি পাইলটরা ‘স্প্যারো’ নামে পরিচিত এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেন, যার কিছু সংস্করণ ১০০০ কিলোমিটারের বেশি দূর থেকে ডাইনিং টেবিলের সমান ছোট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এই প্রতিবেদনের জন্য ইসরায়েলের সাবেক ও বর্তমান আধা ডজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে ফিনানশিয়াল টাইমস। ব্রিটিশ পত্রিকাটি লিখেছে, খামেনিকে হত্যা করা কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
খামেনি হত্যার ওই অভিযানের সব বিবরণ এখনো জানা যায়নি; কিছু তথ্য হয়ত কখনোই প্রকাশ করা হবে না। হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর মত খামেনি আত্মগোপনে থাকতেন না। নাসরাল্লাহ বছরের পর বছর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে কাটিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলের একাধিক হত্যাচেষ্টা এড়িয়ে যান। পরে বৈরুতে তার আস্তানায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান প্রায় ৮০টি বোমা ফেললে তিনি নিহত হন। অন্যদিকে ইরানের রাস্তায়, বিলবোর্ডে, দোকানে–সর্বত্র খামেনির ছবি শোভা পেত। তাকে যে হত্যা করা হতে পারে, সে কথা তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন। তার ভাষায়, ইরানের ভবিষ্যতের তুলনায় তার নিজের জীবন নিতান্তই তুচ্ছ। সিআইএ ও ইসরায়েল যখন নিশ্চিত হয় যে শনিবার সকালে পাস্তুর স্ট্রিটের কার্যালয়ে খামেনি বৈঠক করবেন, তখন তাকে এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশকে একসঙ্গে হত্যার সুযোগ তৈরি হয়। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের খুঁজে বের করা অনেক কঠিন হত, কারণ ইরানিরা দ্রুত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার মত কৌশল নিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি জড়ো করা হচ্ছিল। আবার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনাও শুরু হয়েছিল। মধ্যস্থতাকারী ওমান জানিয়েছিল, ইরান কিছু ছাড় দিতে রাজি ছিল এবং গত বৃহস্পতিবারের বৈঠক ‘ফলপ্রসূ’ হয়েছিল। হামলার পরিকল্পনা কয়েক মাস ধরে চললেও খামেনি ও তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গত শনিবার সকালে ওই কমপ্লেঙে বৈঠক করবেন নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে ছিল হ্যাক করা ট্রাফিক ক্যামেরার ছবি এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স। বৈঠক নির্ধারিত সময়েই হচ্ছিল এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সেখানে যাচ্ছিলেন।
তবে ফিনানশিয়াল টাইমস লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আরো ভালো একটি সূত্র ছিল, একজন ব্যক্তি, যিনি ভেতর থেকে তথ্য যোগাচ্ছিলেন। সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দুই দেশকে চূড়ান্ত হামলার সুযোগ এনে দেয় এবং তারা তা বাস্তবায়ন করে।
ওয়াশিংটনে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, ইরানে শুরু হয়েছে নতুন সকাল। ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলেন। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের ভাষ্য, মার্কিন বাহিনী সাইবার হামলার মাধ্যমে ইরানের নজরদারি, যোগাযোগ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানের জন্য তেহরানের আকাশ খুলে দেওয়া হয়। ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লেখেন, সে (খামেনি) আমাদের গোয়েন্দা ও অত্যন্ত উন্নত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এড়াতে পারেনি। তার বা তার সঙ্গে নিহত অন্য নেতাদের কিছুই করার ছিল না।
ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জানায়, প্রায় ২০০টি জঙ্গি বিমান ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় সামরিক ফ্লাইওভার’ সম্পন্ন করে এবং প্রায় ৫০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
ট্রাম্প ফঙ নিউজকে বলেন, নিহত হওয়ার সময় ইরানি কর্মকর্তারা সকালের নাশতার টেবিলে বসেছিলেন। পরদিন রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কালো ব্যানারে খামেনির ছবি প্রচার করে তার মৃত্যুর খবর দেয়।











