মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে পরিবারের একটি করুণ স্মৃতি!

মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া | মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

তারিখটি ছিল ২৩ শে মার্চ ১৯৭১। আমার বাবা মরহুম মো: ফখরুল ইসলাম ভূঁইয়া (বিসিএস, সমবায়) সে সময়ে চাঁদপুর মহকুমার সমবায় বিভাগের মহকুমা (Sub-Division) পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। সরকারি জরুরি কাজে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে চাঁদপুর ত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ ঢাকার অফিসিয়াল কাজ সম্পন্ন করে ২৬ মার্চ চাঁদপুরে ফেরার কথা ছিল বাবার। কিন্তু গত ২৫ মার্চ রাতে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা ঘটে গেল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার বুকে। পাকিস্তানী জান্তারা গভীর রাতে নিরস্ত্র মানুষদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তৎসময়ের ইপিআর, পুলিশ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং অগণিত মানুষজনের আর্তনাদে ঢাকা শহরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বাঙালি জাতি থামেনি। কার্ফু থাকা সত্ত্বেও সকল পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ যার নেতৃত্বে ছিল রাজনীতিবিদ এবং বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা। এর পরের ইতিহাস আমাদের পূর্বের প্রজন্ম ও আমাদের সময়ের প্রজন্মরা ভালো করেই জানেন। পরিবারের পক্ষ হতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। যা হোক, আমি আমার বাবার বিষয়ে ফিরে আসি। ঢাকার অপ্রত্যাশিত ঘটনা জানার পর আমার বাবার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। বাবার নিখোঁজে সহ্য করতে না পেরে আমাদের প্রিয়তমা মা দারুণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অসুস্থ অবস্থায়ও মা দোয়াকালাম পড়ে সৃষ্টিকর্তার নিকট আকুল আবেদন করে যাচ্ছেন। আমার বড় বোন এবং ছোট ভাইবোনদের আহাজারী আমার বালকসুলভ মনকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল কারো সাথে যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। নিকটতম একজন আত্মীয়কে ডেকে আমি আমার আত্মীয়সহ দুজনে সকাল হতে রাত পর্যন্ত বাবার অপেক্ষায় এবং চাঁদপুরের প্রতিটি লঞ্চস্টীমার ঘাটে বাবাকে খুঁজে বেড়াতাম কিন্তু বাবাকে খুঁজে পাচ্ছি না। উল্লেখ্য যে, তখন ঢাকা হতে চাঁদপুর আসার একমাত্র বাহন ছিল লঞ্চ অথবা স্টীমার। এদিকে মা এবং ভাইবোনদের টেনশনে আমি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি। পরপর তিন কর্মদিবসে বাবার খোঁজ না পেয়ে আমি ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ি। কী ধরনের বিভীষিকাময় সময় কাটিয়েছি এই মুহূর্তে আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

২৮ মার্চ অর্ধমৃত অবস্থায় বাড়ির গেট পার হয়ে বাবা ভাঙা গলায় ডেকেছিল কইরে তোরা আমি মরিনি আমি ফিরে এসেছি আনেকটা গোঙানীর মত আওয়াজ পরিবারের সবাই শুনতে পেল। আমি এবং আমার আত্মীয় ভাইটি ছিলাম তখন লঞ্চস্টীমার ঘাটে। বাড়িতে ফিরে বিশদ জানতে পারলাম। দুপুরের পর ক্ষুধার্ত দেহ নিয়ে আমি প্রায় ৫ কিলোমিটার হেঁটে বাসায় ফিরলাম। বাবার আগমনের কথা শুনে আমি অনেকটা বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। আমার চোখে মুখে আনন্দের অশ্রু বইতে লাগলো। পরিবারের বড় বোন আমাকে ইশারায় শব্দ না করার জন্য অনুরোধ করলো। যেহেতু বাবা ক্লান্ত এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে বিশ্রামে আছেন। আমি যেন টু শব্দটিও না করি। আমি দূর হতে বাবাকে দেখে অপরিচিত একজন মানুষ মনে হলো। কেমন একজন সুন্দর মানুষটা অসাড় দেহ নিয়ে শুয়ে আছে। এলোমেলো বড় গোঁফ এবং খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেষ্টিত এক বিবর্ণ শরীরে বাবাকে অন্যরকম মনে হয়েছিল। বুঝতে পারলাম বাবাতো অনিদ্রায়, বুভুক্ষু অবস্থায় ছিল। পায়ে হেঁটে এবং বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যেও স্ত্রী এবং সন্তানদের দেখার ব্যাকুলতায় ফিরে এসেছে আপনজনদের মাঝে। নতুনভাবে বাবার আগমনে সৃষ্টিকর্তার নিকট আমরা কৃতজ্ঞ। বাবার এই অন্তিম ও দূরদর্শী ভ্রমণ কাহিনি আমাদের পরিবারের সকলেই স্মরণ করবে চিরদিন। মার্চ৭১ আমাদের পরিবারের জন্য অতি ক্ষুদ্র একটি স্মৃতি যুক্ত হলো। এজন্য আমরা গর্বিত।

বাবার মন্তব্য ছিল, যে বীভৎস এবং অমানবিক চিত্র আমি ঢাকার বুকে স্বচক্ষে দেখে এসেছি এরপর আমি নিজেকে এবং পরিবারকে নিরাপদ ভাবছি না। পরবর্তীতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে গ্রামের বাড়িতে আমরা সবাই আশ্রয় নিয়েছিলাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসবুজ লালে মিশেল মানচিত্র
পরবর্তী নিবন্ধপ্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্ত : সার্বিক পর্যালোচনা