মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি

দীপক বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

তখনও মুক্তি যুদ্ধের ট্রেনিং এ কেউ যায়নি। পঁচিশে মার্চ রাতে প্রচুর গোলাগুলির শুরু হয়। আমরা আসকার দিঘির উত্তর পাড়ে সার্সন রোডের বাসায় ঘুমিয়ে। সারারাত গোলাগুলি হয়। হঠাৎ গুলির শব্দে সবার ঘুম ভাঙে। পাখি ডাকার সাথে ভোর হয়। নিরাপদে থাকার জন্য বাবা সহ সবাই গ্রামের বাড়িতে চলে যাই।

তখন থেকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে পাশের দেশ ভারতে যাবার। ভারত থেকে ট্রেনিং শেষে শত্রুসেনা থেকে দেশকে মুক্ত করতে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের শুরু। তখন আমি মেট্রিক পরীক্ষা পাশ করে ইন্টারমেডিয়েট এ ভর্তি হয়েছি মাত্র। মুক্তিযুদ্ধ নিজের চোখে দেখেছি। আমাদের পাশাপাশি গ্রাম নাজিরহাটে যুদ্ধ দেখে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম গল্প লেখার ইচ্ছে জাগে। দেশ স্বাধীনের পর শিশুদের অনেক গল্প, ছড়া লিখেছি। আমারই সম্পাদিত চর্যার চতুর্থ সংখ্যায় ১৯৮৪ সালে প্রথম বড়দের স্বাদহীন স্বাধীনতা নামে গল্প লিখি।

গল্পটার মুক্তিযোদ্ধা বাড়ির পাশেই তার বাড়ি ছিল। মূলত সেই বাড়ির কানু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতে যায়। ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে একদিন রাতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সহ আমাদের বাড়িতে আসে। সেদিন তার হাতে দেখলাম গ্রেনেড, স্টেনগান এস এ লার। তাকে দেখে তার মুখে যুদ্ধের কথা শোনে মুক্তিযুদ্ধের গল্প ছড়া কবিতা লিখতে আগ্রহ হয়।

প্রতি বছর মার্চ মাস এলেই কলমকে থামাতে পারি না। নয় গল্প নয় ছড়া না হয় একটা কবিতা কলমের খোঁচাতে বেরুবেই। চোখের সামনে স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকায় খ্যাতিমান লেখকের মুক্তিযুদ্ধ বিষয় লেখা পড়ে বৈষয়িক জ্ঞান অর্জন করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়।

আমি শুধু আমার গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দেখেছি। পুরো বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধার নানা অভিনব লোমহর্ষক গল্প পড়ে জেনেছি। অনেক কিছু জানার পরে শিশুদের জন্য ও প্রচুর গল্প লিখেছি। জাতীয় পত্রিকা ইত্তেফাক, ভোরের কাগজ, মানবকণ্ঠ, যায়যায়দিন, প্রতিদিনের সংবাদে শিশুদের এবং চট্টগ্রামের আজাদী, পূর্বকোণ, সুপ্রভাত বাংলাদেশ, পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক স্লোগান, এবং কিশোরবেলা, শিল্পশৈলী ম্যাগাজিনে লিখেছি। বড়দের জন্য লিখেছি আমার মন ছুঁইয়ে যাওয়া বিজয় সূর্য এবং মুক্তিযোদ্ধা তোতা গল্প। আরও অনেক গল্প লিখেছি।এ মুহূর্তে সব গল্পের নাম মনে করতে পারছি না। ছোটদের অনেক ছড়া লিখেছি। জাতীয় পত্রিকা এবং চট্টগ্রামের প্রতিটি পত্রিকা এবং লিটন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

শিশুদের জন্য লিখেছি অনেক মুক্তিযুদ্ধের গল্প। আমি বিশেষত শিশুদের জন্য লিখতে স্বাছন্দবোধ করি। শিশুরা আমার লেখার প্রাণ। ওদের জন্য লিখেছি মুক্তি যোদ্ধাদের বিজয়, যুদ্ধ জয়ের আনন্দ, এই আমাদের সেই বাড়ি, যুদ্ধ চলছে যুদ্ধ চলবে, বিজয় দিনের গল্প, মুক্তি সেনার হাসি, ভোলানাথের যুদ্ধে জয়, বিজয় দিবস সহ অনেক মজার গল্প।

এইসব গল্প লিখে আমি প্রচণ্ড তৃপ্তি পেয়েছি। সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবিটা গল্পে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। তার যথার্থ কারণ আমি নিজের চোখে যুদ্ধ, পাকসেনাদের মুখোমুখি দেখেছি। দেখেছি পাকসেনাদের নির্বিঘ্নে বাঙালির উপর গুলি বর্ষণ এবং নানান ধরনের অত্যাচার। তাতে আমার সকল গল্পে কল্পনার ছোঁয়া নেই। প্রতিটি গল্প শিশুদের মনের মত করে লিখার চেষ্টা করেছি। শিশুরাও পড়ে ভীষণ খুশি আর মজা পেয়েছে। আমি নিজেও নিজেকে সার্থক মনে করি। আমাদের দেশের গৌরব উজ্জ্বল নক্ষত্র হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা। তাদের প্রাণের বিনিময়ে দেশকে রক্ত দিয়ে স্বাধীন করেছে। ষোল ডিসেম্বর বিজয় অর্জনে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ পাই। সেই বাংলাদেশ নিয়ে প্রতি বছর মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধাদের নিয়ে নতুনভাবে গল্প ছড়া কবিতা লিখে ইচ্ছে পূরণ করি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, শিশুসাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্ত : সার্বিক পর্যালোচনা
পরবর্তী নিবন্ধদেশের ইস্পাত শিল্পে চট্টগ্রামের অনন্য অবদান