আল্লাহতাআলাকে সন্তুষ্ট করতে এবং দুনিয়া ও পরকালের সফলতা পেতে ছোট ছোট বাক্যের সহজ তাসবিহ পাঠ করার সুযোগ রয়েছে মুসলিম উম্মাহর জন্য। আল্লাহ কোরআনে পাকে মানুষকে উদ্দেশ্য করে নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে–হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহতাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ কর। (সুরা আহযাব : আয়াত ১৪)। হাদিসের বর্ণনায় ৪টি বাক্য আল্লাহতাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তিনি এ তাসবিহ পড়লে খুবই খুশি হন। জিকির–আজকারের ফজিলত বর্ণনা থেকে তা সুস্পষ্ট। হাদিসে পাকে এসেছে–হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন–রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আমার সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ও আল্লাহু আকবার বলা সারা দুনিয়া অপেক্ষাও আমার কাছে প্রিয়। প্রতিটি মুমিন মহান আল্লাহর প্রিয় হতে চায়। তা হতে গেলে মহান আল্লাহর বিধি–বিধান সঠিকভাবে মানতে হবে। যেসব কাজে মহান আল্লাহ খুশি হন তাতে বেশি বেশি আত্মনিয়োগ করতে হবে। কারো পছন্দ–অপছন্দ সম্পর্কে ধারণা থাকলে তার কাছে যাওয়ার রাস্তা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। হাদিসে উল্লেখিত সারা দুনিয়া থেকে প্রিয় বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো–দুনিয়া ও দুনিয়ার সব সম্পদ থেকে প্রিয়। হজরত ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন এর মর্মার্থ হলো–অধিক সাওয়াবের দিক থেকে দুনিয়ার অস্ত, উদয় ও ধ্বংস থেকে অধিক প্রিয়। হাদিসের অন্য বর্ণনায় এসেছে–হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন শ্রেষ্ঠ বাক্য হচ্ছে ৪টি–উচ্চারণ : সুবহানাল্লাহি ; আলহামদুলিল্লাহি ; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ; আল্লাহু আকবার। অর্থ : আল্লাহ পবিত্র; আল্লাহর জন্য প্রশংসা ; আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আল্লাহ সর্বাপেক্ষা মহান। অন্য বর্ণনায় এসেছে উল্লেখিত ৪টি বাক্য আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয়। এর যে কোনোটি তুমি বলবে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। হাদীস দ্বারা চারটি বাক্যের বিশেষ ফযীলত প্রমাণিত হয়। বাক্যগুলোতে মহান কিছু বিষয় থাকার কারণে আল্লাহর নিকট তা মানুষের সবচেয়ে প্রিয় কথা। বিষয়গুলো হলো বাক্যগুলোতে রয়েছে আল্লাহর পবিত্রতার বর্ণনা তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিপূর্ণতার গুণগুলো সাব্যস্ত করা। একত্ববাদ ও বড়ত্বকে কেবল তার জন্য সাব্যস্ত করা। আর এ বাক্যগুলোর ফযীলত ও সাওয়াব লাভের জন্য ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই যেমনটি হাদীসে এসেছে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক (ফরয) নামায বাদ ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৩ বার আল্লাহু আকবার এবং একশত পূর্ণ করতে লা–ইলা–হা ইল্লাল্লাহু, অহদাহু লা শারীকালাহু লাহুল মুলকু অলাহুল হামদু অহুয়া আলা কুল্লি শায়ইন ক্বাদীর পড়বে তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে ; যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমান হয়। উম্মু হানী (রাঃ)-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এঁর নিকট এসে বললেন, হে রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন একটা আমল বলে দিন। কেননা আমি এখন বৃদ্ধ হয়ে পরেছি, দুর্বল হয়ে গেছি এবং আমার দেহও ভারী হয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি শতবার ‘আল্লাহু আকবার’ শতবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও শতবার ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়ো। তা জিনপোষ ও লাগামসহ একশ ঘোড়া আল্লাহর পথে (জিহাদে) দান করার চেয়ে উত্তম, একশ উটের চেয়ে উত্তম এবং একশ গোলাম আজাদ করার চেয়ে উত্তম।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক আরব বেদুইনকে এ তাসবিহ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং চাহিদা মোতাবেক প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়েছেন। হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ সুনানে বায়হাকিতে এসেছে–রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একদিন এক আরব বেদুইন এসে বললেন–হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে (যে কোনো) একটি ভালো আমল শিখিয়ে দিন–তখন এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বেদুইনের হাত ধরলেন। আর তাকে (সামনে বসিয়ে) এ শব্দগুলো শেখালেন এবং বললেন এ শব্দগুলো (৪ তাসবিহ) বেশি বেশি পড়বে–সুবহানাল্লাহ ; আল্লাহ পবিত্র, আলহামদুলিল্লাহ; সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহু আকবার ; আল্লাহতাআলাই মহান (সবচেয়ে বড়)। লোকটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত এ কথাগুলো শুনে কোনো কিছু না বলে ওঠে চলে গেলেন। (অর্থাৎ, এ আমলটির ব্যাপারে তার আগ্রহ বাড়েনি)।
তারপরের ঘটনা…..লোকটি কি যেন চিন্তা করছে। লোকটি সেখান থেকে ওঠে কিছুদূর যাওয়ার পর আবারও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে আসে। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তাঁকে দেখে) মুচকি হাসলেন। লোকটি ফিরে এসে প্রিয়নবির সামনে বসে বললেন-(হে আল্লাহর রাসুল!)–সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার–আপনি যে এ তাসবিহগুলো আমাকে শেখালেন এ বাক্যগুলো তো আল্লাহর জন্য। এতে আমার জন্য কী রয়েছে ? এগুলো পড়লে আমি কী পাবো ? এবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন–তুমি যখন বলবে–সুবহানাল্লাহ
আল্লাহতাআলা বলবেন–তুমি সত্য বলেছ। তুমি যখন বলবে–আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহতাআলা বলবেন–তুমি সত্য বলেছ। তুমি যখন বলবে–লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহতাআলা বলবেন–তুমি সত্য বলেছ। তুমি যখন বলবে–আল্লাহু আকবার। আল্লাহতাআলা বলবেন–তুমি সত্য বলেছ। তারপর…জিকিরকারী ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিজের (কাঙ্ক্ষিত) চাহিদাগুলো (ধারাবাহিকভাবে যা চাইবে) তুলে ধরবে (যেমন)-বান্দা বলবে–আল্লাহুম্মাগফিরলি, হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আল্লাহতাআলা বলবেন তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। বান্দা বলবে–আল্লাহুম্মার জুক্বনি, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে রিজিক দান করুন। তখন আল্লাহ বলবেন তোমাকে ইতিমধ্যে রিজিক দান করেছি। বান্দা বলবে–আল্লাহুম্মার হামনি, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে অনুগ্রহ করুন। তখন আল্লাহ বলবেন ইতিমধ্যে তোমার প্রতি রহম করেছি। এ ৪টি তাসবিহ পড়ার পর বান্দা এভাবে আল্লাহতাআলার কাছে যা চাইবে ; আল্লাহতাআলা বান্দাকে অচিরেই তা দান করবেন বলেই আরব বেদুইনকে ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বনবি। শুধু তা–ই নয় এ মহামারির প্রাদুর্ভাবের সময় আল্লাহর কাছে এ তাসবিহ পড়ে রোনাজারির সঙ্গে তা থেকে মুক্তি চাইলে আল্লাহতাআলা বান্দার সে আবেদনেও সাড়া দেবেন। যা প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত।
সর্বোত্তম জিকির হচ্ছে–লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। অর্থাৎ–আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আর অতি উত্তম দোয়া হলো–আলহামদুলিল্লাহ, অর্থাৎ–সকল প্রশংসা শুধু মহান আল্লাহর জন্য। মুমিন, মাত্রই সব সময় এ জিকির ও দোয়ায় মশগুল থাকে। দুটি কালেমাই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ও একত্ববাদের স্বীকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য। যা মানুষকে অনুগত ও কৃতজ্ঞবান্দায় পরিণত করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সঃ)-প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর ও ঘুমানোর পূর্বে সুবহা–নাল্লাহ ৩৩ বার, আল–হামদুলিল্লাহ্ ৩৩ বার এবং আল্লাহু আকবার ৩৪ বার পড়তে বলেছেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ)-বলেন শ্রেষ্ঠ যিকির হল লা–ইলাহা ইল্লাল্লাহ, শ্রেষ্ঠ দোয়া হল আল–হামদুলিল্লাহ্। যে ব্যক্তি প্রত্যহ ১০০ বার সুবহানাল্লাহ বলবে তাঁর জন্য একহাজার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আমরা চাইলেই পাঁচ ওয়াক্তের বেশি সালাত আদায় করতে পারব না। কারণ আল্লাহপাক আমাদের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান করে দিয়েেেছন। কিন্তু আমরা চাইলে যতখুশি যিকির ও দোয়া করতে পারি। লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট