ব্রিজিত বার্দোর প্রয়াণ: মর্ত্যের অপ্সরার বিদায়

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১২:০৩ অপরাহ্ণ

রজার ভাদিম পরিচালিত ‘এন্ড গড ক্রিয়েডেট ওমেন’ (১৯৫৬) ছবিটি প্রথম দেখি চট্টগ্রামের আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ১৯৮০এর দশকের প্রথম দিকে। বলাবাহুল্য, এক অপ্সরার অপার স্বর্গীয় সৌন্দর্য মুগ্ধ নয়নে অবলোকন করেছিলাম তখন। এ ছবিটি পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহে আবারও দেখেছি অনেকটাই কাটছাট প্রিন্টে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে এই অপ্সরার অভিনীত আরও ছবি দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয় এবং সৌন্দর্যের মাধুর্যে। মর্ত্যের সে অপ্সরা, ব্রিজিত বার্দো, বিদায় নিলেন ৯২ বছরের বর্ণময় জীবন যাপনের শেষে।

ব্রিজিত বার্দো (BRIGITTE BARDOT) বিশ্বচলচ্চিত্রের অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী বিশেষ কয়েকজন অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম। অসামান্য দেহসুষমার সঙ্গে সাবলীল অভিনয় শৈলীর মিশ্রণে আকর্ষণীয় এক বুদ্ধিবৃত্তিক অভিনয় আঙ্গিক তিনি নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন, যা ছিল অননুকরণীয়। অত্যন্ত নির্বাচিতভাবে অভিনয় করেছেন ব্রিজিত। ২১ বছরের অভিনয় জীবনে (১৯৫২১৯৭৩) সর্বমোট ৪৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি যখন অভিনয় থেকে অবসর নেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৯। তাঁর শিল্পীজীবনের তুঙ্গ সময়ে তিনি অভিনয় জগত থেকে বিদায় নেন, যা সে সময় ছিল অবিশ্বাস্য ও হৃদয়ভঙ্গ। তবে সঙ্গীতে নিয়োজিত রাখেন নিজেকে, যা ছিল তাঁর আশৈশবের প্রণয়।

ব্রিজিত বার্দো বিশ্বের সেই বিরল অভিনেত্রীদের একজন, যিনি অভিনয় ও কন্ঠসংগীত উভয় ক্ষেত্রেই ছিলেন সমান পারদর্শী। শৈশবেই ব্যালেরিনা অর্থাৎ ব্যালে গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন তিনি। চলচ্চিত্রে আগমনের পূর্ব থেকেই ব্রিজিত ছিলেন শ্রোতাপ্রিয় কন্ঠশিল্পী। চলচ্চিত্রে আসার পরেও কন্ঠসংগীতে সংযুক্ত ছিলেন। তবে অভিনয়ে ব্যস্ততার কারণে আগের চেয়ে কম। প্রচুর জনপ্রিয় গানের শিল্পী ব্রিজিত বার্দোর গানের অ্যালবাম রয়েছে ৬০ টি।

ব্রিজিত তাঁর অভিনয় জীবন থেকে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ১৯৭৩ সালে বিদায় নেবার পর নানাভাবে ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক জগতে জড়িয়ে ছিলেন। ফ্যাশন ডিজাইন এবং সংগীত ছিল এর মধ্যে মুখ্য। ১৯৭৩ সালে অভিনয় থেকে যখন তিনি সরে যান, ফ্রান্সসহ পুরো চলচ্চিত্র বিশ্ব মুষড়ে পড়ে, বিশেষ করে তাঁর অগণিত ভক্তকূল। কিন্তু এর দীর্ঘ বিরতিতেও ব্রিজিত প্রজমান্তরে দর্শক মনে সবসময় জাগরুক থেকে গেছেন। আবেদনময়ী অভিনেত্রী রূপে এলিজাবেথ টেলর, মেরিলিন মনরো ও জিনা লোলোব্রিজিডার পাশাপাশি ব্রিজিত বার্দোর নামটিও সমোচ্চারিত হতো হয় এবং হবে।

মা অ্যানমেরি সুসেলের আগ্রহে ও উৎসাহে শৈশব থেকেই ব্রিজিতের সংগীত ও নৃত্যশিক্ষা। অসাধারণ সৌন্দর্য ও সহজাত অভিনয় প্রতিভা তাঁকে কৈশোরেই মডেলিংএ নিয়ে যায়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি মডেলিংএ যুক্ত হয়ে আশাতীত জনপ্রিয়তা পেয়ে যান। প্রখ্যাত ফরাসি ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘এলি’র প্রধান আরও আগে থেকেই ব্যালেরিনা হিসেবে গানে ও নাচে তো পারদর্শিতা ছিলই। সবমিলে একজন গ্ল্যামারাস আইকনে পরিণত হন ব্রিজিত তাঁর কৈশোরেই। এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সরব পদার্পন ঘটে চলচ্চিত্রে। ব্রিজিত বার্দো সবার কাছে হয়ে ওঠেন আদরের ‘বিবি’ ।

মডেলিং থেকে চলিচ্চত্রে তাঁর আবির্ভাব ১৯৫২ সালে ১৯ বছর বয়েসে। ঐ সময়েই বিবি ‘সিম্বল অব রেবিলিয়াস ইয়থ এন্ড বিউটি’ শিরোনামে খ্যাত। প্রথম যৌবনেই তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত যা ক্রমশ তাঁকে রহস্যাবৃত মানবী করে তোলে। এই রহস্যময়তা সারা জীবন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল ব্রিজিতকে।

শুরুতেই বিবি সুযোগ পান বহুজাতিক ‘দি অ্যাক্ট অব লাভ’ ছবিতে র্কাক ডগলাসএর মতো ভুবনজয়ী অভিনেতার বিপরীতে অ্যানাতোলি লিটভ্যাকের পরিচালনায়। ছবিটি প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পায় ১৯৫৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর বড়দিন উৎসবে এবং অভূতপূর্ব দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে এবং ব্রিজিত বার্দো নামের স্বর্গের এক অপ্সরাকে মর্ত্যে অধিষ্ঠিত করে। ১৯৫২ থেকে ১৯৭৩এই দুই দশকের চলচ্চিত্রাভিনয়ের জীবনে ৪৭ টি ছবিতে অভিনয় করেছেন অত্যন্ত নির্বাচিতভাবে। তাঁর অভিনীত সব ছবিই দর্শকনন্দিত। বেশিরভাগ ছবি বহুজাতিক। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, স্পেন, ব্রিটেন এবং হলিউডের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হলিউডেরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন যেগুলো ছিল তারকাখচিত। তবে নিজের ওপর আলো ধরে রাখতে জানতেন তিনিই, তাই তাঁর অভিনীত চরিত্রটি হতো মূল আকর্ষণ। সারা বিশ্বে তাঁকে যে ছবিটি পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে সেটি রজার ভাদিম পরিচালিত ‘এন্ড গড ক্রিয়েটড ওমেন।’ ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি আবর্তিত হয়েছিল ব্রিজিত অভিনীত চরিত্রকে ঘিরে এবং ছবিটি বিশ্বচলচ্চিত্রের একটি কিংবদন্তি। সমগ্র চলচ্চিত্রজীবনে নামকরা অনেক চলচ্চিত্র পরিচালকের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ ঘটেছে তাঁর, যাঁদের মধ্যে রয়েছে রজার ভাদিম, জঁ লুক গোদার, লুই মাল অঁরি ক্লুজো, রবার্ট এনরিকো, হেনরি কোস্টার, জঁ ককতো, এডওয়ার্ড দিমিত্রিক, ক্রিশ্চিয়ান জ্যাক, উইলিয়াম লেলসনএঁদের নাম অগ্রগন্য। ব্রিজিত অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে এন্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন (১৯৫৬), দি ট্রুথ (১৯৬০), লাভ ইজ মাই প্রফেশন (৫৮), কনটেম্পট (৬৩), দি লিজেন্ড অফ ফ্রেঞ্চি কিং (৭১), শালোকো (৬৮), রাম রানার (৭১), ভিডা মারিয়া (৬৫), জন জুয়ান (৭৩), এ ভেরি প্রাইভেট আফেয়ার (৬২), দি প্যারিসিয়ান (৫৭), হেলেন অব ট্রয় (৫৬), টু উইকস ইন সেপ্টেম্বর (৬৭), ম্যাসকুলাঁ ফেমিনা (৬৬)

ব্রিজিতকে চরিত্র করে হলিউডে হেনরি কোস্টার ১৯৬৫ সালে নির্মাণ করেন ‘ডিয়ার ব্রিজিত’ নামের চলচ্চিত্র যেখানে ব্রিজিতের বিপরীতে অভিনয় করেন সে সময়ের আরেক হার্টথ্রব জেমস স্টুয়ার্ট। ১৯৬৫ সালেই সল জে তুরেল সাত বিশ্ব সুন্দরী অভিনেত্রীকে নিয়ে নির্মাণ আলোড়িত প্রামাণ্যচলচ্চিত্র ‘দি লাভ গডেসেস’। সপ্ত সুন্দরীর অন্যতমা ছিলেন ব্রিজিত বার্দো। তাঁর পুরো জীবন নিয়ে অ্যালাঁ বারলিনার গত বছর নির্মাণ করেছেন পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘বার্দো’ (BARDOT) । ৯০ মিনিটের ছবিটি মুক্তি পায় ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর, ব্রিজিতের প্রয়াণের ২৫ দিন আগে। ফরাসি সরকার ১৯৮৫ সালে ব্রিজিতকে সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ঁ দ্য নর’এ সম্মানিত করেন।

১৯৭৩ সালে অভিনয় থেকে বিদায় নেবার পর ব্রিজিত মনোনিবেশ করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চর্চায়। শৈশব থেকেই সংবেদনশীল ব্রিজিত প্রাণিসেবা ও প্রাণিরক্ষা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন এবং বিশ্বব্যাপী এর স্বপক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে থাকেন। ক্রমে এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তিনি পশুপাখি প্রেমী বা প্রাণিপ্রেমী হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হতে থাকেন। তাঁর এই চর্চা বাকি দীর্ঘ জীবনে অক্ষুন্ন ছিল। গ্ল্যামার আইকন হয়েও অনেকটাই নেপথ্যে চলে যান ব্রিজিত তাঁর পরবর্তী জীবনে। সেই দীর্ঘ বর্ণাঢ্য নয় দশকের জীবনের সমাপ্তি ঘটে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সের লা গ্রোপেজ শহরে দুরারোগ্য কর্কট রোগের কারণে। কাকতলীয়ভাবে ২৮ ডিসেম্বর চলচ্চিত্রের জন্মদিন।

১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ব্রিজিতের জন্ম ফ্রান্সের রাজধানী পারীতে। বাবা লুই বার্দো ছিলেন প্রকৌশলী। তিনি পারিবারিক প্রকৌশল ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। মা অ্যান মেরি সুসেল বার্দো ছিলেন সৌখিন কন্ঠশিল্পী মূলত মায়ের উৎসাহ ও চেষ্টায় ব্রিজিতের ব্রিজিত হয়ে ওঠা। তাঁর পুরো নাম ছিল ব্রিজিত অ্যান মেরি বার্দো। ব্রিজিত বার্দো নামেই ছিলেন পরিচিত। প্রচার মাধ্যমে নাসের ও পদবীর আদ্যাক্ষর দিয়ে তাঁর ডাকনাম দেয়বিবি। চারবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বিবি। প্রথম স্বামী প্রখ্যাত পরিচালক রজার ভাদিমের সঙ্গে ছিল পাঁচ বছরের (১৯৫২৫৭) দাম্পত্য। তবে বিচ্ছেদের পরেও তাঁদের বন্ধুত্ব ও পেশাগত সম্পর্ক অক্ষুন্ন ছিল। পরের দাম্পত্য চার বছরের (১৯৫৯৬৩) অভিনেতা ও প্রযোজক জ্যাক ক্যারিয়েরের সঙ্গে। এ সংসারে ব্রিজিতের একমাত্র সন্তান, পুত্র নিকোলাস জ্যাক ক্যারিয়ের। কিন্তুু নিকোলাসের সঙ্গে ব্রিজিতের সম্পর্ক সৌহার্দ্যময় ছিল না। তিনি তার পিতার সঙ্গেই থাকতেন। নিকোলাস ছিলেন নেটয়ার্ক ইঞ্জিনিয়র। অবশ্য নিকোলাসের পুত্র কন্যা নিয়েও ন্যানার সঙ্গে দাদি ব্রিজিতের সম্পর্ক ছিল প্রীতিপূর্ণ ব্রিজিতের তৃতীয় দাম্পত্য জার্মানসুইজ ফটোগ্রাফার গুন্টার সাশের সঙ্গে ১৯৬৬ থেকে ৬৯, এই তিন বছর। সবশেষে দীর্ঘ ২৩ বছর পর ১৯৯২ সালে তিনি বিয়ে করেন ফরাসি রাজনীতিক বার্নাড ডি’ ওরসেলকে ১৯৯২ সালে। এই সম্পর্কটি দীর্ঘস্থায়ী হয়। ৩৩ বছরের এই দাম্পত্য (১৯৯২২০২৫) ব্রিজিতের মৃত্যু পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল।

রীতিমতো বর্ণময় ও উপভোগ্য জীবন যাপন করে গেছেন ব্রিজিত দীর্ঘ ৯১ বছরের জীবনে। তাঁর আত্মসম্মানবোধ ছিল অত্যন্ত প্রখর। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবার পর একটা প্রচ্ছন্ন দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন নিজেকে। দেয়ালটি ছিল রহস্যেরসম্ভ্রমেরভালোবাসার। দেয়ালটি ভেঙে গেল শেষ পর্যন্ত। তবে রয়ে গেল ব্রিজিতের প্রতি সম্ভ্রম আর ভালোবাসা। থেকে গেল রহস্য। আর মর্ত্যের অপ্সরা ফিরে গেলেন স্বস্থানে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাহিত্য, সংগ্রাম ও স্বপ্নের কবি
পরবর্তী নিবন্ধআওলিয়াগণ ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-বর্ণ ও উঁচু-নিচু শ্রেণির মধ্যে বৈষম্য করেন না