বিষমুক্ত শুঁটকি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করতে পারে

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

শুঁটকি বাংলাদেশের মানুষের অতি প্রিয় একটি খাবার। বিশ্বের যে প্রান্তে থাকুক না কেন শুটকির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের টান চিরন্তন। সেজন্য প্রবাসীরা দেশে আসলে শুটকি নিতে ভুলেন না। শুধু তাই নয়, দেশে থাকা মানুষেরাও কক্সবাজার গেলে শুটকি কিনে আনেন। বিশ্বে বাংলাদেশের শুটকির প্রচুর চাহিদা থাকায় বিদেশেও প্রচুর শুটকি রপ্তানি হয়। প্রতি বছর প্রায় ৬৫ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারের মত মূল্যের শুঁটকি রপ্তানি হয়, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৮০ কোটি টাকার সমান। ২০২২২৩ অর্থবছর পর্যন্ত গত ১১ বছরে মোট ৭ কোটি ১৭ লাখ ১৯ হাজার ২৬৩ ডলারের শুঁটকি রপ্তানি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চল থেকে এই শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে পাঠানো হয়। হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, কাতার, সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, পাকিস্তান এবং মালয়েশিয়া বিশ্বের প্রধান রপ্তানি বাজার। তবে ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার ফলে বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক বাজার হারাচ্ছে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা ও নদীর উপকূলে শুটকি উৎপাদিত হয়। চট্টগ্রাম ভোলা বরিশাল এবং কক্সবাজারে রয়েছে বড় বড় শুঁটকি আড়ৎ ও বাজার। চলনবিলের মতো অঞ্চলগুলোতেও প্রচুর পরিমাণে সুস্বাদু শুটকি উৎপাদিত হয়।

খাদ্য সংরক্ষণের প্রাচীন পদ্ধতি হল খাদ্য শুকানো। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে মাছ পচে যায়। মাছকে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ তেমনই একটি পদ্ধতি। মাছকে রোদে রাখা হয় পানি অপসারণের জন্য। কারণ পানির কারণেই মাছের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব বেঁচে থাকে এবং মাছকে পচতে সহায়তা করে। বাংলাদেশে মাছকে বাতাস, রোদ, ধোঁয়া এবং লবণ পদ্ধতি ইত্যাদির সাহায্যে শুকানো হয়। এই পদ্ধতি সবচেয়ে সহজ, কমদামি এবং কার্যকর হয় অনুকূল আবহাওয়ায়। জেলে বা তার পরিবারের সদস্যরা সাধারণত এই কাজ করে থাকে এবং সহজেই তা বাজারজাত করতে পারে। শুকনো মাছের আয়ুষ্কাল কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় শুটকিতে পোকার আক্রমণ করে। আর সেজন্য শুটকিতে বিভিন্নরকমের ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

দেশে প্রতিবছর ১৩ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১৫% মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তর করা হয়। শুকানোর সময় ‘লুসিলিয়া কিউপ্রিনা’ প্রজাতির ক্ষতিকর মাছি ডিম পেড়ে লার্ভা উৎপাদন করে। মাছির এই লার্ভামাছকে খেয়ে বিনষ্ট করে দেয়। মাছির আক্রমণে ৬০% শুঁটকি নষ্ট হয়ে যায়। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৩০০ কোটি। শুঁটকি থেকে এই আপদ দূর করতে মাছির বন্ধ্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করেন পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা। এতে মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন করে ব্যাপক সাফল্যও পাওয়া গেছে। সোনাদিয়াকে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের জন্য ‘উপযুক্ত জায়গা’ ঘোষণা করেছেন গবেষকেরা। জানা যায়, ২০২১ সালে প্রকল্পটি চালু হয়। টানা কয়েক বছরে ৯০ লাখ বন্ধ্যা মাছি ছাড়া হয়, এরপর আসে সাফল্য। মৎস্য গবেষক ও বিজ্ঞানীরা জানান, মাছির ক্ষতি রোধ করতে উৎপাদনকারীরা মাছে বিষ ও অতিরিক্ত লবণ প্রয়োগ করে থাকেন। যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মানসম্পন্ন শুঁটকি উৎপাদিত না হওয়ায় বিদেশেও শুঁটকি রপ্তানি করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞানীরা পরীক্ষানিরীক্ষা এবং গবেষণা করে দেখতে পান, ৮০% শুঁটকিতে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিষ মেশানো রয়েছে। মাছি দূর করতে দেওয়া হয় এই বিষ। কাঁচা মাছ ধুয়েমুছে রোদে শুকানোর জন্য বাঁশের মাচায় টাঙিয়ে রাখা হয়। এ সময় একধরনের মাছি মাছের পেটে ও মাথার ভেতরের ভেজা অংশে এবং ফুলকায় ২০০৩০০টি ডিম পাড়ে। ১০১২ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা (শূককীট) বের হয়। এই লার্ভা মাছ খাওয়া শুরু করে। তখন ওই মাছ মানুষের খাওয়ার উপযোগী থাকে না। এই ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য শুঁটকি উৎপাদনকারীরা মাছ শুকানোর আগে (কাঁচা মাছে) বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন। তাতে পুরো শুঁটকি বিষাক্ত হয়ে যায়। বিষাক্ত এই শুঁটকি খেলে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গিয়ে ক্যানসারসহ লিভার, ফুসফুস, কিডনি ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নারীদের গর্ভপাত এবং মৃত অথবা বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম হতে পারে। তা ছাড়া শুঁটকিতে যখন বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তখন নারী ও পুরুষ শ্রমিকের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে তাঁদের শরীরে কীটনাশক ঢুকে পড়ে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা নব্বইয়ের দশক থেকে সোনাদিয়া দ্বীপে শুঁটকির আপদ নিয়ন্ত্রণে পরমাণু প্রযুক্তিতে উৎপাদিত বন্ধ্যা মাছি ব্যবহার করে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এর জন্য কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে ‘সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রে’ একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় মাছি বন্ধ্যাকরণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি যন্ত্র। এর নাম কোবাল্ট৬০ মোবাইল গামা ইরাডিয়েটর। যার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ লাখ বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন সম্ভব। বন্ধ্যা মাছি উৎপাদনের এই প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। গত তিন বছরে সোনাদিয়াতে অন্তত ৯০ লাখ বন্ধ্যাকরণ মাছি ছাড়া হয়। বিজ্ঞানীদের অভিমত, বন্ধ্যা করা মাছির মাধ্যমে শুঁটকির আপদ দমন পদ্ধতিকে মাছির জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বলা যায়। পূর্ণাঙ্গ মাছি ২৫৩০ দিন পর্যন্ত বাঁচে। এ সময় স্ত্রী মাছি পুরুষ মাছির সঙ্গে শুধু একবার মিলিত হয়, কিন্তু পুরুষ মাছি একাধিক স্ত্রী মাছির সঙ্গে প্রজনন ঘটায়। মাঠের এই মাছিগুলো গবেষণাগারে নিয়ে এসে কৃত্রিম খাবারের মাধ্যমে লাখ লাখ মাছি উৎপাদন করা হয়। এই মাছির লার্ভা বা শূককীট নির্দিষ্ট মাত্রায় রেডিয়েশন দিলে সেখান থেকে বের হওয়া মাছিগুলো বন্ধ্যা হয়ে যায়। অর্থাৎ স্ত্রী মাছিগুলোর প্রজনন অঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাছি আর ডিম উৎপাদন করতে পারে না। বন্ধ্যা পুরুষ মাছগুলোর শুক্রাণুর সক্রিয়তা নষ্ট হয়ে যায়। এসব বন্ধ্যা মাছি শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় ছেড়ে দিলে সেখানকার স্ত্রী মাছির সঙ্গে বন্ধ্যা পুরুষ মাছি প্রজনন করে। যেহেতু বন্ধ্যা পুরুষ মাছির শুক্রাণুর সক্রিয়তা থাকে না, তাই মিলন করা মাঠের স্ত্রী মাছির ডিম নিষিক্ত হয় না। এতে এসব ডিম থেকে লার্ভা বের হয় না। যার ফলে মাছির সংখ্যা কমে যায়। এভাবে সোনাদিয়াতে বিষমুক্ত, লবণমুক্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনে মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তির বড় সফলতা পাওয়া গেছে।

কীটনাশক বা কেমিক্যালযুক্ত খাদ্য মানুষের শরীরে রোগের প্রধান কারণ। সেজন্য বর্তমান বিশ্বে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। মানুষ এখন বেশি দাম দিয়ে হলেও খাদ্যদ্রব্য কেনার সময় বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য কেনে। আর মুখরোচক খাদ্য হিসাবে শুঁটকী আমাদের দেশের ধনী ও গরীব জনগোষ্ঠীর আমিষ বা প্রোটিনের প্রধান উৎস। তাই কীটনাশক ও বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন করতে পারলে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের রির্জাভকে সমৃদ্ধ করবে। তাই বন্ধ্যা মাছির এই প্রকল্প সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে, দেশে শুঁটকি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি
পরবর্তী নিবন্ধভাষা ও বাঁচা