ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত (২১) নিহত হয়েছেন। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে প্রাণ হারান তিনি। মাইশার মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে ওঠে কুমিরা এলাকা। তার সহপাঠীদের অবরোধের মুখে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। অবরোধ করা হয় রেলপথও। ছয় দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে অবস্থান নেন। দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর সড়ক ও রেলপথ সচল হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে কুমিরা এলাকায় একটি লরির ধাক্কায় যাত্রীবাহী মিনিবাস উল্টে ওই তরুণী শিক্ষার্থীর ওপর পড়লে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত মাইশা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তিনি মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া এলাকার সাফায়াত হোসেন ও সালমা আক্তার দম্পতির মেয়ে। তার মৃত্যুতে সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীত পাশে মাইশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়েছিলেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ক্যাম্পাসে আসছিলেন। রাস্তা পার হওয়া এবং বাসে ওঠার প্রস্তুতির সময় তাদের সামনে এসে ৮ নম্বর রোডের একটি মিনিবাস দাঁড়ায়। এ সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি লরি ৮ নম্বর রুটের ওই মিনিবাসটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। এতে মিনিবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে উল্টে যায়। বাসটির নিচে চাপা পড়েন মাইশাসহ কয়েকজন। একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুটি লরি পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলছিল। এ সময় একটি লরি দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাসকে ধাক্কা দেয়।
স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা মাইশাসহ আহতদের উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আহত অপর দুই শিক্ষার্থী চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সহপাঠীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন আইআইইউসির শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে পাশের রেললাইনেও গাছের গুঁড়ি ফেলে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সময় গড়ানোর সাথে সাথে যানজটের দৈর্ঘ্য এবং তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। বিকাল নাগাদ যানজট অন্তত ৪০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। এতে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কন্টেনারবাহী গাড়ি ও ব্যক্তিগত যানবাহন আটকা পড়ে। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় সড়কে অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ও ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। যানজটের অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে অনেকে উল্টো ঘুরে বারৈয়াহাট হয়ে হেঁয়াকো ঘুরে ফটিকছড়ি–হাটহাজারী হয়ে শহরে ফিরেন। শিক্ষার্থীরা পাশের রেললাইনেও গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করেন। ফলে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়।
সীতাকুণ্ড রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার নিজাম উদ্দিন অবরোধের কারণে ঢাকামুখী মহানগর এঙপ্রেস ট্রেন ভাটিয়ারীতে এবং চট্টগ্রামমুখী মহানগর প্রভাতী সীতাকুণ্ড স্টেশনে আটকে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে রাজপথে আন্দোলনে নামেন। দাবিগুলো হচ্ছে, দুর্ঘটনার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বাদী হয়ে মামলা করতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাস ও লরিচালকদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট এলাকায় অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের উভয় পাশে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লরির মালিককে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপার নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের দাবির ব্যাপারে কথা বলতে চাইলেও তারা সরাসরি চট্টগ্রামের ডিসি ছাড়া অন্য কারো সাথে কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দেন। বার আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন জব্দ করেন। দুটি লরি ও একটি মিনিবাস জব্দ করে হাইওয়ে থানায় নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দুই পাশে গতিরোধক নেই। শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের জন্য নেই ফুট ওভারব্রিজ। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পার হতে হয়। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে ভারী যানবাহন ও কন্টেনারবাহী গাড়ির চলাচল এবং পার্কিংয়ের কারণে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাসুদ আলম ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবি ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করলে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। গত রাত ৮টা পর্যন্ত এলাকায় যানজট ছিল বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
আইআইইউসির শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। দাবিগুলো আদায়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
আইআইইউসির রেজিস্ট্রার কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ কাশেম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী মাইশা মুশফিরাত গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও দুই ছাত্রী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে আইআইইউসি কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রেরিত শোকবার্তায় বলা হয়, মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুতে আইআইইউসির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আ. ন. ম. শামসুল ইসলাম, ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী এবং প্রো–ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী শোক প্রকাশ করেছেন।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সীতাকুণ্ড থানায় একটি জিডি করেছে। আজ বুধবার জোহর নামাজের পর আইআইইউসির কেন্দ্রীয় মসজিদে মরহুমার রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু : আইআইইউসির শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করে প্রতিবাদ করেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে রেললাইনের ওপর গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করায় চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামমুখী ও চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া সকল ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে চট্টগ্রাসহ বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। অবরোধ তুলে নিলে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার আজাদীকে জানান, শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের কারণে বেলা ১১টার পর থেকে চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে সীতাকুণ্ডে অবরোধ তুলে নেয়ার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ৪টা ২০ মিনিটে মহানগর গোধূলী ছেড়ে গেছে। মহানগর গোধূলী প্রতিদিন ৩টা ২০ মিনিটে ছেড়ে যায়।









