বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক বিষয়ের সাথে বাংলাকে একটি স্বতন্ত্র বা আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা ভাষার সঠিক প্রয়োগ, শুদ্ধ উচ্চারণ এবং সাহিত্য সম্পর্কে মৌলিক ধারণা পায়। এটি কেবল সাহিত্য নয়, বরং একুশে ফেব্রুয়ারি, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ভাষা ও বিশ্বায়নের মতো বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব শিক্ষার্থীর জন্য ১০০ নম্বরের একটি বাংলা কোর্স আবশ্যিক করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার লালন ও বাঙালি জাতীয় মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে সরকারের প্রয়াসের অংশ হিসেবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শীর্ষক কোর্স চালু করার বিষয়ে কারিকুলামের রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু কারিকুলাম নাম দিয়ে বাংলার একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রণয়ন করেছে ইউজিসি। সিলেবাসে বাংলা ভাষা অংশে মূলত ধ্বনি, ধ্বনির উচ্চারণ, বানান রয়েছে। আর সাহিত্য অংশে রয়েছে কয়েকটি কবিতা, প্রবন্ধ আর ছোটগল্প। এ ছাড়া ভাষার অংশ হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ভাষা, বিশ্বায়ন–এ রকম কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর রচনা রাখা হয়েছে। এ থেকে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী কী শিখবে কিংবা কোন যোগ্যতা অর্জন করবে, বলা হয়নি।
২০১৬ সালের ১১ আগস্ট ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের ১৪৪তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ১০০ নম্বরের বাংলা কোর্স চালু করার কথা দেশের সকল প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই সিদ্ধান্ত মানছে না। কোর্স দুটি সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করছে না বলে তারা কারিকুলাম সংশোধন করে অনুমোদনের জন্য পাঠায় না। কারণ বাংলা বিষেয়ের এ দুটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত না করলে সংশোধিত কারিকুলামের অনুমোদন ইউজিসি দেবে না। তাই কারিকুলাম তৈরির দীর্ঘসূত্রতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনীহা, অলাভজনক বিষয় বলে মনে করা, ইত্যাদি কারণে কোনো উদ্যোগই আর আলোর মুখ দেখছে না। অর্থাৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে করে না বলেই বাংলা কোর্স চালুর ব্যাপারে তাদের অনীহা। ফলে কোনো ছাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর কোনোটাতে বাংলা নিয়ে পড়বার সুযোগ না পেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারার সুযোগও কম। জানা যায়, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা বিভাগ আছে, তার অধিকাংশেই অন্য বিভাগের শিক্ষকদের চেয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের বেতন অনেক কম।
ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ যদি রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়, তাহলে তাকে বিষয়টির পাশাপাশি অর্থনীতি, লোকপ্রশাসন, পরিসংখ্যান সমাজবিজ্ঞানসহ আরো বিভিন্ন বিষয় সিলিবাসে অন্তর্ভুক্ত থাকে বলে অধ্যয়ন করতে হয়। এভাবে অন্যান্য বিষয়ের মতো বাংলাকেও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর দাবি জানাই। পাবলিক–প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করা একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে। জাতীয় ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষায় সঠিক ভাষা ব্যবহারের জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা।
বাংলাদেশে বাংলা ভাষার অবস্থা এখন স্বদেশে পরবাসীর মতো। ভাবতেও বিস্ময় লাগে, আজ থেকে ৭৪ বছর আগে এ দেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল এবং এই ভাষার জন্যই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলন করেছিলো, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলো। অথচ সেই বাংলাদেশেই এখন বাংলা ভাষা এতো অবহেলিত। আমাদের সংবিধানের তিন নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু আমরা তার প্রতিফলন সে মাত্রায় লক্ষ্য করি না।
আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেখি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোথাও কোথাও বাংলা ভাষায় লেখা নিষিদ্ধ, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাংলায় বক্তৃতা ও পাঠদান নিষিদ্ধ, নিয়মবিরুদ্ধ। যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু আছে সেগুলোতেও ভালোভাবে পাঠদান হয় না। এর পিছনে একটা বড় কারণ হলো, শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তর করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা এখন ব্যবসার একটি বড় ক্ষেত্র। যেহেতু বাংলাভাষাকে আমরা আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারিনি তাই বাজারে বাংলার অবস্থা ভালো নয়। যদি শিক্ষা, চাকরি ও দৈনন্দিন সকল কাজে বাংলাকে আমরা যুক্ত করতে পারতাম তাহলে বাংলা শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ তৈরি হতো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলা পড়াতে বাধ্য হতো।
অনেক উচ্চশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিতসহ প্রায় অনেকেরই বাংলা লেখার মধ্যে অনেক ভুল–ভ্রান্তি দেখা যায়। অথচ তাঁরা ইংরেজিতে অনেক দক্ষ, বলতে গেলে একটি শব্দও ভুল লিখে না। বাংলা লেখতে গেলে যত সমস্যা। আবার তাঁরা বিভিন্ন সময় অনেকের উপস্থিতিতে গর্বের সাথে বলেন, বাংলা ভালোভাবে লিখতে পারি না। অথচ তাঁদের বানান সম্পর্কে জানার বা শেখার তেমন কোনো উদ্যোগ বা আগ্রহ দেখা যায় না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও প্রথম বর্ষে বাংলাকে আবশ্যিক বিষয় করা হলে বাংলায় লিখতে বানান ভুল অনেক কম হবে।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা ও মর্যাদার ভাষা। এ ভাষা আমাদের অস্তিত্বের শেকড়, একে উপেক্ষা করার কোনো যুক্তি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা আছে। বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করে কাজের ক্ষেত্রও আমাদের আছে। স্কুল–কলেজগুলোতে ভালো বাংলা শিক্ষকের অভাব আছে। যেহেতু ছেলেমেয়েরা বাংলা নিয়ে পড়ছে না, তাই বাংলা ভাষার শিক্ষকও তৈরি হচ্ছে না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালুকরণ বাধ্যতামূলক হতে হবে। তাছাড়া অন্যান্য যে বিষয়ের উপরেই পড়ানো হোক না কেনো, ১০০ নম্বরের বাংলা ভাষার শর্ট কোর্সটি অবশ্যই চালু রাখতে হবে। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা পড়াতে হবে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরো কঠোর হতে হবে। তাছাড়া, শিক্ষক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সকল মহল থেকে এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক











