বিশ্ব এনেসথেসিয়া দিবস আজ : যা জানা দরকার

ডা. কল্যাণ বড়ুয়া | শুক্রবার , ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

১৬ অক্টোবর ২০২৬। ১৮০ তম বিশ্ব এনেসথেসিয়া দিবস। প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘Before, During and Beyond Surgery’. সার্জারি এর আগে থেকে শুরু করে সার্জারি চলাকালীন এবং সার্জারির পরেও এনেসথেসিওলজিস্টদের ভূমিকা অপরিসীম।

এনেসথেসিয়া কী?: অনেসথেসিয়া এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে বিশেষ ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট অংশ বা পুরো শরীর সাময়িকভাবে সংবেদনহীন বা ব্যথাশূন্য করা হয়। অর্থাৎ সার্জারির প্রয়োজনে কোনো রোগীকে ব্যথামুক্ত করার নামই এনেসথেসিয়া।

এনেসথেসিয়ার প্রকারভেদ: ১. লোকাল এনেসথেসিয়া: শরীরের খুব ছোট একটি স্থান অবশ করার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। এতে রোগী পুরোপুরি সজাগ থাকে। যেমনঃ ফোঁড়া অপারেশন, Cyst অপারেশন ও দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বলা যায়, শরীরের নির্দিষ্ট একটি অংশ অবশ করার জন্য এর প্রয়োজন হয়। ২. রিজিওনাল এনেসথেসিয়া : শরীরের একটি বড় অংশ যেমনঃ হাতের বা বাহুর অপারেশন, নাভির নিচের অংশ যেমন: সিজারিয়ান অপারেশনের সময় স্পাইনাল বা ইপিডুরাল এনেসথেসিয়া দেওয়া। উরুর, হাঁটুর বা পায়ের ভাঙা হাড়ের চিকিৎসায় এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। ৩. জেনারেল এনেসথেসিয়া : শক্তিশালী ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান বা সংজ্ঞাহীন করে সার্জারি করা হয়। বিশেষ করে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের সময় এটির প্রয়োজন হয়। এতে রোগীকে ব্যথামুক্ত করার জন্য কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস বা রেসপিরেটরী সাপোর্ট দেয়া হয়। ৪. সিডেশন (Sedation): এর মাধ্যমে রোগীকে হালকা ঘুমের মাধ্যমে শান্ত রাখা হয় তবে রোগী পুরোপুরি অজ্ঞান থাকে না।

চিকিৎসায় এনেসথেসিয়ার গুরুত্ব: সার্জারির যে উৎকর্ষতা সাধন হয়েছে তা মূলত এনেসথেসিয়ার জন্যই সম্ভব হয়েছে। আধুনিক এনেসথেসিয়ার কল্যাণে নতুন নতুন ঔষধ আবিষ্কারের ফলে কিডনি, হৃদযন্ত্র বা মস্তিষ্ক এমনকি চেহারা পরিবর্তনের মতো জটিল অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে। বলা যায়, ভালো এনেসথেসিয়ার কল্যাণে ভালো সার্জারি সম্পন্ন হচ্ছে।

এনেসথেসিয়া দেয়ার সময় রোগীর যেসব physiological activity আছে, সেগুলো ঠিক রাখতে হয়। এনেসথেসিয়া মানে শুধু রোগীকে শুধু অজ্ঞান বা চেতনানাশ করা নয়। এনেসথেসিয়ার সময় রোগীর প্রধান অঙ্গের কাজ কৃত্রিমভাবে চালানোই হলো এনেসথেসিয়ার অংশ। একজন রোগীর প্রি– অপারেটিভ অ্যাসেসমেন্ট, পোস্ট–অপারেটিভ কেয়ার, আই.সি.ইউ ম্যানেজমেন্ট এবং সব ধরনের জটিল চিকিৎসার সঙ্গে এনেসথেসিয়া জড়িত এবং এতে এনেসথেসিওলজিস্টের ভূমিকা অপরিসীম।

রোগীর অপারেশনের পরে জ্ঞান ফিরে আসা: লোকাল ও রিজিওনাল এনেসথেসিয়ায় রোগীর জ্ঞান লোপ পায় না। রোগী সব বুঝতে পারে কিন্তু ব্যথা অনুভব করে না। জ্ঞান ফেরাটা নির্ভর করে এনেসথেটিস্টের উপর। অচেতন থাকার সময়টা পুরোপুরি ঔষধের ব্যবহারের উপর নির্ভর করে। কিছু ঔষধ আছে স্বল্পমেয়াদী আবার কিছু ঔষধ আছে দীর্ঘমেয়াদী। কর্তব্যরত এনেসথেটিস্ট ঠিক করে কতো সময়ের সার্জারির জন্য কোন ঔষধ ব্যবহার করবে।

আধুনিক এনেসথেসিয়ার বদৌলতে বর্তমানে রোগী অপারেশন শেষে জেগে উঠে, চোখ মেলে তাকায়, কথাবার্তায় রেসপন্স করে। বড় অপারেশনের ক্ষেত্রে, মাথায় সার্জারি ও মেরুদণ্ডের অপারেশনের ক্ষেত্রে রোগীকে গভীরভাবে অচেতন রাখতে হয়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে যেমন: যাদের লিভারের কর্মক্ষমতা কম, কিডনির সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা তাদের ক্ষেত্রে কম ডোজ ব্যবহার করতে হয় এবং সঠিক ঔষধ নির্বাচন করতে হয়।

এনেসথেসিয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা: ১. রোগীর প্রি–অপারেটিভ চেকআপ করাটা জরুরি। এতে রোগীর এমন কোনো রোগ আছে কিনা যা এনেসথেসিয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে তা দেখে নেয়া যায়। ২. রোগীর এনেসথেসিয়ার ঔষধ নেয়ার সক্ষমতা আছে কিনা আগেই যাচাই করা যায়। ঔষধে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবার সম্ভাবনা আছে কিনা রোগীর সাথে কথা বলে আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। ৩. রোগীর অপারেশন জনিত রোগ ছাড়া অন্য কোনো রোগ আছে কিনা যেমন: হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, লিভারের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা এসব আগেই জেনে নেয়া যায় এবং এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া যায় যা রোগীর অপারেশনকালীন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ৪. অপারেশনের পূর্বে রোগীকে ছয় ঘণ্টা শক্ত খাবার এবং চার ঘণ্টা পানীয় পান থেকে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকে। এ বিষয়ে রোগীকে অবহিত করা যায়। ৫. সর্বোপরি রোগী যাতে অপারেশনে ভীত না হয়, রোগীর আত্মীয় স্বজন যাতে উদ্বিগ্ন না হয়, এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করা যায়। অপারেশন পরবর্তী সময়ে রোগীকে অপারেশনের ধরন অনুযায়ী ব্যথার ঔষধ দিতে হয় যাতে রোগী শান্ত থাকে।

অপারেশন পরবর্তী পর্যাপ্ত সুবিধা আছে কি?

১. রোগীর যে হাসপাতালে অপারেশন হবে, সেখানে এনেসথেসিয়ার আধুনিক সুযোগ সুবিধা আছে কিনা দেখতে হবে। অপারেশন জনিত কোন বিপদ উদ্ভব হলে তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা দেখতে হবে, যেমনঃ পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড মনিটর সহ (অক্সিজেন লেভেল দেখা, হার্ট রেট দেখা, রক্তচাপ দেখা)। রোগীকে অক্সিজেন দেয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। এইচ.ডি.ইউ, আই. সি.ইউ, এন.আই.সি.ইউ এর সুযোগ সুবিধা থাকতে হবে। ২. দক্ষ জনবল আছে কিনা? যেমন: বিশেষজ্ঞ সার্জন, বিশেষজ্ঞ এনেসথেটিষ্ট এবং দক্ষ চিকিৎসক এসিসটেন্ট থাকা জরুরি।

রোগী এবং স্বজনদের জ্ঞাতব্য: ১. দক্ষ সার্জন যাচাই করে বেছে নেয়া। ২. দক্ষ এনেসথেসিওলজিষ্ট নির্বাচন করা। ৩. পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা সম্বলিত ব্যবস্থা আছে এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নেয়া। ৪. রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা আছে কিনা? ৫. উন্নতমানের কেবিন ও খাবারের সুব‍্যবস্থা আছে কিনা?

কাউন্সেলিং: কাউন্সেলিং এনেসথেসিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১. অপারেশনের আগে রোগী এবং রোগীর আত্মীয় স্বজনদের অপারেশন এবং এনেসথেসিয়া সম্পর্কে অবগত করা, বিপদের ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা। ২. অপারেশনে রক্ত লাগতে পারে এটা অপারেশনের আগে রোগীকে অবহিত করা, যাতে রোগী আগে থেকেই ডোনার প্রস্তুত রাখতে পারে। ৩. অপারেশন পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে রোগীকে অবহিত করা।আধুনিক এনেসথেসিয়া এবং উন্নত মনিটরিং সিস্টেমের কল্যাণে বিশেষজ্ঞ এনেসথেটিষ্টের হাতে এনেসথেসিয়া প্রয়োগ এখন অনেক নিরাপদ। ভয়ের কোনো কারণ নেই।

লেখক: প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, এনেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগ, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসন্তানের নিরাপত্তা, হেদায়াত ও দ্বীনি সফলতার জন্য যে দোয়া করবেন পিতা-মাতা
পরবর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা