ঈদ আসার আগেই বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে আগুন। প্রতিটি পণ্যের মূল্য আকাশচুম্বি। অসাধু ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষায় প্রতিযোগিতা বাড়ছে। অভিযোগ ক্রেতাদের, প্রতিবছরের মতো এবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তাঁরা। সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি, অথচ প্রতিটি পণ্যের মূল্য একদিনে বেড়ে গেছে অনেক। এই ফাঁকে ভেজাল দ্রব্যের ছড়াছড়ি প্রত্যক্ষ করা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, ব্যবসা–বাণিজ্য তথা ভোক্তা অধিকারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা দাম দিয়ে ভেজাল পণ্য ও সেবা ক্রয় করি। এ নিয়ে নাগরিকরা কোনো প্রতিবাদ করে না। রাষ্ট্রও নির্বিকার। কিন্তু অন্যান্য দেশে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের কথা ভাবাও যায় না। ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন করলে অনেক দেশে বিক্রেতার লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল করা হয়। শুধু তাই নয়, আছে ফৌজদারি দণ্ডও। তাই আইনের বাস্তবায়নটাই বড় কথা। যেকোনো দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের প্রথম পদক্ষেপ হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কিন্তু আমাদের মাঝে অর্থাৎ ভোক্তাদের মাঝেই সে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। ফলে ভোক্তারা পদে পদে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে। মিথ্যাচার, ভেজাল, ফর্মালিন আজ ভোগ্যপণের সাথে মিশে গেছে। এমনকি ওষুধ দিয়ে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। বাজারের শাক–সবজি, ফল–মূল সব কিছুতেই ফরমালিন। আইন প্রণয়নের পর বিভাগ, জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় বাজার মনিটরিং ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে এ আইন বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে অভিযান পরিচালনার সংবাদ দেখা যায়। এটিকে আংশিকভাবে এ আইন বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু জনগণের দোড়গোড়ায় এ আইনকে পৌছে দিতে হবে। সচেতন করতে হবে সবাইকে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসাবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়। সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও দেখান এমন অজুহাত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের মূল্যে উন্নত দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। সাধারণভাবে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি বা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে বাজারে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে পণ্যের দাম বাড়তেই পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এ নিয়ম অনেকদিন ধরেই খাটছে না। দেখা যায়, পণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহ থাকলেও তা বেশি দামে বিক্রি হয়। দ্রব্যমূল্যের এই অযৌক্তিক বৃদ্ধির পেছনে কাজ করে বাজার সিন্ডিকেট। তারা যোগসাজশের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। নানা অজুহাত তুলেও বাড়ানো হয় পণ্যের দাম। এ অবস্থায় বেশি দামে পণ্য ক্রয় করা ছাড়া ভোক্তাদের কোনো উপায় থাকে না। এভাবে দ্রব্যমূল্য, বিশেষত নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা অপরাধও বটে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের শাস্তি হওয়া উচিত; কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা বিরল। ফলে কারসাজি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের এ প্রবণতা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব সরকারের। ব্যবসায়ীরা কায়েমি স্বার্থে ইচ্ছামতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে, আর সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে, এটা চলতে পারে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজার নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে, অসৎ ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে, এটাই প্রত্যাশা করেন সাধারণ মানুষ। প্রতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য রোধ করা হবে, ভেঙে দেওয়া হবে সিন্ডিকেট। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এসব কথা কার্যকর হয় না। তাই সবার পক্ষ থেকে সরকারকে আহ্বান জানাতে চাই, দ্রব্যমূল্য ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করুন। খেটে খাওয়া মেহনতি–শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহজ করুন। অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও দৌরাত্ম্য রুখে দিন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করুন। জনগণের জান–মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। আমরা বাজারের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেখতে চাই। দেখতে চাই সরকারের সদিচ্ছা। সাধারণ মানুষকে অসাধু ব্যবসায়ীদের কবল থেকে উদ্ধার করতে হবে সরকারকেই।








