যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে সে দেশে বাংলাদেশি পণ্যে আরোপ করা শুল্ক কমার ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আশা করি (শুল্ক) বাড়াচ্ছে না। ২০ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। এখন যেটা আছে তার চেয়ে বেটার হবে। এমন খুব স্ট্রং আশ্বাস আমাদের দেওয়া হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও সেখানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ফলাফল তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ডব্লিউইএফের সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাবিনেট পর্যায়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর আরো কয়েকটি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় শুল্ক ছাড়াও কিছু খাতে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে। আগে থেকেই ছিল ১৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ৩৫ শতাংশ। শুল্ক কমানোর ইঙ্গিত পাওয়ার কথা বললেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি তুলে ধরে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, আমরা আশা করছি, এই সপ্তাহের শেষ দিকে বা আগামী সপ্তাহে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তখন বিস্তারিত জানানো যাবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে অশুল্ক বাধা কমানো এবং ব্যবসা সহজীকরণ–সংক্রান্ত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের চলমান সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব সংস্কারের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে অগ্রগতি দ্রুত হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার কথা তুলে ধরে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রেসিপ্রোকাল বা পাল্টা সুবিধাভিত্তিক নীতি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলেও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও সক্রিয় অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবের একাধিক মন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রিন্সেস রিমা বিনতে বন্দর আল সৌদের সঙ্গে পর্যটন শিল্প নিয়ে আলাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মিশর ও সৌদি আরবে পর্যটনে রেকর্ড প্রবৃদ্ধির পেছনে টুরিস্ট এঙপেরিয়েন্স তৈরির দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, পর্যটন এমন একটি খাত যেখানে কর্মসংস্থান অনুপাত তুলনামূলক বেশি এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য এ খাতে বড় সুযোগ রয়েছে।
জাপানের সঙ্গে ইপিএ : জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) প্রসঙ্গে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশ আগে কোনো দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করতে পারেনি, মূলত প্রক্রিয়াগত ধীরগতির কারণে। এবার এক বছরের মধ্যে শেষ করার প্রতিশ্রুতি ছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, চুক্তি শেষ পর্যায়ে এসেছে। আর আগামী দুয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করা হবে।
জিএসপি প্লাস নয়, দরকার দ্রুত এফটিএ : ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্ক ও কোটা সুবিধা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, জিএসপি প্লাস কাঠামোর সেফ থ্রেশহোল্ড সমস্যা থাকায় বাংলাদেশকে দ্রুত এফটিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে যেতে হবে। তার ভাষায়, ২০২৯ সালের পর আসলে আমাদের দরকার হলো এখন ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) করা, যত দ্রুত সম্ভব।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে বা এলডিসিতে থাকা পর্যন্ত এবং পরবর্তী তিন বছর সময় থাকলেও এ সময়ের মধ্যে এগোতে হবে এবং পরবর্তী সরকারকে এই সম্পর্ক ও কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওর ডিরেক্টর জেনারেলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আগের মতো বহুপক্ষীয় কাঠামোর বিশেষ সুবিধার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্ব অগ্রাধিকারমূলক থেকে পারস্পরিক বাস্তবতায় যাচ্ছে। এতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারি সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ডব্লিউএইচওতে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি বলেন, রেডলিস্ট থাকায় প্রশিক্ষিত নার্সরা জার্মান স্ট্যান্ডার্ড ও ভাষা প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও জার্মানিতে যেতে পারছে না; দ্রুত এ সমস্যার সমাধান দরকার।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংক্রান্ত আলোচনায় লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশকে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমানভাবে পদক্ষেপ দেখাতে হবে, কারণ আন্তর্জাতিকভাবে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। তিনি কানাডা ভিসা আবেদন কেন্দ্র করে একটি উদাহরণও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, সিঙ্গাপুরে ক্যানাডিয়ান হাই কমিশনারের অফিস থেকে একটা বস্তা ভর্তি ৬০০ পাসপোর্ট পাঠিয়েছে। ৬০০ পাসপোর্ট, সব হলো ভিসা আবেদন… যখন ধরা পড়ে তখন আর পাসপোর্টটা পিকাপ করতে যায় না…পুলিশ জিডি করে বলে পাসপোর্টটা হারিয়ে গেছে। এভাবে একটি চক্র কাজ করে এবং এদেরকে আমরা ধরে এখন এটা নিয়ে কাজ চলছে।












