প্রায়ই বিকল হচ্ছে গ্যান্ট্রি ক্রেন ব্যাহত কন্টেনার হ্যান্ডলিং

বন্দরের পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে

হাসান আকবর | শুক্রবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রধান ইক্যুইপমেন্ট কী গ্যান্ট্রি ক্রেন নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনালের (সিসিটি) ২০ বছরেরও বেশি পুরানো চারটি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন প্রায়শঃ অচল থাকে। কিন্তু নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের (এনসিটি) জন্য আনা নতুন গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলোও বিভিন্ন সময় বিকল হয়ে পড়ছে। অতি সম্প্রতি এনসিটি২ টার্মিনালের ক্রেনটি প্রায় ৩৩ ঘণ্টা অচল থাকে। এতে ওই বার্থে নোঙর করা জাহাজকে অন্ততঃ ২শ’ টিইইউএস কম কন্টেনার নিয়ে বন্দর ছাড়তে হয়েছে। সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রেনগুলো যখন তখন বিকল হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে হলে কী গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।

সূত্র জানিয়েছে, আধুনিক বন্দরের অপরিহার্য ইক্যুইপমেন্ট হচ্ছে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন। বিশ্বের শিপিং সেক্টরের অত্যাবশ্যকীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ইক্যুইপমেন্ট ব্যবহার করে জাহাজ থেকে কন্টেনার নামানো এবং জাহাজে কন্টেনার বোঝাই করার কাজ করা হয়। এ ইক্যুইপমেন্টের প্রতিটির দাম বর্তমানে একশ’ কোটি টাকারও বেশি। জেটিতে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন থাকলে গিয়ারলেস ভ্যাসেল (ক্রেন নেই এমন জাহাজ) হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি জাহাজের ক্রেন ব্যবহার না করেও কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যায়। এতে জাহাজে কন্টেনার উঠানো নামানোর কাজ অনেক বেশি গতিশীল হয়। যা বন্দরের সার্বিক উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রেনগুলো জাহাজের ১৫ সারি পর্যন্ত কন্টেনার নামাতে এবং উঠাতে পারে। ক্রেনগুলো ঠিকঠাকভাবে কাজ করলে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ফিডার ভ্যাসেলগুলো ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কন্টেনার নামিয়ে আবার জাহাজ বোঝাই করে নোঙর তুলতে পারে। যা জাহাজের ক্রেন দিয়ে করতে গেলে অনেক বেশি সময় লাগে। তাছাড়া বিশ্বে এখন গিয়ারলেস ভ্যাসেলের কদর বেশি, ভাড়া কম। যে বন্দরে বা জেটিতে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন নেই সেখানে গিয়ারলেস ভ্যাসেল হ্যান্ডলিং করা যায় না। এতে করে যে কোনো বন্দরের ইমেজও অনেকটা এই কী গ্যান্ট্রি ক্রেনের উপর নির্ভর করে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিং শুরু করার অন্তত ২৮ বছর পর ২০০৫ সালে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয়। মাত্র চারটি গ্যান্ট্রি ক্রেন এনে স্থাপন করা হয় চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল বা সিসিটিতে। ওই সময় ক্রেনগুলো পুরনো কিনে আনা হয়েছিল। ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ওই চারটি ক্রেনই ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের ইক্যুইপমেন্ট বহরে। পরবর্তী চার বছরে কিনে আনা হয় আরো ১৪টি ক্রেন। আর এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি ও এনসিটির সবগুলো জেটিতেই কী গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজিত হয়। নতুন কিনে আনা ১৪টি ক্রেনই স্থাপন করা হয় নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের চারটি বার্থে। এনসিটি২ থেকে ৫ পর্যন্ত জেটিতে ১৪টি ক্রেন রয়েছে। এনসিটি১ মোবাইল হারবার ক্রেন দিয়ে পানগাঁওচট্টগ্রাম রুটের ছোট জাহাজে কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এনসিটির চারটি জেটিতে ১৪টি নতুন ক্রেন দেয়া হয়েছিল বহুল আলোচিত বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেককে বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্য। সাইফ পাওয়ার টেকই এসব কী গ্যান্ট্রি ক্রেন বন্দরে সরবরাহ দিয়েছিল। অর্থাৎ বন্দরের টাকায় নিজেদের ব্যবসা ক্ষেত্রে হাজার কোটিরও বেশি টাকা দামের কী গ্যান্ট্রি ক্রেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে স্থাপনের ব্যবস্থা করেছে। চারটি বার্থে ১৪টি ক্রেন, অথচ সিসিটির তিনটি বার্থে ক্রেন রয়েছে মাত্র ৪টি। তাও বিশ বছরের বেশি পুরনো। ওই চারটি ক্রেনও সরবরাহ দিয়েছিল সাইফ পাওয়ার টেক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, একটি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে ঘণ্টায় ৩০ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন একযোগে কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় হ্যান্ডলিং হওয়ার কথা ৫৪০ টিইইউএস কন্টেনার। কিন্তু ক্রেনের সমস্যার কারণে বন্দরের উৎপাদনশীলতা কমে আসছে। কী গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো নানাভাবে সমস্যা করছে। দেখা দিচ্ছে যান্ত্রিক ত্রুটি। কখনো ক্যাবল ছিঁড়ে যাচ্ছে, কখনো লক হয়ে যাচ্ছে। কখনো ইঞ্জিন গরম হয়ে যাচ্ছে। আবার ঠিকঠাক করে চালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনালের চারটি কী গ্যান্ট্রি ক্রেন দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় প্রায়শঃ সমস্যা করছে। এরমধ্যে সিসিটি১ এবং সিসিটি৩ এর ক্রেন প্রায়শঃ অচল থাকে। গতকালও এসব ক্রেন বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে অচল ছিল বলে সূত্র জানিয়েছে। সিসিটি১ ও সিসিটি৩ এর গ্যান্ট্রি ক্রেনের কার্যক্ষমতা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে বন্দরের পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে।

এনসিটির নতুন কী গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলোতেও কম বেশি সমস্যা হচ্ছে। এসব ক্রেনও বিভিন্ন সময় নষ্ট হয়ে অচল হয়ে পড়ে থাকে। অতি সম্প্রতি এনসিটি২ বার্থে এমভি ইন্টার এশিয়া ফরওয়ার্ড ভি১৭৭ নামের জাহাজের কন্টেনার হ্যান্ডলিংকালে প্রায় ৩৩ ঘণ্টা ক্রেন অচল থাকে। জাহাজটি গত ১৫ জানুয়ারি সকাল ১০টায় এনসিটি২ এর বার্থে নোঙর করে। তবে ১৬ জানুয়ারি বিকেল ৪টা ৪০ মিনিট থেকে গ্যান্ট্রি ক্রেন নম্বর৭ বিকল হয়ে পড়ায় জাহাজটির আমদানি কন্টেনার খালাস কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়। ৩৩ ঘণ্টা পর ১৭ জানুয়ারি রাত ১টা ৪০ মিনিটে গ্যান্ট্রি ক্রেনটি মেরামত শেষে চালু করা হয়। এরপর কিছু কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা হলেও পরদিনই জাহাজটি অন্ততঃ ২শ’ টিইইউএস কন্টেনার না নিয়েই বন্দর ছেড়েছে।

একাধিক শিপিং এজেন্সির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরনো ক্রেনগুলো খুবই সমস্যা করছে। ২০ বছরের পুরনো এসব ক্রেন যত দ্রুত সম্ভব সরিয়ে নতুন ক্রেন না বসালে বন্দরের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা বলেন, ক্রেন সংকটের কারণে জাহাজে পণ্য হ্যান্ডলিং ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় পণ্য না নিয়েই জাহাজকে বন্দর ছাড়তে হচ্ছে। বিষয়টি আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাব সদস্য হত্যার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৩
পরবর্তী নিবন্ধমোবাইলের ক্ষতিপূরণের জন্য কোমরে শিকল বেঁধে তিন দিন ধরে নির্যাতন