প্রবাহ

কাফেলা এজেন্সীর তত্ত্বাবধানে হজ্ব

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ১০ মে, ২০২৩ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

চলতি বছর শতকরা ৯০ জনের অধিক হজ্ব করবেন কাফেলা এজেন্সীর তত্ত্বাবধানে। বাকী স্বল্প সংখ্যক ১৫ হাজার জনেরও কম হজ্ব করবেন সরকারী তথা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে। হজ্বযাত্রীগণের মাঝে সরকারী তত্ত্বাবধানের চেয়ে কাফেলা এজেন্সীর তত্ত্বাবধানে হজ্ব করতে অত্যধিক আগ্রহ। ফলে ধর্ম মন্ত্রণালয় নিজেই ১৫ হাজার জনের কোটা রেখে ১ লাখ ১২ হাজার ১৯৮ জনকে কাফেলা এজেন্সীর তত্ত্বাবধানে দিয়ে দেয়।

হজ্ব করতে প্রথমে প্রাকরেজিস্ট্রেশন, পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রেশন হয়ে হজ্বযাত্রী নির্ধারণ হয়ে গেছেন। প্রাকরেজিস্ট্রেশন স্বতন্ত্রভাবে নিজ ইচ্ছাধীনও করা যায়। কিন্তু হজ্বযাত্রী হজ্বে গমনের সিদ্ধান্ত নিতেই কোন না কোন এজেন্সী নির্ধারণ করে তাদের মাধ্যমে প্রাকরেজিস্ট্রেশন করিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে হজ্বে গমনের আগে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করেন। কাফেলা এজেন্সী প্রধান পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনায় ঘর ঠিক করবেন, ৫ দিনব্যাপী হজ্ব পালনে মোয়াল্লেম নির্ধারণ করবেন। সাথে ফ্লাইট নির্ধারণ এবং যাওয়াআসার তারিখও নির্ধারণ করে নিবেন।

পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনায় অনেক খাবার সরবরাহকারী হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তারা ওমরাহ সিজনে ওমরাহ, হজ্ব সিজনে হজ্বযাত্রীগণকে প্যাকেট করে তাদের অবস্থান করা দালানে খাবার পৌঁছে দেন। সে লক্ষ্যে প্রয়োজন মত প্রবাসী লোকজন নিয়োগ দেয়। কাফেলা এজেন্সীও তাদের সাথে যোগাযোগ করেন পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনায় তাদের ঠিক করা নির্ধারিত দালানে হজ্বযাত্রী সংখ্যা অনুপাতে ৩ বেলা খাবার পৌঁছে দিতে। এতে হজ্বযাত্রীগণ বেসরকারী কাফেলা এজেন্সীর মাধ্যমে হজ্ব করাকে নিরাপদ স্বাচ্ছন্দবোধ করে থাকেন। অপরদিকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ্ব করলে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনায় তাদের ঠিক ঘরে অবস্থান নিলেও খাবার সরবরাহ বাদে বাকী বেসরকারী ব্যবস্থার সাথে মৌলিক ব্যবধান নেই। তবে সরকারী ব্যবস্থাপনার হজ্বযাত্রীরা শতভাগ বাংলাদেশ বিমানে যাওয়া আসা করে। মিনার তাঁবু অনেকটা জমরাতের নিকটে ভাল অবস্থানে হয়ে থাকে। অর্থাৎ মিনায় অবস্থান করাটা কাফেলা এজেন্সীর চেয়ে সরকারী ব্যবস্থাপনা আমার কাছে উত্তম বলে মনে হয়। কাফেলা এজেন্সী প্রধানরা হজ্বের যাওয়াআসা ফ্লাইট এবং সে অনুপাতে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনায় ঘর ঠিক করে যাবতীয় কিছু সময়ে সময়ে তার তত্ত্বাবধানে হজ্বযাত্রীগণকে জানিয়ে দিতে থাকেন। হজ্বে গমনের আগে হজ্ব প্রশিক্ষণের নামকরণে কয়েক ঘন্টার এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। এক কথায় হজ্বের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা কাফেলা এজেন্সীরা করে দিয়ে যাবেন। শুধুমাত্র নিজের হাত খরচ, কেনাকাটার জন্য হজ্বযাত্রীরা অতিরিক্ত কিছু টাকা হয়ত নিয়ে যাবেন।

বাংলাদেশ বিমান সম্প্রতি অবস্থা এবং চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র মদিনায় বিমান যাতায়াতকে গুরুত্ব দেয়। ফলে ঢাকাপবিত্র মদিনা সপ্তাহে কয়েকেটি ফ্লাইট যাওয়াআসা করছে। অপরদিকে চট্টগ্রাম থেকে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট যায় পবিত্র মদিনায়। হজ্ব ও ওমরাহ এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানের ব্যবস্থাপনা উত্তম, যদিও ভাড়া অনেক বেশি, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সৌদি সরকারও জেদ্দার মত পবিত্র মদিনা বিমান বন্দর সংলগ্ন পৃথক হজ্ব টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। এতে কাফেলা এজেন্সীরা চেষ্টা করে থাকেন হজ্বের আগে জেদ্দা নামলে হজ্বের পর পবিত্র মদিনা থেকে দেশে ফেরা অথবা হজ্বের আগে পবিত্র মদিনা নামলে হজ্বের পর জেদ্দা থেকে দেশে ফেরা। পবিত্র মক্কা থেকে পবিত্র মদিনার দূরত্ব ৪২৫ কি.মি। এতে একবারই যাওয়া বা আসতে হবে। যা হজ্বযাত্রীগণের জন্য আরামদায়ক। সৌদি সরকারের জন্যও কিছুটা ঝামেলামুক্ত।

ওমরাহ এর ক্ষেত্রে যে কোন বিমানে যাওয়াআসা করা যায়। কিন্তু হজ্বের ক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্নতা। বাংলাদেশ এবং সৌদি বিমান অর্ধেক অর্ধেক হজ্বযাত্রী বহন করবে। সৌদি সরকার ১০/১৫ বছর থেকে এ নিয়মটা চালু করে। বড় বড় মুসলিম দেশগুলো থেকে হজ্বযাত্রী পরিবহন করতে সে দেশের বিমান হজ্বযাত্রী পরিবহন করবে অর্ধেক জন। বাকী অর্ধেক জন পরিবহন করবে সৌদি বিমান।

বস্তুতঃ হজ্ব এজেন্সী কাফেলা প্রথা সৌদির নির্দেশনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু হয় ২০০০ সালের পরপর। তার মূলে সৌদি সরকার চাচ্ছেন নিয়ম শৃংখলা মেনে বিভিন্ন দেশ থেকে হজ্বযাত্রীগণ আসুক, হজ্ব করে ফিরে যাক। যেহেতু গরীব দেশের হজ্বযাত্রীরা তথায় পৌঁছে অনেকটা নিয়ম শৃংখলা মানতেন না। রাস্তার ধারে যেন তেন স্থানে অবস্থান নিতেন। মিনা মুজদালেফা গমনের ক্ষেত্রে টাকা বাঁচানোর জন্য যেন তেনভাবে গমনা গমন করতেন অবস্থান নিতেন। এ পরিবেশ দেখে সৌদি সরকারের টনক নড়ে। তখন তারা বিভিন্ন দেশে দিক নির্দেশনা পাঠায়। ফলে বিভিন্ন মুসলিম দেশের মত আমাদের দেশে হজ্ব কাফেলা এজেন্সী প্রথা চালু হয়ে যায়।

সাম্প্রতিককালে ওমরাহ এর ক্ষেত্রেও সৌদি সরকার দিক নিদের্শনা জারি করেছে যাতে শৃংখলা ঠিক থাকে।

হজ্বযাত্রীগণ কাফেলা এজেন্সী নির্ধারণ করতে আত্মীয় বা আত্মীয়ের আত্মীয়, বন্ধু বা বন্ধুর বন্ধুকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন বেশি। ফলে অধিকাংশ হজ্বযাত্রী ১০/২০ হাজার টাকা কম দিতে আবদার করে থাকেন।

কাফেলা এজেন্সীরাও বন্ধু, আত্মীয়ের সুবাদে টাকা কম নেয়ার পাশাপাশি তাদের প্রতি বিশেষ সুনজরে রাখার আশ্বাস দেয়া স্বাভাবিক। যেহেতু শতে ১০/১৫ কাফেলা এজেন্সী পর্যাপ্ত হাজী পেয়ে থাকে। বাকীরা নানান কৌশল ব্যবস্থা অবলম্বন করে থাকেন হাজী পেতে। তৎমধ্যে ছোট ছোট কাফেলা অন্যতম। ৮/১০ জন বা ১৫/২০ জন নিয়ে কাফেলা প্রধান কোন না কোন এজেন্সীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। নিজেও হজ্ব করল তার নিয়ন্ত্রণে হজ্বযাত্রীগণকে তত্ত্বাবধান করল। মূল এজেন্সীর ভিতর কাফেলা নেই এই রকম সংখ্যা শতে ৪/৫ টির বেশি হবে মনে হয় না।

হজ্বযাত্রীরা এজেন্সীর সাথে আলাপ আলোচনা চূড়ান্ত করতে চান এমন সংখ্যা কম। সম্প্রতি আলাপ চূড়ান্ত করার সুযোগও নেই। যেহেতু প্রাকনিবন্ধনে হজ্বের খরচের আলোচনা চূড়ান্ত করার সুযোগ কম। ফলে কাফেলা এজেন্সী প্রধান হজ্বযাত্রীগণকে টাকার অংক ও ব্যবস্থা যা নির্ধারণ করে দিবে তাই চূড়ান্ত । হজ্ব ফরজ এবাদত। এই ফরজ এবাদত করতে গিয়ে এই ধরনের টাকার লেনদেন কতটুকু শরীয়ত সম্মত তা ধর্মীয় বিজ্ঞজনই ভাল বুঝবেন, কাফেলা এজেন্সীরা ভাববেন আশা করি।

হজ্ব করতে গিয়ে কাফেলা এজেন্সীর ব্যবস্থাপনার উপর চরম অসন্তুষ্ট প্রকাশ করে থাকেন এই রকম হজ্বযাত্রীর সংখ্যাও কম নয়; ব্যাপক। হজ্বযাত্রীগণ মহান আল্লাহপাকের আমন্ত্রিত মেহমান। অতএব কাফেলা এজেন্সীর প্রতি নিবেদন থাকবে আপনার ব্যবসার ভিতর ন্যূনতম লাভ করে হজ্বযাত্রীগণকে ভাল সেবা দেয়ার চেষ্টা করুন।

অপরদিকে হজ্বযাত্রীগণের প্রতিও নিবেদন থাকবে হজ্ব এবাদতের সফর, পুণ্যের নিয়তে কষ্ট স্বীকার করে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। কাফেলা এজেন্সীর ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম থাকলে আপনি সুন্দরভাবে এজেন্সী প্রধানকে জানান। এজেন্সী প্রধান বা তার স্টাফদের সাথে রাগ দেখানো, ঝগড়া করা মোটেও কাম্য নয়। এর দ্বারা আপনার পবিত্র সফরের ওপর দাগ পড়বে। মহান আল্লাহপাক হজ্বযাত্রীগণের হজ্ব কবুল করুন।

আমিন। লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট. গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্মৃতিতে অম্লান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা স্কুল ব্যাচ-১৮ এর পুনর্মিলনী