চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের অগোছালো ট্রাফিক ব্যবস্থা, সিগন্যাল অকার্যকারিতা ও সড়ক নিরাপত্তার সংকট কাটাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। প্রথমবারের মতো নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে বসানো হচ্ছে এআইভিত্তিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। একই সঙ্গে স্থাপন করা হবে সোলার ও নন–সোলার প্রযুক্তির স্মার্ট সড়কবাতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে নগরীর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে সিএমপি। পর্যায়ক্রমে নগরীর ৫৩টি ট্রাফিক স্পটে এ প্রযুক্তি সমপ্রসারণ করা হবে। ক্যামেরাগুলো যানবাহনের গতি, যানজটের ঘনত্ব, সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, অবৈধ পার্কিং এবং বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
এদিকে পুরো নগরীর ট্রাফিক ও আলোকায়ন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে দুটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৭ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত হয়েছে এবং শিগগিরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ৪৪৫ কোটি টাকা। এটির ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। দুটি প্রকল্প মিলিয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৬৬২ কোটি টাকা।
চসিক সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকায় এআইনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পাওয়া অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিবেচনায় চট্টগ্রামেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নিউমার্কেট, কাজীর দেউড়ি, ২ নম্বর গেট, প্রবর্তক মোড়, টাইগারপাস, অলি খাঁ মোড়, আগ্রাবাদ, নয়াবাজার ও অঙিজেন মোড়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে প্রথম ধাপে সাতটি স্পটে এআই ক্যামেরা বসানো হবে।
প্রকল্পের আওতায় শুধু নজরদারি ক্যামেরাই নয়, স্মার্ট সড়কবাতিও স্থাপন করা হবে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এলইডি প্রযুক্তি, সোলার ও নন–সোলার সমন্বিত আলোকব্যবস্থা এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য লাইটিং সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি নগরীর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সেতু, জনবহুল এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
চসিক কর্মকর্তারা বলছেন, এআইভিত্তিক নজরদারি চালু হলে অপরাধ দমন, দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ, যানজট ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবার দ্রুত সমন্বয় এবং নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত স্মার্ট সিটি অপারেশন সেন্টার গড়ে তোলার ভিত্তিও তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশও প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি যুক্ত হলে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে এবং ট্রাফিক পুলিশকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাৎক্ষণিক তথ্য সহায়তা দেবে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা শুধু প্রযুক্তি স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমন্বিত ট্রাফিক সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন।
নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, অতীতেও চট্টগ্রামে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। ফলে কেবল এআই ক্যামেরা বসালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। এর সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার, কার্যকর সিগন্যাল ব্যবস্থা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ব্যয়বহুল প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল নগরবাসী পাবে না।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ইমপ্লিমেন্টেশন অব স্মার্ট লাইটিং (সোলার–নন–সোলার) উইথ এআই–বেসড সিসিটিভি সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম ইন চট্টগ্রাম সিটি এরিয়া ফর এনশিউরিং স্মার্ট অ্যান্ড সেফ সিটি’ শিরোনামে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ডিপিপি চূড়ান্ত করে দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে আগামী তিন মাসের মধ্যে টাইগারপাশ এবং সাগরিকায় দুই পয়েন্টে এআই ক্যামেরা বসবে। এই দুইটি পয়েন্টের সুফলের উপর পরবর্তীতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ট্রাফিক পয়েন্টে ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং মহানগরী পুলিশ বিষয়টি সমন্বয় করবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প দুটি অনুমোদন ও সফল বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। তবে এর সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।












