পৌরকর ২৬৪ কোটি টাকা, বন্দর দিতে চায় ৫০ কোটি

বন্দর ও চসিকের যৌথ সার্ভেতে পৌরকর নির্ধারণ আদায়ে অনড় চসিক, নৌ মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুই সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কমিটির

মোরশেদ তালুকদার | মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২৬ at ৬:২১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কাছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রস্তাবিত বার্ষিক পৌরকর ছিল ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এতে আপত্তি থাকায় মন্ত্রণায়ের নির্দেশে যৌথ সার্ভে করে উভয় সংস্থা। এতে পৌরকর নির্ধারণ করা হয় ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৮ টাকা। বিপরীতে মাত্র ৫০ কোটি পরিশোধ করার প্রস্তাব করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নির্ধারিত পৌরকর আদায়ে ‘অনড়’ চসিক। এ অবস্থায় চসিকের দাবিকৃত পৌরকর পরিশোধের বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উভয় সংস্থার প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, বন্দরের স্থাপনার মূল্যায়নে যৌথ কমিটি হয়। মূল্যায়ন শেষে ২৬৪ কোটি পৌরকর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ ন্যায্য পাওনাও পরিশোধ করছে না বন্দর। যৌথ কমিটির মিটিংয়ের রেজ্যুলেশন তারা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। আশা করছি মন্ত্রণালয় থেকে সিটি কর্পোরেশনের পাওনা পরিশোধে নির্দেশনা দেওয়া হবে।

মেয়র বলেন, কর্পোরেশনের আয়ের অন্যতম একটি খাত এ পৌরকর। বন্দর যদি কর্পোরেশনকে তার পাওনা না দেয় তাহলে কর্পোরেশনের রাজস্ব আয় কমে যাবে। এর ফলে জনগণ তাদের ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। তাছাড়া শহরের অধিকাংশ রাস্তা ৬১০ টন বোঝার গাড়ির জন্য নির্মাণ করা হলেও বন্দরের পণ্যবাহী ৫০৬০ টনের বোঝা নিয়ে গাড়ি চলাচল করছে। বন্দরে পণ্য আনানেওয়া করা হাজার হাজার ট্রাক, লরিসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করায় শহরের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর, জেটি হতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সড়কে অসংখ্য ভারী যানবাহন চলাচল করে। বন্দরমুখী সড়কগুলো এ কারণেই প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে। বন্দরের ভারী যানবাহনের কারণে নিয়মিত রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর কর্পোরেশনের অতিরিক্ত ৪০০৫০০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তাই বন্দরের উচিত ন্যায্য পৌরকর পরিশোধ করে নগরের রাস্তাঘাট সংস্কারে ভূমিকা রাখা।

যে কারণে যৌথ জরিপ : জানা গেছে, বকেয়াসহ চলতি ২০২৫২০২৬ অর্থবছরের ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা পৌরকর পরিশোধে গত বছরের ১০ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিল দেয় চসিক। এর মধ্যে নির্ধারিত হাল পৌরকর ধরা হয় ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এরপর ২৭ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে চলতি অর্থবছরের পৌরকর পরিশোধে আপত্তি জানায়। চবকের দাবি, চলতি অর্থবছরে পৌরকর খাতে কোনো বকেয়া নেই। এর প্রেক্ষিতে ১১ আগস্ট বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে চবকের বিভিন্ন স্থাপনা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা জানায় চসিক। এর প্রেক্ষিতে যৌথ সার্ভে করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যৌথ জরিপে বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট ১ কোটি ৭৩ লক্ষ ৪৬ হাজার ৪৯১ বর্গফুট স্থাপনা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে আবাসিক স্থাপনা রয়েছে ১৭ লক্ষ ২৪ হাজার ১০৬ বর্গফুট। এছাড়া ১৬ লক্ষ ৩৫ হাজার ৩৭৯ বর্গফুট অনাবাসিক এবং ১ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬ বর্গফুট ইয়ার্ড ও স্টোরেজ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থাপনার বিপরীতে বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং, পোর্ট ডিউটি, বার্থিংআনবার্থিং, পাইলোটেজ, টাগবোট ও লেট ফি’সহ বিভিন্ন ভাড়া ও আয়ের ভিত্তি করে এবং বন্দরের সক্ষমতার উপরের বিবেচনা করেই চসিক পৌরকর নির্ধারণ করে।

বন্দরের প্রস্তাব ৫০ কোটি টাকা : বন্দরের স্থাপনার মূল্যায়নে বন্দর পরিচালনা পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. মাহবুুবুল আলম তালুকদারকে আহ্বায়ক ও চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনকে সদস্য সচিব করে একটি গঠন করা হয় গত বছরের আগস্টে। কমিটিতে বন্দর ও চসিকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সদস্য রাখা হয়। সর্বশেষ ২৪ ফেব্রুয়ারি ওই কমিটির সভা হয়। সেখানে নির্ধারিত পৌরকরের বিপরীতে বন্দর মাত্র ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় প্রস্তাব করে। কিন্তু চসিক পুরোটা আদায়ে অনড়।

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, ২০১৭ সালের অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী বন্দরের কাছে ১৬০ কোটি পাবে সিটি কর্পোরেশন। বিপরীতে তারা একবার ৪৫ কোটি এবং আরেকবার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করে। সব মিলিয়ে ১৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। যেখানে তারা অতীতে ১৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, সেখানে তো আর এর চেয়ে কম পরিশোধের সুযোগ নেই। এ অবস্থায় তারা যৌথ সার্ভের মাধ্যমে নির্ধারিত ২৬৪ কোটি টাকার বিপরীতে পরিশোধ করতে চায় মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এটা কীভাবে সম্ভব? অতীতে যে টাকা দিয়েছে তার কম দেওয়ার সুযোগ কোনো অবস্থায় নেই। আপত্তি থাকলে তারা ২৬৪ কোটি টাকা নিয়ে আপিল করতে পারে। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, কর্পোরেশনের দাবি পরিশোধের সিদ্ধান্ত চেয়ে বন্দর মন্ত্রণালয়ে লিখবে।

জটিলতা যেখান থেকে : ২০১৭ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চসিকের প্রস্তাবিত ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা পৌরকর নিয়ে ২০২১ সালের ১৪ জুলাই চসিক ও বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। এতে তৎকালীন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে ৫০ কোটি টাকা পৌরকর চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু বন্দর পরিশোধ করে ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ শতাংশ সারচার্জ মওকুফের সুবিধা নিয়ে পরিশোধ করে মাত্র সাড়ে ৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত চসিকের সাধারণ সভায় তা অনুমোদন দেন তৎকালীন মেয়র রেজাউল।

এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পর ডা. শাহাদাত হোসেন ১৬০ কোাটি টাকার পুরোটা আদায়ের উদ্যোগ নেন। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর চবক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় চসিক। এতে অর্থবছরটির (২০২৪২০২৫) বন্দরের পরিশোধিত অংক বাদ দিয়ে বাকি ১১৫ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি নৌপরিবহন সচিবকেও চিঠি দেয় চসিক। এতে চসিকের প্রস্তাবিত পৌরকর পরিশোধে চবককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতে বলা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল চসিককে আপাতত ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করার নির্দেশনা দিয়ে চবক চেয়ারম্যানকে দাপ্তরিক পত্র দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। চবককে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘জয়েন্ট সার্ভে কমিটির রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে কমবেশি সমন্বয়ের শর্তে আপাতত ১০০ কোটি টাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে প্রদান করা যেতে পারে।’ এরপর ১৬ এপ্রিল বকেয়া পৌরকরের ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করে চবক।

এরপর গত জুলাইয়ে চসিক চলতি অর্থবছরের পৌরকরের বিল পরিশোধে চিঠি দেওয়ার পর আপত্তি করে চবক। এ বিষয়ে চসিককে দেওয়া চিঠিতে চবক দাবি করে, ‘২০২১২২ অর্থবছরে পৌরকর বার্ষিক ৪৫ কোটি টাকা নির্ধারিত হয়, যা ২০২৫২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ১০০ কোটি টাকা অ্যাসেসমেন্ট বা যৌথ সার্ভের মাধ্যমে ধার্যকৃত পৌরকরের সাথে সমন্বয়ের শর্তে পরিশোধ করা হয়। ২০২৫২০২৬ অর্থবছরের পৌরকর ৪৫ কোটি টাকা (রিবেট সুবিধাসহ) সমন্বয় হওয়ার পরও অতিরিক্ত ৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা পৌরকর খাতে পরিশোধিত আছে।

তবে চসিক জানায়, সিটি কর্পোরেশনসমূহের (কর) বিধি, ১৯৮৬এর ধারা ২১ অনুসারে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পৌরকর পুনর্মূল্যায়নের এখতিয়ার সিটি কর্পোরেশনসমূহকে দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী কর বিধি, ১৯৮৬এর ধারা ২০ মোতাবেক ২০১৭২০১৮ অর্থবছরের ১ম কোয়ার্টারে সিটি কর্পোরেশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ সার্ভের মাধ্যমে কর পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। ২০২১২০২২ অর্থবছরে পঞ্চবার্ষিকী মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের পূর্বে চবকের স্থাপনার বিপরীতে পৌরকর ধার্য করা হয়েছিল ২০১১ সালে। একই বছরের নভেম্বর মাসে দুই সংস্থার মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। এর আলোকে ওই অর্থবছর থেকে পৌরকর বাবদ ৩৯ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করে চবক। সারচার্জ মওকুফের সুযোগ নিয়ে সংস্থাটি ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা করে পরিশোধ করে।

এছাড়া ২০১৭ সালের পুনর্মূল্যায়নের উপর ২০২১ সালের ১৪ জুলাই চসিক ও বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠকে ধার্য হয় ৫০ কোটি টাকা। এর আলোকে ২০১৭২০১৮ অর্থবছর থেকে ২০২০২০২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিবছর বকেয়া বাবদ সাড়ে ১০ কোটি টাকা করে ৪ বছরে ৪২ কোটি উসুল বাদ বকেয়া দাবি করে চসিক। কিন্তু ২০২০২০২১ অর্থবছর পর্যন্ত তা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না বলে চসিককে ওই সময় জানিয়ে দেয় চবক।

এর আগে ১৯৯৪৯৫ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা পৌরকর দাবি করলেও চবক ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করত। তবে ২০০১০২ অর্থবছরে চসিক বকেয়া ১৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা দাবি করে। ওই সময় বন্দরের আপত্তিতে চসিক অনড় থাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ করে। পরে দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে চবক ২০১২ সালে ১১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করে চসিককে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি আজ শুরু
পরবর্তী নিবন্ধআগেভাগে জাকাত প্রদান করুন