বরফের চাদরে ঢাকা এক নির্জন দ্বীপের নাম গ্রিনল্যান্ড। যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। তার নাম গ্রিনল্যান্ড। গ্রিন দিয়ে শুরু হলেও, গ্রিনল্যান্ড মোটেই সবুজ নয়। যে দিকেই তাকানো যায় শুধু দেখা যায় সাদা সাদা বরফ। আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড। গ্রিনল্যান্ডে ৮০ শতাংশ জুড়েই বরফ। এই গ্রিনল্যান্ডই এখন বিশ্বের বহু পর্যটকদের কাছে সেরা ভ্রমণ ডেস্টিনেশন।
মাছ ধরা অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু, এখানে বাণিজ্যিক খনিজ সম্পদও রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি বৃহৎ সোনার আমানত, পাশাপাশি অফশোর তেল অনুসন্ধান। ২০২৩ সালের এক জরিপ থেকে জানা গেছে, ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে ২৫টি গ্রিনল্যান্ডে আছে। অঞ্চলটিতে পাওয়া মূল্যবান খনিজ সম্পদের মধ্যে আছে বিরল মৃত্তিকা উপাদান, সোনা, হীরা, তামা, গ্রাফাইট, ইউরেনিয়াম, জিঙ্ক বা দস্তা, লোহার আকরিক, নিকেল, টাইটেনিয়াম, ভ্যানাডিয়াম, টাংস্টেনসহ আরও অনেককিছু।
নরওয়েজিয়ান এরিক দ্য রেড ৯৮২ সালে গ্রিনল্যান্ড পরিদর্শন করেছিলেন। ১৫ শতকে আদি নর্স জনবসতিগুলি বিলুপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু ১৭২১ সালে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে পুনরায় উপনিবেশ করে। ১৯৫৩ সালে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে স্বরাষ্ট্র শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে, পূর্ণ স্বাধীনতার আন্দোলন সমর্থন পেতে শুরু করে।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড শীতের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। খুবই অল্প সংখ্যক লোক এখানে বসবাস করে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এখানে সূর্য ওঠে না। কনকনে ঠান্ডায় বাড়ির বাইরে প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বের হন না। অন্য দিকে, এপ্রিল থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এখানে সূর্য অস্ত যায় না।
উত্তর গ্রিনল্যান্ডে সেই সময়সীমা আরও দীর্ঘ হয়। টানা ৬ মাস ধরে উত্তর গ্রিনল্যান্ডে সূর্য অস্ত যায় না। বছরের অন্যান্য সময়ে এখানে দিন এবং রাত হয়। তবে যখন শীত থেকে গরমের দিকে ঋতু এগোয়, সেই সময়ে দিনের সময়সীমা বাড়তে থাকে এবং রাতের সময় কমতে থাকে।
পৃথিবীর সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করার পাশাপাশি নিজের অক্ষ রেখাতেও ঘুরে চলেছে অবিরাম। যে কারণে সূর্যের আলো পৃথিবীর সব অংশে এসে ঠিকভাবে পৌঁছায় না। গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর উত্তর মেরুর কাছে অবস্থিত হওয়ায়, এখানে দিন ও রাতের ব্যবধান চলতে থাকে।
বিশাল বড় এই দ্বীপে মাত্র ৫৬ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এখানে মূলত ইনুইট জনগোষ্ঠীর মানুষেরাই থাকেন। আগে এখানে পৌঁছনো ছিল কষ্টসাধ্য। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক। যেখানে ২০২৪ সালে তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এরপরে থেকেই গ্রিনল্যান্ড যাওয়া এখন পর্যটকদের কাছে তুলনামূলক সহজ। চলতি বছরেও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর খোলার কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বিমানবন্দরটি খুলছে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের কাকোরতোকে এবং দ্বিতীয়টি খুলছে ইলুলিসাতে।
গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ইলুলিসাত একটি বিশাল বড় মাছ ধরার হাব বলা যেতে পারে। এই বন্দরে মূলত হ্যালিবাট মাছ ও চিংড়ি ধরা হয়। ইলুসিত তার ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বরফের চাঁইয়ের জন্য বিখ্যাত। এখানে বিশাল উঁচু বরফের পাহাড় ভেসে বেড়ায়।
নৌকো করে এই সব আকাশ ছোঁয়া বরফের চাঁইয়ে পর্যটকদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়। রয়েছে ডিস্কো উপসাগর। যেখানে হাম্পব্যাক তিমির দেখা মেলে। এখানে তিমির মাংস খাওয়ারও সুযোগ পাওয়া যায়। ইনুইট জনগোষ্ঠী মেরু ভালুক শিকার করেও খান।
২০২৪ সালে ১,৪১,০০০ পর্যটক ভিড় জমিয়েছিল ইলুলিসাতে। বেশির ভাগ পর্যটক আমেরিকা ও আইসল্যান্ড থেকে এসেছিলেন। পর্যটকেরা এখানে এসে ছোট ছোট রঙিন কুঁড়ে ঘর ঘুরে দেখার সুযোগ পান। এ ছাড়াও দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের গ্রাম ও ডিস্কো উপসাগর ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া যায়। পূর্ব উপকূলের গ্রিনল্যান্ডে কম পর্যটক যান। এখানে জনবসতি খুবই কম, মাত্র ৩০০০। জাহাজে করে পর্যটকেরা এই অঞ্চলে যান। এখানে বরফের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর। উত্তর–পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে জাতীয় উদ্যানও আছে। মূলত গ্রিনল্যান্ডের মূল্যবান খনিজ সম্পদের উপর চোখ পড়েছে।









