পারকি সৈকতের উন্নয়ন কবে হবে

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যানজট নিত্য সঙ্গী । সৈকতে বিদ্যুৎ সংকট, ৪ সড়কের মধ্যে ৩টি অচল । চরে ময়লা আবর্জনা, পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি

এম. নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা | রবিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

পারকি সমুদ্র সৈকতের পাহাড়সম সম্ভাবনা থাকলেও সড়কের দু’পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়া, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, যানজট, পরিকল্পিত উন্নয়ন না হওয়াসহ বিগত সরকারের উদাসীনতায় পারকি সৈকত দেশের অন্যান্য সৈকতের তুলনায় এখনো যোজন যোজন পিছিয়ে রয়েছে। অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর যদি পারকি সৈকতের পরিকল্পিত উন্নয়ন বাস্তবায়নের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন তাহলে চট্টগ্রামে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠার পাশাপাশি প্রতিবছর এ সৈকত থেকে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয়ও হত।

স্থানীয়রা জানায়, কর্ণফুলী টানেল হওয়ার পর উজ্জ্বল সম্ভাবনার পারকি সৈকতে বিগত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিকল্পিত উন্নয়নের দাবি উঠলেও এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকায় মুখ থুবড়ে পড়েছে সৈকতের উন্নয়ন। পরিকল্পনাবিদদের মতে কর্ণফুলী টানেল চালুর পর চট্টগ্রাম কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে টানেল ঘুরে পারকিতে ঘুরে বেড়ানো অনেকটাএক টিকিটে দুই ছবি দেখার মতোই। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না এ সৈকত। বছরের পর বছর সম্ভাবনার তকমা লাগানো এই সমুদ্র ঘুরে পর্যটকরা আগ্রহ হারাচ্ছে। সৈকতে বেড়াতে এসে ভ্রমণার্থীরা এখানে কী অনুষজ্ঞ পাচ্ছে এই প্রশ্নই যেন অবান্তর। গত দুই তিন দশক ধরে যেসব পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে সেগুলোও বাস্তবায়ন শুধু কল্পনায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

গত ২৩ সালের ২৮ অক্টোবর টানেল উদ্বোধনের পর গত পারকি সৈকতে পর্যটকের আগমন কয়েকগুণ বাড়লেও পর্যটন সুবিধা না বাড়ায় আগত দর্শনার্থীদের চোখে মুখে হতাশা। পারকি সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার একমাত্র সড়কটির উন্নয়নের মাধ্যমে সম্প্রসারিত না করায় সপ্তাহের বন্ধের দিনে পর্যটক বাড়ার সাথে সাথে দীর্ঘ যানজট তৈরী হয়। এতে সৈকতে বেড়াতে আসার আনন্দ যেন অনেকের ধূলোয় মিশে যায়। প্রতিবছর সৈকতের চরের শত শত ঝাউগাছ সাগর গর্ভে বিলীন হলেও সৈকতের সৌন্দর্যবর্ধক ঝাউবাগান রক্ষায় কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেই।

সরেজমিনে পারকি সৈকত ঘুরে দেখা যায়, গত শুক্রবার বিকেল বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা যানজটে পড়ে পর্যটকদের ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। তাছাড়া সৈকতে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য নির্মিত ৪টি মাটির সড়কের মধ্যে প্রধান সড়কটির কার্পেটিং করা হলেও অন্য সড়কগুলো পায়ে হেঁটে যাওয়ার অবস্থাও নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি বিশেষ মহলকে সুবিধা দিতে কতিপয় মৎস্যজীবী পরিকল্পিতভাবে সড়কগুলো গর্ত করে অকেজো করে রেখেছে। শুধু তাই নয় সৈকতের নির্ধারিত গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থার জায়গাটিও অনেক ছোট হয়ে অবৈধ দখলদারদের কাছে চলে গেছে। যার কারণে বাধ্য হয়ে পর্যটকদের গাড়ির পার্কিং করতে হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানা জায়গা বা মূল সড়কের উপর। সৈকতের বালুচরে পড়ে আছে ময়লা আবর্জনা। পর্যাপ্ত ওয়াশরুম, নিরাপত্তা কর্মী না থাকা, আবাসন সুবিধা, সন্ধ্যাকালীন বিদ্যুৎ না থাকাসহ নানা সমস্যার শিকলে বন্দি পারকি এ সৈকত কখন মিলবে পর্যটন সেবা এই প্রশ্ন সবার কাছে।

এদিকে গতবছর বদলপুরা থেকে বার আউলিয়া পর্যন্ত বেড়িবাঁধের দুপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানের আদেশ হওয়ার পরও বিশেষ মহলের তদবিরে তা ঝুলে আছে। টানেল হয়ে কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে পারকি সৈকতে বেড়াতে এসে চরম হতাশা প্রকাশ করলেন ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম। তিনি আজাদীকে বলেন, টানেল ঘুরতে এসে পারকি সৈকতে বেড়াতে আসলাম। মনে করছি রথ দেখা আর কলা বেচা দুটোই একসাথে হবে। কিন্তু পারকি এসে সৈকতের অব্যস্থাপনা আর তীব্র যানজটে পড়ে আনন্দের চেয়ে কষ্ট ও ভোগান্তি বেড়েছে বেশি।

স্থানীয় বাসিন্দা আরাফাত বলেন, টানেল চালুর পর আনোয়ারা অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র পারকি সমুদ্র সৈকতে আগে যেখানে সরকারি ছুটির দিনে ৩/৪ হাজার করে পর্যটক আসতো সেখানে এখন বিশেষ দিনে ১০ থেকে ১৫ হাজার পর্যন্ত পর্যটক আসতে শুরু করেছে। যার ফলে সৈকত যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সৈকতের ঝাউগাছ রক্ষায় কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এ সৈকতের অবর্ণনীয় ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে সৈকতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অনেকটা পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সেই সাথে পর্যটন কমপ্লেঙ নির্মাণ কাজে নানা অনিয়ম ও কাজের কয়েক দফা মেয়াদোত্তীর্ণের পরও কখন কমপ্লেঙ চালু না করায় স্থানীয়রা হতাশ।

জানা যায়, পারকি সুমুদ্র সৈকতকে দেশের আধুনিক অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে পর্যটন কমপ্লেঙ। এ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত হচ্ছে ১৪টি আধুনিক কটেজ তারমধ্যে ৪টি ডবল ডুপ্লেঙ কটেজ ও ১০টি সিঙ্গেল কটেজ। ৪র্থ তলাবিশিষ্ট একটি মাল্টিপারপাস ভবন নির্মিত হচ্ছে এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকবে পর্যটন অফিস, দ্বিতীয় তলায় থাকবে দুইটি দোকান, একটি রেস্টুরেন্ট, তৃতীয় ও ৪র্থ তলায় থাকবে ২টি বার, একটি ২৫০ আসনের কনভেনশন হল। তৃতীয় তলাবিশিষ্ট ১টি সার্ভিস ব্লক, যেখানে শিক্ষার্থীদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থাসহ পর্যটকদের জন্য ৩৫টি সিঙ্গেল ব্যাচেলর সার্ভিস রুম, সার্ভিস স্টাফদের জন্য ৪৪টি রুম থাকবে। একটি ওয়াশ ব্লক, যেখানে নারীপুরুষদের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা থাকবে।

এছাড়া একটি লেক, একটি ঝুলন্ত ব্রিজ, দুইটি পিকনিক শেড, কুকিং শেড। একটি খেলার মাঠ, যার মধ্যে ভলিবল, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা থাকবে এবং গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধাও রাখা হয়েছে। পারকিতে বেড়াতে আসা শিক্ষার্থী রুম্পা বলেন, পারকি আমার ভালো লেগেছে। দেখতে খুব সুন্দর। কিন্তু কঙবাজারের আদলে কোন সুযোগ সুবিধা নেই। এলাকাবাসীর পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের খাস জমি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা না গেলে কখনো পারকির পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম১৩ আনোয়ারাকর্ণফুলী আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পারকি সমুদ্র সৈকতকে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধটেকনাফে ৫০ দিন জিম্মি থাকা কিশোর উদ্ধার, ৪ পাচারকারী গ্রেপ্তার