বাঁ পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ মোটা ব্যান্ডেজে বাঁধা। সেই পা এত ভারী হয়ে আছে যে, কোনোভাবেই নাড়াতে পারছেন না। মাঝে মাঝে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছেন। এর সঙ্গে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ভাবনা আরো বিমর্ষ করে তুলেছে। মিয়ানমার সীমান্তে হঠাৎ বিস্ফোরণে পা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্যথোয়াই তঞ্চঙ্গ্যা কখনো তাকাচ্ছেন পায়ের দিকে, কখনো ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন একদৃষ্টিতে।
আহত এ যুবকের কাতরানোর শব্দে হাসপাতালের সিটের পাশে বসে থাকা তার মা প্রায়ই নিরুপায় হয়ে পড়ছেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। দুশ্চিন্তা ভর করেছে তার মধ্যেও। কেননা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানের এ অবস্থায় স্বামী হারা এ নারীও বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন। খবর বিডিনিউজের।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পঞ্চম তলার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন অন্যথোয়াই। সঙ্গে আছেন তার মা ইয়াং মে তঞ্চঙ্গ্যা ও কাকা ইছামং তঞ্চঙ্গ্যা। গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় তাদের সঙ্গে। আহত ছেলের অবস্থা কোন দিকে মোড় নেবে সেই ভাবনায় অস্থির তারা।
অন্যথোয়াইকে উদ্ধার করে প্রথমে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতাল, পরে কঙবাজার সদর হাসপাতাল হয়ে রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। গত রাতে তার পায়ে অপারেশন হওয়ার কথা।
শুক্রবার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবান জেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু এলাকার জঙ্গলে চরতে থাকা গরু খুঁজতে গিয়ে বিস্ফোরণে একটি পা হারাতে বসেছেন যুবক অন্যথোয়াই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা সেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, অপারেশন করে তার বাম পা কেটে ফেলে দিতে হতে পারে। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তির এমন দশায় দিশেহারা তার পরিবার।
আগের কয়েকদিনের মতো শনিবারও ঘুমধুম সীমান্তের বিপরীতে সারা দিন ভারী গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন সীমান্তের বাসিন্দারা; এতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অন্যথোয়াইয়ের আহত হওয়ার দিন মিয়ানমার থেকে আসা গোলার বিস্ফোরণে রোহিঙ্গাদের হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানের পাশে বসে রয়েছেন ইয়াং মে। স্বামীহারা এ নারী বলেন, দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে বড় ছেলে অন্যথোয়াই দিনমজুরের কাজ করার পাশাপাশি চাষের কাজও করত। তার আয়েই আমাদের ঘর চলে। এখন তার কিছু হলে আমাদের পরিবারের কী হবে জানি না।
তুমব্রু তিন নম্বর ওয়ার্ডে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে বিস্ফোরণে আহত হন অন্যথোয়াই। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আরো তিনজন। সীমান্ত এলাকার আধা কিলোমিটারের মধ্যেই তাদের বাড়ি।
বেডে শুয়ে অন্যথোয়াই বলেন, আমরা বাড়িতে গরু লালন-পালন করি। জিরো পয়েন্টের কাছে জঙ্গলে চরতে যাওয়া গরু খুঁজতে গিয়ে একটি ছড়া পার হওয়ার সময় বাম পা দেয়ার সাথে সাথে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় পড়ে গেলে সাথে থাকা লোকজন আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
তার মা ইয়াং মে জানান, তুমব্রু তিন নম্বর ওয়র্ডে সীমান্তবর্তী এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ পাহাড়ি পরিবার বসবাস করে। সেখান থেকে আধ মাইলের মধ্যে মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্ট। লাগোয়া এলাকায় তারা চাষাবাদও করেন। সামপ্রতিক সময়ে প্রায়ই ওপার থেকে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যায়।
তবে নিজের ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে তাদের অনীহা রয়েছে উল্লেখ করে ইয়াং মে স্থানীয় ভাষায় বলেন, নিজের ঘর ছেড়ে কেউ কি অন্য কোথাও যায়? তবে মাঝেমধ্যে স্থানীয় একটি বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে তারা আশ্রয় নিতেন। এর মধ্যে কীভাবে কি হয়ে গেল বুঝতে পারছি না। তার দাবি, মাটিতে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণ হয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।
অন্যথোয়াইয়ের সঙ্গে থাকা তার কাকা ইছামং ভাইপোর চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, রাতে পায়ে অপারেশন হবে। আমাদের টাকা-পয়সাও তেমন নেই। চিকিৎসা করাতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে।
হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. চন্দন দাশ বলেন, বিস্ফোরণে আহত ছেলেটির বাম পা জখম হয়েছে। হাঁটুর নিচ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পায়ের কিছু অংশ বাদ দিতে হতে পারে।










