দফায় দফায় তারিখ পরবর্তন আর প্রকাশকদের বিভক্তি মিটিয়ে অবশেষে পর্দা উঠল বইপ্রেমী মানুষের প্রাণের মেলার; অপেক্ষা ঘুচল লেখক, প্রকাশক আর পাঠকের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা সারেন। এ বইমেলাকে আগামী বছর থেকে ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে চালু করা যায় কি না, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে তিনি আয়োজকদের অনুরোধ করেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এবারের মেলার প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে– ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্ত্রী–কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন; কিছু বইও সংগ্রহ করেন। বইমেলা ও অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ/গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞান ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধে মঈদুল হাসান এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। কবিতায় মোহন রায়হানকে পুরস্কার দেওয়ার কথা থাকলেও মঞ্চে তার নাম ঘোষণা করা হয়নি, তাকে পুরস্কারও দেওয়া হয়নি। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম পরে কবিতার পুরস্কার স্থগিত রাখার কথা বলেছেন। খবর বিডিনিউজের।
রীতি হল বইমেলা শুরু হবে ভাষার মাসের প্রথম দিন, আর সেই মেলার উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান। তবে তবে এ বছর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং রোজার কারণে ডিসেম্বরে এই মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে তা আরও দুই দফা পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
এবারের আয়োজন : এবারও বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে বইমেলার আয়োজন হয়েছে। মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল থাকছে। মোট ইউনিট থাকছে ১,০১৮টি। গত বছর মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১,০৮৪টি। সে হিসাবে এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে।
মেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বর করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায়। সেখানে ৮৭টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশুচত্বরে মোট প্রতিষ্ঠান ৬৩টি এবং ইউনিট ১০৭টি।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য–সচিব সেলিম রেজা বলেন, এবার বইমেলার বিন্যাস গতবারের মত অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর রোজার মাস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ানী উদ্যান অংশে মেলায় আসা মুসল্লিদের জন্য সুরা তারাবি নামাজের ব্যবস্থা থাকবে।
এবার মেলা চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। আর ছুটির দিন বইমেলা বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়ে চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বইমেলার মূল মঞ্চে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকাল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বরাবরের মত এবারে প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে। অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকছে।
মেলার মাঠে খাবারের স্টলগুলো এবারও থাকছে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে। বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রয় করবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বইমেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। নিরাপত্তার জন্য মেলায় ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বইমেলা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।
বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এছাড়া ২০২৫ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ–বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে। স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এবারের বইমেলায় প্রবর্তন হচ্ছে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’ শিরোনামে একটি নতুন পুরস্কার।
মেলায় নতুন অংশগ্রহণকারী (যে সব প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকাশক হিসেবে এবারই প্রথম/২০২৪ বা ২০২৫ সালে মেলায় প্রথম অংশগ্রহণ করছে) তাদের মধ্য থেকে ‘গুণগতমান বিচার’–এ সর্বাধিক সংখ্যক বইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’ (১ম, ২য়, ৩য়) প্রদান করা হবে। অমর একুশে বইমেলা ২০২৬–এর ব্যবস্থাপনা সহযোগী হিসেবে রয়েছে বর্তমান বাংলা লিমিটেড।
বক্তব্যে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী : অমর একুশে বইমেলা আগামী বছর থেকে আন্তর্জাতিকভাবে করা যায় কিনা, তা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা সগৌরবে প্রতিবছর একুশ পালন করে থাকি। দিবসটি এখন শুধু আর বাংলাদেশের নয়, অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বেই পালিত হচ্ছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই স্থানটি, অর্থাৎ এই বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ অমর একুশে বইমেলা। তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে অমর একুশে বইমেলা অমর আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে, কিনা সেটি আমি আপনাদের সকলকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাব।
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, আন্তর্জাতিক হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা ও সংস্কৃতি শেখা–জানা এবং বোঝার দিকে নাগরিকদের আগ্রহ বাড়বে। বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে এই সময় মাতৃভাষা ছাড়াও আরো একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার মনে হয় বিকল্প নেই আমাদের সামনে। এজন্য আমাদেরকে জ্ঞানে বিজ্ঞানে প্রযুক্তিতে মেধায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একই সঙ্গে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের মনে হয় কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়ে বলেন, অমর একুশে বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং সারা বছর দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় আয়োজন করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে প্রকাশকরা উদ্যোগী হয়ে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি। সরকারের পক্ষ থেকে যদি সহযোগিতার কোনো অবকাশ থাকে, অবশ্যই বর্তমান সরকার সেখানে এগিয়ে আসবে। একই সঙ্গে এ ব্যাপারে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আপনাদের নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার হয়, তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতন নয়। আমাদের বইমেলা আমাদের মাতৃভাষার অধিকার আদায় ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। প্রতিবছর মেলার আকার–আয়তন বাড়লেও সেই হারে মনে হয় গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হচ্ছে কিনা কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কিনা, এই বিষয়গুলো নিয়ে বর্তমানে মনে হয় চিন্তাভাবনা করার অবকাশ আছে।
তারেক রহমান বলেন, এক দার্শনিক বলেছিলেন, বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতন। বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা বলছেন, বই শুধু বিদ্যা, শিক্ষা কিংবা অবসরের সঙ্গী নয়, বরং বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়াম। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে মনে হয় প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে খুব সম্ভবত বই বিমুখ করে তুলছে ধীরে ধীরে।












