নৈতিকতার ইতিবাচক চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ১৯ মে, ২০২৬ at ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘদিন ধরে চলা অরক্ষিত সমাজ ব্যবস্থার যে সার্বিক মনমানসিকতা, চিন্তাচেতনা, ধ্যানধারণা, হিংসাবিদ্বেষ, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সার্বিক চিত্র দেখলেই অনুধাবন করা যায়। অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং চিন্তার বন্ধ্যাত্ব প্রতিটি মানুষকে নিঃস্ব অসহায় এবং দুর্বল করে ফেলেছে। সারা দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ নানা পদক্ষেপ নিলেও তা পর্যাপ্ত না। সরকারি হিসেবে ইতিমধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৫০ এর অধিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সে হিসেবে হামে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা অজানাই থেকে যাচ্ছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে এবং আইসিউ খুঁজতে খুঁজতে শিশুর প্রাণপাখি উড়ে যাচ্ছে। একদিকে শিশুরা ছটফট করছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। অপরদিকে হামের নমুনা পরীক্ষায় দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষমাণ আপনজনরা। তাই যে বা যাদের কারণে হামের টিকা দেওয়া বন্ধ হয়েছিল তাদের ঠাণ্ডা মাথায় শত শত শিশুর হত্যার দায়ে বিচার হওয়া প্রয়োজন বলে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন। হামের বর্তমান যে পরিস্থিতি তা মহামারিকে হার মানিয়ে দিয়েছে। কোভিড মোকাবিলায় আমরা দক্ষতা দেখাতে পারলেও হামের বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙছে বলে মনে হয় না। এখন এ বিষয়টিকে অগ্রধিকার দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের জরুরি বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

এক সময় ছিল তখন মানুষ ভয় পেত অন্ধকারকে, ভূতপ্রেত কিংবা হিংস্র প্রাণীকে। মানুষের ভরসার স্থান ছিল মানুষ। অন্ধকার কিংবা নির্জন পথে চলার সময় সাথে আরেক মানুষকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিত। কারও উপস্থিতি বা কোন কিছুর নড়াচড়া বুঝতে পারলেই মনে সাহস জাগত। জন্ম নিত নিরাপত্তাবোধ। বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার চরম শিখরে আজ মানবতা অথচ নির্মম পরিহাস আজ সেই মানুষই আজ মানুষের বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহমর্মিতা, মমত্ববোধ, ভালোবাসা ও মানবিকতা কমে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ঘৃণা, প্রতিশোধ আর অসহিষ্ণুতা। ছোটখাটো বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা সামাজিক মতপার্থক্য এখন অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ নির্মমতায় রূপ নিচ্ছে। শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, গণপিটুনি, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণার চর্চা, সব মিলিয়ে সমাজে এক ধরনের অস্থির ও ভয়ংকর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সংবাদ একের পর এক প্রকাশিত হচ্ছে তা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধই নয়, সামাজিক মনস্তত্ত্বের গভীর অসুস্থতা ও নৈতিকতার চরম বিপর্যয়ে লক্ষণ।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ সংঘটনে ও সহিংসতা বিস্তারে ব্যক্তির চেয়ে সমাজ অধিক দায়ী। যে সমাজে আগ্রাসনকে উৎসাহিত করা হয়, বা যে সমাজ রাষ্ট্রের রীতিনীতি আইন প্রতিষ্ঠান অপরাধ সংগঠনে সহায়ক। সেখানে এ ধরনের অনৈতিক প্রবণতা বেশি। এছাড়াও গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হত্যার মতো সহিংস অপরাধের সঙ্গে ব্যক্তির সংঘাতপূর্ণ শৈশব, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ইতিহাস, মাদকাসক্তি, তাড়না নিয়ন্ত্রণ করার অক্ষমতা ব্যক্তিত্বের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য, পিতামাতার অপরাধ প্রবণতা প্রভৃতির সম্পর্ক রয়েছে।

প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই অসচেতনে আত্মধ্বংসী মৃত্যু প্রবৃত্তি রয়েছে। এ প্রবৃত্তির অনিয়ন্ত্রিত আধিপত্যই মানুষের মানবিক আগ্রাসী আচরণের জন্য দায়ী। মানুষ অনুকরণপ্রিয়। সমাজে অন্যদের দেখে আচার আচরণ শেখে এবং তা পুনরাবৃত্তির চেষ্টা করে। বাবা মা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, প্রতিবেশী, সমাজের খ্যাত বা পরিচিত বক্তি, রোল মডেল, গল্প উপন্যাস, নাটক, সিনেমার চরিত্র থেকে ও দেখে মানুষ শেখে এবং পছন্দ ও প্রণোদনা অনুযায়ী তা আত্মস্থ করে থাকে।

বর্তমান সময়ে আমাদের চারপাশের মানুষ। প্রিয় টিভি শো, সিনেমা, কম্পিউটার গেমের নায়ক চরিত্র যতটা অপরাধ প্রবণ হবে, আমাদের অপরাধ প্রবণতার ঝুঁকিও তত বাড়বে। মানুষ যত অপরাধী, খুনীকে পুরস্কৃত হতে, বাহবা পেতে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ও পূজনীয় হতে দেখবে ততই এসব অপরাধে প্রবৃত্ত হতে উদ্বুদ্ধ হবে এবং সমাজে অপরাধ বাড়তেই থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, মূল্যবোধের সংকট মাদকের বিস্তার, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং অনলাইন উস্কানিমূলক কনটেন্টের প্রভাব মানুষকে ক্রমেই সহিংস করে তুলছে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও অপরাধ প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় ভয়হীন হয়ে উঠছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিত্যদিনের এসব নৃশংস ঘটনায় মানুষের একাংশের মধ্যে এক ধরণের নিস্পৃহতা ও অসাড়তা তৈরি হচ্ছে। ভয়াবহ কোনো হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের সংবাদ এখন অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এটি সমাজের জন্য অত্যান্ত বিপজ্জনক সংকেত।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই হিংস্রতা ও নৃশংসতায় বিস্তার ঠেকানোর জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও সমাজ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি জোরদার না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ আজ এক জটিল ও পরিবর্তনশীল সময় অতিক্রম করছে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সংযোগের বিস্তার ঘটছে। অন্যদিকে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিভাজন, দুর্নীতি, সহিংসতা, মাদকাসক্তি, সাইবার অপরাধ, অসহিষ্ণুতা এবং মূল্যবোধ সংকট ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এ দ্বৈত বাস্তবতায় আজ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কি একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে পারে? ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি শুধু অর্থ বা প্রযুক্তি নয়; বরং নৈতিকতা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক আস্থার ওপরই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।

নৈতিক শিক্ষা মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধ গড়ে উঠে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুশাসন বা আচরণগত নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণমুখী চেতনা বিকাশের একটি সামগ্রিক শিক্ষাপদ্ধতি। মানুষের হৃদয় ও নৈতিক চেতনাকে শিক্ষিত না করে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। আজ আমাদের সমাজে উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে সামজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকটও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা নৈতিক শিক্ষাকে সামাজিক সংহতির মূলভিত্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, সমাজ তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন নাগরিকদের মধ্যে একটি সাধারণ নৈতিক চেতনা বিদ্যমান থাকে। নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে গেলে সমাজে বিশৃঙ্খলা, স্বার্থপরতা ও অরাজকতা বৃদ্ধি পায়।

নৈতিক শিক্ষা শুধু বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়; পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার হলো শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশুরা পরিবার থেকেই সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, ও দায়িত্ববোধের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক সম্পর্কের দুর্বলতা, অতিরিক্ত ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের মানবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। একইসাথে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং লেখক গবেষকরা সমাজের মূল্যবাধ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি সমাজে অসততা ও দুর্নীতিকে সফলতার প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করা হয় তবে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। তাই সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতার ইতিবাচক চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে নৈতিক শিক্ষা কার্যকর করার জন্য শিক্ষাক্রমকে বাস্তবভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু বইভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সামাজিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, কমিউনিটি সার্ভিস এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের নৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়াতে হবে। শিক্ষক নিজেই শিক্ষার্থীদের জন্য জীবন্ত উদাহরণ। পরিবার ভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নাগরিকত্ব শিক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন, শিক্ষার্থীদেরকে পাঠ্যভ্যাস এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আজকে আমাদের সমাজে শুধু উচ্চ শিক্ষিত দক্ষ মানুষ নয় প্রয়োজন নৈতিক মানুষের। নৈতিকতা ছাড়া উন্নয়ন শুধু বাহ্যিক অগ্রগতি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একটি আদর্শ জাতি নির্মাণ করতে পারে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজিএম জহির উদ্দীনের ‘এক মুঠো প্রেম’
পরবর্তী নিবন্ধছড়াবিষয়ক কর্মশালা ও চিরনতুন ছড়ার চর্চা