‘বহুকাল বাদে তুমি এইসব ভাবো।/ একদিন ছিল/ চোখে গ্লিসারিন দিয়ে ভালো করে কাঁদতে পারতে না,/ আজ অন্ধকার ঘরে খুব একা একা/ চোখ থেকে নেমে আসে অনায়াস নদী’। অতীতের কথা ভেবে কে কাঁদছে? কার চোখে জল? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে কবি ময়ুখ চৌধুরীর ‘অন্দ্রিার কারুকাজ’-এ। প্রকাশনা সংস্থা ‘চন্দ্রবিন্দু’ থেকে এবার বেরিয়েছে কাব্যগ্রন্থটি। গ্রন্থে ‘তুমি শিল্প, তুমি অনিদ্রার কারুকাজ’ শিরোনামে একটি কবিতা আছে। সেখানেই কবি উচ্চারণ করেছেন, ‘বহুকাল বাদে…অনায়াস নদী’।
গতকাল এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে বইমেলায় ময়ুখ চৌধুরী সঙ্গে কথা হয়। জানালেন কার জন্য লিখেছেন ‘তুমি শিল্প, তুমি অনিদ্রার কারুকাজ’।
বললেন, ১৯৭৮ সালে কবিতাটি লিখেছি। আমাদের রূপালী পর্দার যে জগৎ সেখানে অনেক নায়িকা এসেছে, আবার চলেও গেছে। তাদের নিয়ে অনেকে সারা রাত ভাবে। অথচ এসব নায়িকার কেউ কেউ ভক্ত-দর্শকদের পাত্তাও দেয় না। কিন্তু একদিন ভক্তহীনভাবে ওই নায়িকা একা ঘরে পড়ে থাকে। তখন তার বাজার আর নেই। বাজার হারিয়ে ফেলা সেই নায়িকাকে নিয়ে চিন্তা করেছি। আজকে তুমি ওদের কথা মনে করে দেখ, যাদের তুমি একদিন অবহেলা করেছিলে। তুমি শিল্প, তুমি অনিদ্রার কারুকাজ। একদিন চোখে গ্লিসারিন দিয়ে তুমি কাঁদতে পারতে না। আজকে অনায়াসে তোমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। সে হারানো দিনের কথা ভেবে, ওই নায়িকার বেদনা নিয়ে আমি লিখেছিলাম ‘তুমি শিল্প, তুমি অনিদ্রার কারুকাজ’।
তিনি বলেন, কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়নি। থিমেটিক চেইন ও কবিতার মেজাজ অনুযায়ী বিন্যাস করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি কবিতায় আলাদা স্বতন্ত্র সত্তা। কিন্তু একটা কানেকটিভিটি থাকে। যেমন একটা কবিতা ১০-২০ লাইন জোড়া দিলে একটা শিরোনাম হয়। শিরোনামগুলো জোড়া দিলে বইয়ের নাম হয়। তাহলে ওই বইয়ের নামকরণটা একটি থিমেটিক চেইনের কাজ করে। মানে থিমেটিক চেইন যেটা থাকে সেটাকে রিপ্রেজেন্ট করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এ অধ্যাপক বলেন, আমাকে কোন কোন জিনিস ঘুমাতে দিচ্ছে না সেগুলো এ বইয়ের মধ্যে আছে। আমি কেন রাত্রি জাগরণ করি। এক শারীরিক, দুই মানসিক কারণে। তখন আমার মনের মধ্যে কি কি চিন্তা আসে। সেগুলো এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোথাও আমি শিল্পের বাইরে যাইনি। বিষয়বস্তু যতই পরিবর্তন হোক শিল্পের শর্তটাকে আমি কখনো বিসর্জন দিইনি। কারণ আমি মনে করি কবিতা শেষ বিচারে একটা শিল্পকলা। নতুবা আমি এটা নিয়ে কেন কথা বলব। এটার মধ্যে এই চেতনা, ওই চেতনা আছে, বিজ্ঞান আছে, দর্শন আছে, অর্থনীতি আছে, রাজনীতি, ধর্ম সবই আছে। কিন্তু মূল লক্ষ্যটা কী? মূল লক্ষ্য হচ্ছে কবিতা তার নিজস্ব রাজধানীতে গিয়ে উপনীত হবে। সেখানে থাকবে শুধু কবি এবং কবিতা। যদি শিল্প না হয় তাহলে সেটা নিয়ে আলোচনা করার দরকারও পড়ে না।
ব্যক্তিগত জীবনে নিদ্রাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে কবি বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকে বাস্তবেই আমি ‘ইনসমনিয়া’য় ভুগছি। আমি নিদ্রহীনতায় ভুগছি। প্রতি রাতে ঘুমের ওষুধ খাচ্ছি। গত রাতেও দুইটা খেয়েছি। আমার ঘুম এখন বালিশে থাকে না। ওষুধের দোকানে থাকে। রাত দুইটা-তিনটা অব্দি জেগে থাকি। মাঝরাতে উঠে সিগারেট খাই। আমি ঘুমের কষ্টের মধ্যে আছি। কিন্তু সেটা এখন আমি উপভোগ করছি। আমার শরীরে সয়ে গেছে।
‘সবচেয়ে বেশি লিখে কম ছাপানো লেখকদের একজন ময়ুখ চৌধুরী। এ পর্যন্ত তার ১১টা কবিতার বই এবং একটা গদ্যের বই বেরিয়েছে। ‘এর মধ্যে কোনটাকে বেশি মূল্যায়ন করবেন?’ এমন প্রশ্নে বলেন, এটা বলতে পারব না। আমার কোন ছেলেটাকে খারাপ এবং কোন ছেলেকে ভালো বলব? যদি বোদ্ধা পাঠক, সমালোচকরা আমাকে তাদের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ ঘোষণা করতে চায় তাহলে দ্বিতীয় বই (১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘অর্ধেক রয়েছি জলে, অর্ধেক জালে) থেকে দাবি করব। ওখান থেকেই আমার উত্তরণ বলে আমি মনে করি। এরপর ‘প্যারিসের নীলরুটি (২০০১) এবং ‘আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে’ (২০০২)। এবার বাতিঘর যেটা বের করল (‘পঞ্চবটী বনে’) সেখানে আমার শ্রেষ্ঠ তিনটা কবিতা আছে, যে কবিতায় আমার নিজের সন্তুষ্টি আছে। আমার দীর্ঘতম কবিতার দুইটা আছে ‘পঞ্চবটী বনে’।
লেখালেখির জায়গায় আত্মতৃপ্ত কিনা জানতে চাইলে বলেন, কোনো শিল্পীই তৃপ্ত না। যদি তৃপ্ত হয়ে যায় তাহলে তার লেখা সেখানেই শেষ। সবসময় অতৃপ্তি থাকতে হয়। মানুষ কি একবার পানি খেয়ে বলে আর কখনো খাব না?
ভবিষ্যৎ প্রকাশনা প্রসঙ্গে বলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ে থিসিস করেছি। ওই গবেষণা অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল রবীন্দ্রনাথের পোয়েটিক ওরিয়েন্টেশন। ওটা পরিমার্জিত করে প্রকাশ করব। একটা উপন্যাস বের করব, ‘খসড়া সম্পর্ক’। এটা ২০১৪ সালে ইত্তেফাকে বের হয়েছিল। কবিতায় প্রকাশ করতে পারছিলাম না বলে অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে। আরেকটা গল্পের বই বের করবো ‘মাকড়সার ডিম’। মাকড়সার বাচ্চা মাকে যেরকম খেয়ে ফেলে, ওই চিন্তাও আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ফেলে।
তিনি বলেন, ভারত সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৭৮ সালের ২০ নভেম্বর কলকাতায় যাই। ভারত সরকার আমাকে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছিল। তবে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলাম। ওখানে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করেছি। তিনি বলেন, আপনারা যে পেছনে হাতমোড়া, কালো আলখেল্লা পরা একজন রবীন্দ্রনাথ দেখতে পান, সেটা তো রেডিমেড রবীন্দ্রনাথ। গার্মেন্টসে তৈরি। আসল রবীন্দ্রনাথ যখন হয়ে উঠছিলেন তখন ৮৮ জন প্রধান কবি। ওই রবীন্দ্রনাথ কি কবিতা লিখেছিলেন, কি অসুবিধা বোধ করেছিলেন, কোথায় প্রতিবন্ধকতা ছিল সবকিছু তুলে এনেছি। আমি নাম দিয়েছি ‘ডার্ক পিরিয়ড অব ঠাগুর’। ওই পিরিয়ড নিয়ে কেউ কোনো গবেষণা করেনি। আমি বাংলাদেশ থেকে করিয়ে দেখিয়ে দিয়ে আসলাম।
প্রসঙ্গত, তার আসল নাম অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল আজিম। তবে সাহিত্য চর্চা করেন ময়ুখ চৌধুরী নামে।












