নারীর জীবন সংগ্রামের গল্প যত দীর্ঘ, ততই বিস্ময়কর তার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। সময়ের স্রোত বয়ে যায়, যুগ পাল্টায়, সমাজ বদলায়, শিক্ষা–সভ্যতা বিস্তৃত হয়–কিন্তু এক বেদনাদায়ক সত্য আজও একই থাকে। নারীর পথ রোধ করে অনেক সময় পুরুষ নয়, সমাজ নয়, বরং নারীই। নারী নারীর প্রতি হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, সন্দেহ, অবিশ্বাস, অকারণ প্রতিযোগিতা আর জায়গা না ছাড়ার ক্ষুদ্র মানসিকতা আজও নারীর অগ্রযাত্রাকে নীরবে ও গভীরভাবে আটকে দেয়। সত্য কথা হতে পারে কষ্টদায়ক, কিন্তু মুখোমুখি না হলে পরিবর্তন কখনোই সম্ভব নয়।
সৃষ্টিকর্তা কোনো মানুষকে অসম্পূর্ণ করে তৈরি করেননি। প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য, আলাদা প্রতিভা, আলাদা আলো। কিন্তু আমরা নারীরা অনেক সময় দেখতে পাই কেবলই তুলনা–কে বেশি সুন্দর, কে বেশি পছন্দনীয়, কে কার চেয়ে এগিয়ে, কার পোশাক ভালো, কার স্বভাব মিষ্টি। এই সুন্দর–অসুন্দরের অদৃশ্য যুদ্ধই একসময় পরিণত হয় হিংসায়। নতুন একজন নারী যখন কর্মক্ষেত্রে আসে, যখন দলে যোগ দেয়, যখন একটু আলো পায়–অনেক নারী মনে মনে ভাবে, “সে এসে আমার জায়গা নেবে না তো?” অথচ জায়গা কাউকে ঠেলে ফেলে কেড়ে নিতে হয় না; নিজের যোগ্যতাই নিজের জায়গা তৈরি করে দেয়। কিন্তু এই সহজ সত্যটিই আমরা অনেক সময় মেনে নিতে পারি না।
ফলে জন্ম নেয় সংকীর্ণতা। সামনে হাসিমুখে কথা বলা, আর পেছনে পিঠে ছুরি–এ যেন আজকের সমাজে নারীর সবচেয়ে পুরনো ও প্রচলিত অস্ত্র। চরিত্র খাটো করা, সাফল্যকে ভাগ্য বলে উড়িয়ে দেওয়া, সামান্য ভুলের ওপর বড় করে আঙুল তোলা, অন্যকে ছোট দেখিয়ে নিজের উচ্চতা প্রমাণ করার চেষ্টা–এসব আঘাত অনেক সময় পুরুষ নয়, নারীর থেকেই আসে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এই আঘাতগুলো দৃশ্যমান নয়; এগুলো নীরব, আড়ালনির্ভর ও সম্পর্কভাঙা আচরণ।
নারী নারীকে কেন এত ভয় পায়? কারণ সমাজ আমাদের এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে এক নারী অন্য নারীর সাফল্যকে নিজের হারের কারণ ভাবে। আমরা ছোটবেলা থেকে শিখেছি–নারী মানেই তুলনা, নারী মানেই প্রতিযোগিতা, নারী মানেই সন্দেহ। অথচ সত্য হলো, অন্য নারীর সাফল্য কখনোই আমার সাফল্য কমিয়ে দেয় না; বরং তার সাফল্য আমাকে শেখায়–আমি চাইলে পারব, যদি নিজের ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখি।
নারী যে দশভূজা–এ কথা শুধু দেবীরূপে সত্য নয়, জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই নারী অবিশ্বাস্য শক্তির অধিকারী। সে সংসার সামলায়, সন্তান লালন করে, পরিবারকে রক্ষা করে, সমাজে অবদান রাখে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিভা দেখায়। কিন্তু যখন নারী নারীর প্রতি হিংসুক হয়, তখন সেই দশভূজার শক্তিই হারিয়ে যায়। এক আঙুল কেটে গেলে যেমন মুঠো শক্ত হয় না, তেমনি এক নারী অন্য নারীকে নিচু করলে নারীর সম্মিলিত শক্তি ভেঙে পড়ে।
অথচ পথটি খুব কঠিন নয়। পরিবর্তন শুরু হতে পারে আমাদের নিজেদের ভেতর থেকেই। আরেকজন নারী এগিয়ে গেলে তাকে ঠেলে না দিয়ে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত বোনত্ব। অন্যের সাফল্য দেখলে মনে মনে বলতে শেখা-“ভালোই হলো, তার আলোয় আমরাও উজ্জ্বল হবো।” কেউ ভুল করলে তাকে অপমান নয়, শেখানোই মানবতা। নতুন কেউ এলে তাকে শত্রু নয়, সহযাত্রী ভাবা–এটাই উন্নত সভ্যতার পরিচয়। এক নারী যদি আরেক নারীর হাত ধরে এগোয়, তবে সমাজের কোনো শক্তিই তাকে থামাতে পারে না। নারী যদি নারীকে সম্মান দেয়, জায়গা দেয়, উৎসাহ দেয়–তাহলে নারীর অগ্রযাত্রা আর থেমে থাকে না। কিন্তু নারী যদি নারীকে প্রতিনিয়ত সন্দেহ আর হিংসার চোখে দেখে, তবে সেই শৃঙ্খল কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে ভাঙতে পারবে না; ভাঙতে হবে নারীকে নারী হয়েই।
সত্যিটা যতই কঠিন হোক, উচ্চারণ করতেই হবে–নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু পুরুষ নয়, সমাজ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজেই। আর এই শত্রুতা ভেঙে ফেলা ছাড়া প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। প্রতিটি নারী যদি অন্য নারীর পাশে দাঁড়ায়, তবে আমরা কেবল এগোবোই না, বদলে দেবো প্রজন্মের মানসিকতা। পরশ্রীকাতরতা নয়, সহানুভূতি; ঈর্ষা নয়, উৎসাহ; সন্দেহ নয়, বিশ্বাস–এই তিনটিই পারে নারীর ভেতরের নারীকেই বদলে দিতে।
নারীর অগ্রযাত্রা থেমে থাকে না কোনো বাহ্যিক বাধায়; থেমে থাকে যখন নারীই নারীর পথে দেয় অদৃশ্য দেয়াল। সেই দেয়াল ভাঙা এখনই জরুরি। কারণ–নারী যখন নারীকে শক্তি দেয়, তখন এক নারী নয়, পুরো সমাজ উঠে দাঁড়ায়। এবং তখনই সত্যি সত্যি প্রমাণিত হয়–নারী চাইলে সব পারে।
লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কবি।












