নন্দিত পথিক – পরাণ রহমান

সৈয়দ মামনূর রশীদ | বৃহস্পতিবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

ঘাসফুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত পরাণ রহমান কখনো নিজেকে আলোয় দাঁড়াতে চাননি। অথচ তাঁর জীবনের আলো ছড়িয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবনে। খ্যাতি, প্রতিপত্তি বা সামাজিক মর্যাদার জন্য নয়শুধু মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে তিনি গড়ে তুলেছিলেন উন্নয়ন সংস্থা ‘ঘাসফুল’। তাঁর জীবন ছিল এক নীরব পদযাত্রা, যেখানে লক্ষ্য ছিল নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষ এবং দলিত শিশুদের কল্যাণ।

পরাণ রহমান কখনো খ্যাতির পেছনে ছুটে যাননি। তিনি ঘাসফুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেননিজের নাম উজ্জ্বল করার জন্য নয়, বরং সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর জন্য। তাঁর জীবন ছিল প্রচারের বাইরে থাকা এক নিভৃত সাধনা।

তিনি ঘর ছেড়ে বাইরে এসেছিলেন একটিমাত্র বিশ্বাস নিয়েমানুষের কষ্টকে দূর থেকে দেখা যায় না, কষ্টের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজের দলিত নারী ও শিশুকে ফুলের মতো বিকশিত হতে সাহায্য করাএই বিশ্বাস থেকেই তাঁর সংস্থার নাম রাখা হয় ‘ঘাসফুল’যা পায়ের নিচেও বেঁচে থাকে, অথচ সৌন্দর্য ছড়ায়।

কুমিল্লার বিখ্যাত সুফি পরিবারে জন্ম নেওয়া পরাণ রহমান শৈশব থেকেই মানুষ ও সমাজকে গভীরভাবে অনুভব করতেন। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে, তিনি রিলিফ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঘাসফুলের কর্মযাত্রা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠান কখনোই মুখ্য ছিল না; মুখ্য ছিল মানুষ। পরাণ রহমানের মানবিক পথচলা শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সত্তরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় জনপদের ধ্বংসস্তূপ দেখে তিনি চুপচাপ থাকতে পারেননি। বড়কন্যা পারভীন মাহমুদ ও সহপাঠীদের সঙ্গে তিনি গঠন করেছিলেন একটি স্বেচ্ছাসেবী দল, যা পরিচালনা করেছিল ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম। তখনই তাঁর মনে জন্ম নিল দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই উন্নয়নের উপলব্ধি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরাণ রহমান একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে গ্রামেগ্রামে ঘুরে যুবকদের যুদ্ধে পাঠানোর দায়িত্ব নেন। যুদ্ধশেষে নারীদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের দারিদ্র্য দেখে তিনি বীজরোপণ করেন একটি উন্নয়ন সংস্থা গড়ে তোলার, যা কেবল পুনর্বাসন নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গে জীবন দেওয়ার সুযোগ দেবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বহু কাজ করেন।

১৯৭২ সালে তিনি শুরু করেন ‘ঘাসফুল’, যেটি নামের মধ্যেই বহন করে সংগ্রাম, লড়াই ও আশাবাদের বার্তা। প্রাথমিকভাবে রিলিফ ওয়ার্ক থেকে শুরু করে ঘাসফুলের কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়পরিবার পরিকল্পনা, নারীর স্বাস্থ্যসেবা, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসা, বীরাঙ্গনা পুনর্বাসন, পরিবেশ ও কৃষি উন্নয়ন, শিশু সুরক্ষা, নারী ও যুব উন্নয়ন, প্রবীণ কল্যাণ, কমিউনিটি উন্নয়ন, আইন সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, এবং জলবায়ু অভিযোজন। পরাণ রহমান বিশ্বাস করতেনউন্নয়ন আসবে সমাজের নিচুতলা থেকে, তাদের অংশগ্রহণে তৈরি পরিকল্পনার মাধ্যমে। সেই দর্শনেই ঘাসফুল গড়ে উঠেছিল অংশগ্রহণমূলক ও বহুমুখি উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে। আজ ঘাসফুল দেশের আটটি জেলায় বিস্তৃত। একজন মানুষের মানবিক স্বপ্ন আজ পরিণত হয়েছে একটি চলমান আন্দোলনে, যা মানুষের অন্তরে সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয়মানবিক, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন নিয়ে।

পরাণ রহমান সম্পর্ক গড়তে জানতেন, ভাঙতে নয়। সমাজে তিনি যে শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, সেই শ্রেণির আত্মীয়তা ও সামাজিকতার বন্ধন যেমন করে যত্নসহকারে আগলে রাখতেন, ঠিক তেমনি সমান মমতায় ধরে রাখতেন সমাজের তৃণমূল মানুষের হাত। তিনি শিশুকে যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন, তেমনি প্রবীণকেও সমান চোখে দেখতেন। সমাজের, পরিবারের প্রত্যেক মানুষই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর কাছে এসব সম্পর্ক ছিল এক অমূল্য সম্পদআত্মার বন্ধন।

পরাণ রহমান সমন্বিত উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর উন্নয়ন দর্শনের বিস্তৃতি ছিল গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে প্রবীণ মানুষের শেষযাত্রা পর্যন্ত। তাঁর মূলমন্ত্র ছিলমানবজীবনের কোনো স্তর যেন সংস্থার সেবা থেকে বাদ না পড়ে। তিনি সংখ্যাগত সাফল্যের চেয়ে গুণগত পরিবর্তনকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। তাঁর ভাষায়, ‘উন্নয়ন মানে কেবল সংখ্যা বাড়ানো নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের মান উন্নত করা।’

সম্ভবত সে কারণেই পরাণ রহমান তাঁর বিশাল কর্মীবাহিনীর প্রতিটি মানুষের খোঁজ রাখতেন। শুধু চাকরি নয়কর্মীদের পারিবারিক জীবন, সামাজিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাও তাঁর ভাবনার অংশ ছিল। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তাই করতেন; কথার সঙ্গে কাজের কোনো দ্বৈততা ছিল না।

পরাণ রহমানের মানবিকতা ছিল প্রজন্ম পেরিয়ে বয়ে চলা এক স্নেহনদী। যাকে একবার তিনি সহায়তার হাতে আগলে নেন, তাকে কখনো একা হতে দেননি। কুমিল্লার ফজুতুন্নেসা, তাঁর মেয়ে রমুজা বেগম ও নাতিনাতনিদের জীবন ঘাসফুলে নিরাপত্তা ও মর্যাদায় গড়ে ওঠে। একইভাবে পটিয়ার অনিল দে’র পরিবার তাঁর সন্তান ও নাতিপুত্রসহ তিন প্রজন্মের বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও স্থিতি নিশ্চিত হয় পরাণ রহমানের ছায়ায়।

পরাণ রহমান আজীবন বেবিট্যাক্সিতে চলাফেরা করেছেন। সাধারণ বেবিট্যাক্সিতে চললেও তাঁর সম্পর্কগুলো ছিল অসাধারণপ্রাইভেট বেবিট্যাক্সি চালক ইসমাইল, আবদুল আউয়াল, শাহ আলম, নুরুমিয়াসহ অনেকের জীবন তিনি সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন। নিপীড়িত নারী সুফিয়াকে উদ্ধার করে সম্মানজনক জীবনের পথ করে দেওয়া কিংবা ‘সুফিয়া জুনিয়র’কে কন্যার মতো মানুষ করাও তাঁর মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এমন অসংখ্য মানুষের জীবনে গড়ে উঠেছে তাঁর নীরব মানবিক উত্তরাধিকার। এটি কোনো প্রদর্শনী নয়এ একজন মানুষের গভীর মানববোধের সাক্ষ্য। আজও পরাণ রহমান বহু মানুষের জীবনে বেঁচে আছেননীরবে, স্থিরভাবে, নিরাপত্তা ও আলোকছায়া হয়ে। পরাণ রহমান ছিলেন মানুষের জন্য মানুষের মতো করে বেঁচে থাকা এক বিরল জীবন, এক অনন্য মানবতার দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর স্নেহসবকিছুই আজ আমাদের জন্য এক অম্লান আলোকধারা। আজও তিনি বেঁচে আছেন ঘাসফুলের প্রতিটি কর্মীর ভেতরে, প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি নারীর আত্মমর্যাদায়।

উন্নয়ন সেক্টরে পরাণ রহমান ছিলেন কিংবদন্তি ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। নব্বইয়ের দশকের একেবারে শুরুর দিকে, যখন এসব বিষয় নিয়ে ভাবনাই ছিল সীমিত, তখন তিনি পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর এই উদ্যোগ ছিল সময়ের চেয়ে বহু এগিয়ে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে উপকূলীয় জেলেদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পারিবারিক উন্নয়নের পাশাপাশি জেলে পরিবারের নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। তৃণমূলের শিশুদের শিক্ষা, হরিজন জনগোষ্ঠীর অধিকার, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেও তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।

নারী উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান, বিশেষ করে নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ ও স্বনির্ভরতা প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে পরাণ রহমান বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত হন। তাঁর হাতে গড়া উদ্যোগগুলোই আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন দর্শন, মানবিকতা ও প্রগতিশীল চিন্তায় তিনি আজও এক অনুকরণীয় নাম।

তিনি আজও বেঁচে আছেনমানুষের মায়ামমতায়, ভালোবাসায় যে নন্দিত পথ তিনি রচনা করেছিলেন, সেই পথের নন্দিত পথিক হয়ে মৃত্যুর পরও চলছেন মানুষের অন্তরে, অন্তরের গভীরে।

পরাণ রহমানের এই জীবন ও মানবিকতা আমাদের শিখিয়েছেসত্যিকারের উন্নয়ন কেবল প্রকল্প বা পরিসংখ্যান নয়, মানুষের জীবনে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ তৈরি করা। এই নীরব, অথচ শক্তিশালী পদচারণা আজও আমাদের পথ প্রদর্শন করে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও লেখক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএসো দেবী স্বর্ণময়ী
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ড্রাইভিং ফোর্সে