এস আলম সুগার মিলের গুদামে রক্ষিত চিনির আশি শতাংশই ভালো রয়েছে। আগুনে উপরের দিকে ১০ থেকে ২০ শতাংশ নষ্ট হলেও নিচের দিকের চিনিগুলো পরিশোধনের পর বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক বলেছেন, বিজ্ঞানাগারে পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ‘মান’ পরীক্ষার পরই কেবল এসব চিনির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। অপরদিকে জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান নিজে উপস্থিত থেকে সুুগার মিল থেকে কর্ণফুলী নদীতে পোড়া চিনির বর্জ্য ফেলার দুইটি ড্রেন বন্ধ করে দিয়েছেন। পোড়া চিনির বর্জ্যগুলো গর্তে রেখে পরে ডাম্পিং করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গতকালও নদীতে মাছ মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, গত সোমবার বিকেলে এস আলম সুগার মিলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মিলটির ৪টি গুদামের মাঝে একটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১ নম্বর গুদামটিতে ১ লাখ টন র–সুগার (চিনি তৈরির কাঁচামাল) ছিল। আগুনে গুদামটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পোড়া চিনির বর্জ্য পড়ে কর্ণফুলীর পানি দূষিত হয়। মরে ভেসে উঠতে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ জলজপ্রাণী।
এস আলম গ্রুপের সুগার মিলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে পুঁজি করে একটি চক্র চিনির বাজার অস্থির করে তোলার একটি প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রশাসনের পদক্ষেপে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। রোজার ঠিক সপ্তাহ খানেক আগে চিনির মিলের এ দুর্ঘটনায় কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়। অবশ্য এরই মাঝে স্বস্তির খবর দেয় মিল কর্তৃপক্ষ। গতকাল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শনে গেলে এস আলম কর্তৃপক্ষ এই স্বস্তির খবর দেয়। এস আলম গ্রুপের ডিরেক্টর এবং ডিজিএম জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর তারা গুদামের ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এতে দেখা গেছে, র সুগারের উপরের দিকে এক দুই লেয়ার পুড়ে গেলেও ভেতরে আগুন যায়নি। ফলে গুদামের অন্তত ৮০ শতাংশ র সুগারই ব্যবহার করা যাবে। তারা দাবি করেছেন, ১০ থেকে ২০ শতাংশ র সুগার পুড়ে নষ্ট হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান প্রথমে তাদেরকে কর্ণফুলী নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধের নির্দেশ দেন এবং ইউএনও’র উপস্থিতিতে নদীমুখী দুইটি ড্রেন বন্ধ করে দেন। তাদেরকে বড় গর্ত খুঁড়ে তাতে বর্জ্য ফেলতে এবং পরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডাম্পিং করার নির্দেশ দেন।
গুদামে রক্ষা পাওয়া চিনি ব্যবহারের আগে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে বলে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, তাদেরকে আবেদন করতে বলেছি। তারা আবেদন করলে আমরা নমুনা সংগ্রহ করে তা বিএসটিআই এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাবো। পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর র–সুগারের খাদ্যমান ঠিকঠাক থাকলে আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানাবো। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই কেবলমাত্র তাদেরকে এই চিনি প্রক্রিয়াজাত করতে দেয়া হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষে এখনই এই চিনি প্রক্রিয়াজাত করার অনুমোদন দেয়ার সুযোগ নেই বলেও আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান জানিয়েছেন।
গতরাতে দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে জেলা প্রশাসক বলেন, অগ্নিকাণ্ডে চিনি যদি না পুড়ে সেটি অবশ্যই একটি স্বস্তির খবর। তবে তার থেকে জরুরি হচ্ছে মান পরীক্ষা। খাদ্যগুণ এবং মান ঠিকঠাক না থাকলে এই চিনি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। তিনি নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা হয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, নদীতে কাউকে কোনো বর্জ্য ফেলতে দেয়া হবে না।
এদিকে চট্টগ্রামের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, গতকাল সকালেও নদীতে বর্জ্য ফেলা হয়েছে। তবে নদীর পানিতে অঙিজেনের মাত্রা আগেরদিনের চেয়ে বেড়েছে। গতকাল নদীতে অঙিজেনের মাত্রা ৩.৭৫ পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এটি ৪ থেকে ৬ মাত্রায় না আসলে নদী জলজপ্রাণীর জন্য বাসযোগ্য থাকবে না। শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ গতকালও নদীতে মাছসহ জলজ প্রাণী মারা যাওয়ার কথা জানান। তবে আগের দিনের চেয়ে পরিমাণে কমেছে বলেও জানান।
এস আলম রিফাইন্ড সুগার মিলস লিমিটেডের ডিজিএম মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের উদ্বৃতি দিয়ে আমাদের পটিয়া প্রতিনিধি শফিউল আজম জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যে মিলে পুরোদমে চিনি উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। রোজার মাস সামনে রেখে মিলের চারটি গুদামে চার লাখ টন অপরিশোধিত চিনি মজুদ করা হয়েছিল। গত সোমবার সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড তিনদিনের চেষ্টায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানান তিনি।
এস আলম সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মিলে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও থাইল্যান্ড থেকে কাঁচামাল এনে দুটি প্ল্যান্টে পরিশোধন করা হয়। এর মধ্যে প্ল্যান্ট–১ এর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৯০০ টন এবং প্ল্যান্ট–২ এর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ টন। থাইল্যান্ড ও ফ্রান্সের প্রযুক্তি এবং কারিগরি সহায়তায় কারখানাটি পরিচালিত হয়।












