সিয়ামের জন্য এ বছরটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ সে এবার অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকের ধাপ পেরিয়ে সে এখন শিক্ষাজীবনের এক নতুন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। ফলাফল প্রকাশের দিন থেকেই তার মনে এক ধরনের আনন্দ ও দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করছিল। অষ্টম শ্রেণি মানেই শুধু নতুন বই নয়, বরং চিন্তা, মনন ও আত্মগঠনের নতুন এক শুরু। ক্লাস টিচার বলেছে অষ্টম শ্রেণিতে ভালো রেজান্ট করতে না পরলে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে দেবে না। তাঁকে যে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তেই হবে। তাই অষ্টম শ্রেণির প্রতি তাঁর বেশ আগ্রহ।
নতুন বই বিতরণের দিনটি ছিল সিয়ামের কাছে অনেক দিনের অপেক্ষার ফল। সেদিন ভোরেই তার ঘুম ভেঙে যায়। জানালার বাইরে নরম রোদের আলো, পাখির কিচিরমিচির আর সকালের শান্ত পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে তার মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটি যেন অন্যরকম। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে নাশতা শেষ করে সে স্কুলের উদ্দেশে রওনা হয়। অন্যদিন হলে তাঁকে ঘুম থেকে তুলতেই মায়ের গলদঘর্ম অবস্থা। গলা শুকিয়ে কাঠ।
স্কুল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেই সিয়াম এক উৎসবমুখর পরিবেশের মুখোমুখি হয়। সহপাঠীরা সবাই নতুন ক্লাসের আনন্দে উচ্ছ্বসিত। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে, কেউ নতুন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের নাম শুনে কৌতূহল প্রকাশ করছে। শিক্ষক–শিক্ষিকারাও ছাত্রদের উৎসাহিত করছেন নতুন বছরের জন্য।
সিয়াম তার বন্ধু রিফাত, তন্ময়, হাসিব ও নাবিলের সঙ্গে বই নেওয়ার লাইনে দাঁড়ায়। লাইনে দাঁড়িয়েই শুরু হয় নতুন শ্রেণির পাঠ্যসূচি নিয়ে আলোচনা।
–শুনেছি অষ্টম শ্রেণির গণিত একটু কঠিন, হাসিব বলল।
–কঠিন হলেও নিয়মিত পড়লে সব সহজ হয়,’ রিফাত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিল।
তন্ময় বলল,
–আমরা সবাই মিলে পড়লে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
বন্ধুদের কথায় সিয়ামের মন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, একসঙ্গে এগিয়ে চলার শক্তি আলাদা।
অবশেষে সিয়ামের হাতে তুলে দেওয়া হলো নতুন বইয়ের গোছা। ঝকঝকে মলাট, সুশৃঙ্খল ছাপা অক্ষর আর নতুন কাগজের পরিচ্ছন্ন গন্ধ তাকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে তোলে। প্রতিটি বই যেন নতুন নতুন প্রশ্ন, চিন্তা ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। সিয়ামের মনে হলো, এই বইগুলোর পাতায় পাতায় লুকিয়ে আছে তার আগামী দিনের প্রস্তুতি।
বই হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সে মাঠের একপাশে বসে বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। বিজ্ঞান বইয়ের ছবিগুলো দেখে কেউ বিস্মিত হলো, ইতিহাস বইয়ের অধ্যায় দেখে কেউ কৌতূহলী হয়ে উঠল। এই মুহূর্তে সবার মুখেই একই হাসি নতুন শেখার আনন্দ।
বাড়ি ফেরার পথে সিয়ামের কাঁধে বইভর্তি ব্যাগটি কিছুটা ভারী মনে হলেও তার মন ছিল আশ্চর্য রকম হালকা। কারণ সে জানত, এই ভারই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিকেলে পড়ার টেবিলে বসে সে একে একে সব বইয়ের প্রথম পাতায় নিজের নাম লিখল। তারপর সে স্থির করল, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে পড়াশোনা করবে এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের কথা মেনে চলবে।
নতুন বই পাওয়ার এই আনন্দ সিয়ামকে একটি গভীর উপলব্ধি এনে দিল শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। প্রতিটি নতুন শ্রেণি, প্রতিটি নতুন বই আমাদের জীবনে দায়িত্ব ও স্বপ্নের পরিধি আরও বড় করে দেয়।
এই নতুন বইয়ের হাত ধরেই শুরু হলো সিয়ামের আরেকটি যাত্রা জ্ঞানার্জন, আত্মনির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ গঠনের পথে।






