দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ

সেনাপ্রধানের সতর্কবার্তা

| বুধবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ at ৬:২১ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষ্যে ২৫ ফেব্রুংয়ারি রাওয়া ক্লাবে ২০০৯ সালে পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাৎবরণকারী সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান ওয়াকারউজজামান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ হয়ে উঠেছে। তিনি নিজেরা কাদাছোড়াছুড়ি, মারামারি ও কাটাকাটি করলে দেশ ও জাতির স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন। এই দেশ আমাদের সবার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই সুখেশান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি।’

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকারউজজামান। তিনি বলেন, ‘দেশে এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপের পেছনে কিছু কারণ আছে। প্রথম কারণটা হচ্ছে যে আমরা নিজেরা হানাহানির মধ্যে ব্যস্ত। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গারে ব্যস্ত। এটা একটা চমৎকার সুযোগ অপরাধীদের জন্য। যেহেতু আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি, তারা খুব ভালোভাবেই জানে যে এই সময়ে যদি এই সমস্ত অপরাধ করা যায়, তাহলে এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সেই কারণে এই অপরাধগুলো হচ্ছে। আমরা যদি সংগঠিত থাকি, একত্রিত থাকি, তাহলে অবশ্যই এটা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’

জেনারেল ওয়াকারউজজামান বলেন, ‘আজকে পুলিশ সদস্য কাজ করছে না। একটা বড় কারণ হচ্ছে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা। অনেকে জেলে। র‌্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই প্যানিকড (আতঙ্কিত)। বিভিন্ন দোষারোপ, গুমখুন ইত্যাদির তদন্ত চলছে। অবশ্যই তদন্ত হবে। দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এমনভাবে কাজটা করতে হবে, যেন এই অর্গানাইজেশনগুলো আন্ডারমাইন না হয়। এই অর্গানাইজেশনগুলোকে যদি আন্ডারমাইন করে আপনারা মনে করেন যে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করবে, সবাই শান্তিতে থাকবেন, এটা হবে না। সেটা সম্ভব না। আমি আপনাদের পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি।’

এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীর নয় উল্লেখ করে সেনাপ্রধান বলেন, ‘দুই লক্ষ পুলিশ আছে। বিজিবি আছে, র‌্যাব আছে, আনসারভিডিপি আছে। আমার আছে হচ্ছে ৩০ হাজার সৈন্য। এদেরকে আমি এই যে একটা বিরাট ভয়েড (শূন্যতা), আমি এই ৩০ হাজার সৈন্য দিয়ে আমি কীভাবে এটা পূরণ করব? ৩০ হাজার থাকে, আবার ৩০ হাজার চলে যায় ক্যান্টনমেন্টে, আরও ৩০ হাজার আসে। এটা দিয়ে আমরা দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

এ প্রসঙ্গে আলোচনায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারউজজামান আরও বলেন, ‘এখানে যেসব উচ্ছৃঙ্খল কাজ হয়েছে, সেটা আমাদের নিজস্ব তৈরি। এটা আমাদের নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারড, আমরা নিজেরা এইগুলো তৈরি করেছি। এই বিপরীতমুখী কাজ করলে দেশে কখনো শান্তিশৃঙ্খলা আসবে না, এই জিনিসটা আপনাদের মনে রাখতে হবে।’

দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আশাবাদ জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারউজজামান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেশে একটা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশনের জন্য (সামনের) দিকে ধাবিত হচ্ছি। তার আগে যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, অবশ্যই সরকার এদিকে হেল্প করবে।’

সেনাপ্রধান ওয়াকারউজজামান বলেন, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো দেশ ও জাতির শান্তি নিশ্চিত করা এবং তারপর সেনানিবাসে ফিরে যাওয়া। তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাহায্যের কথাও উল্লেখ করেন, যিনি দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। সেনাপ্রধান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় হানাহানি না করার প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করেন, পরে যেন কেউ না বলেন যে আগেই সতর্ক করা হয়নি। সেনাবাহিনীর প্রতি বিদ্বেষ না দেখিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা ভালো উপদেশ গ্রহণ করতে প্রস্তুত, আমাদের সাহায্য করুন, আক্রমণ নয়।”

বিশ্লেষকরা বলেন, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতানৈক্য, বিভেদ, ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বসংঘাতসংঘর্ষ, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিভিন্ন গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র, গুজব, বিভ্রান্তিসব মিলিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ও উদ্বেগ কাজ করছে। নানা কারণে অন্তর্বর্তী সরকারও দৃঢ়তা দেখাতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম নিয়ামক শক্তি সেনাবাহিনী প্রধানের বক্তব্য আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।

তাঁরা বলেন, সেনা দিবসে সেনাপ্রধানের দেওয়া ১৭ মিনিটের এই বক্তব্যকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, রাজনৈতিক দল, মবভায়োলেন্সের হোতা, ক্ষমতাচ্যুত পক্ষ, এমনকি দেশের ভেতর ও বাইরের ইউটিউবারদের জন্য ‘ম্যাসেজিং স্পিচ’ হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। আজ তিনি স্পষ্ট ও নির্ভীকভাবে সেই কথাগুলো উচ্চারণ করেছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি ‘সহায়ক কোর্স’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে