দেশের ইস্পাত শিল্পে চট্টগ্রামের অনন্য অবদান

রেজাউল করিম স্বপন | মঙ্গলবার , ৩১ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধস্ত দেশের অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে নির্মাণ সামগ্রীর অপ্রতুলতার জন্য কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না। তখন বিদেশ হতে নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করে অতি জরুরি কনস্ট্রাকশনের কাজগুলো সম্পন্ন করা হতো। আবার বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রতুলতার কারণে নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করাও ছিল দুরূহ। এই প্রেক্ষাপটে দেশের কিছু দেশপ্রেমিক সাহসী শিল্পপতি এগিয়ে আসেন নির্মাণ সামগ্রীর তৈরীর শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য। যার মধ্যে অন্যতম হলো ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প। পরে এগিয়ে আসে দেশের টাইলস কাচ সিরামিকসহ অন্যান্য ভারি শিল্প উদ্যোক্তরা। আরো পরে দেশের আবাসন খাত ও সরকারের অবকাঠামো নির্মাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, রং, ইট, বালুসহ ২৬৯টি উপখাত। যার মধ্যে রড, সিমেন্ট, সিরামিক ও রং হলো বৃহৎ শিল্প। বর্তমানে রড, সিমেন্ট ও সিরামিক পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে গর্বের বিষয় হলো সিরামিক, টাইলস ও রং সামান্য আমদানি হলেও রড ও সিমেন্টে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। সম্ভাবনাময় হওয়ায় দেশে রড ও সিমেন্টএই দুই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। হয়েছে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও। এখনো নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে। ইস্পাত খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে। অন্যদিকে রং শিল্পে বিদেশি প্রতিষ্ঠান আছে আটটি। বর্তমানে তারাই রঙের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

দেশে সরকারি প্রকল্প ও আবাসন খাতের উপর ভর করে প্রতিবছর বাড়ছে ইস্পাতের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে দেশে গড়ে উঠেছে ৩০০টি বেশি রিরোলিং মিল। বছরে ন্যূনতম ১০ হাজার মেট্টিক টন রড উৎপাদন করে, এমন কারখানার সংখ্যা প্রায় ৫২। এসব কারখানাই মোট উৎপাদনের ৯৮% রড উৎপাদন করে। এর বাইরে রয়েছে ফ্ল্যাট স্টিল বা ঢেউটিনসহ পাত উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানা। ইস্পাত খাতে ছোট ও সনাতনী কারখানার সংখ্যাও অনেক। জানা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ইস্পাত পণ্যের বাজার ছিল প্রায় ৫৫,০০০ কোটি টাকা (USD ৬.২ বিলিয়ন) এবং উৎপাদন ক্ষমতা ১১ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি, যা দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে ১৪.৮৪% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ৪টি কোম্পানি (BSRM, AKS, GPH, KSRM) বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রেখে চলেছে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারতের গুজরাটের একদল কাপড় ব্যবসায়ী নতুন ব্যবসার সন্ধানে এসেছিলেন করাচি ও ঢাকায়। এই দলে ছিলেন গুজরাটের আম্রেলি জেলার দাউদি বোহরা সমপ্রদায়ের আলীভাই খানভাইয়ের পাঁচ সন্তান। ব্যবসার ফাঁকে তাঁদেরই একজন আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালা প্রথম ঘুরতে আসেন চট্টগ্রামে। এখানে এসে আয়রনসমৃদ্ধ খাওয়ার পানির স্বাদে মজে যান। পানির স্বাদে ঢাকাকরাচি নয়, চট্টগ্রামেই ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এই সিদ্ধান্তই শুধু চট্টগ্রাম নয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রড শিল্পের গোড়াপত্তন করেছিল। এক বছরের মাথায় স্ক্রু তৈরির কারখানা দিয়ে বসলেন চট্টগ্রামে। জোবেদা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নামে এই কারখানায় স্ক্রু, কোদালসহ হস্তচালিত লোহার নানা যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হতো। ১৯৫১ সালে যখন এই কারখানা গড়ে তোলেন সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো রড তৈরির কারখানা ছিল না। আকবর আলী আফ্রিকাওয়ালার বড় ভাই তাহের আলী পরামর্শ দিলেন রড কারখানা গড়ে তোলার। গুজরাটি ব্যবসায়ী হিসেবে আকবর আলী আফ্রিকাওয়ালা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলেন না। কারখানা নির্মাণের জন্য কলকাতা থেকে একজন দক্ষ কারিগর আনা হলো। সেখান থেকে আনা কাঠের প্যাটার্ন দিয়ে ঢালাই করে কারখানার যন্ত্রপাতি বানানো হয়। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হলো দক্ষ শ্রমিক। ১৯৫২ সালের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ শিল্প এলাকায় এভাবে সনাতন পদ্ধতিতে রড তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হলো। যদিও এর অল্প কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে মোহাম্মদী আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কস লিমিটেড নামে কারখানার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে ইস্পাত শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এটি ছিল দেশভাগের পর এই অঞ্চলের প্রথম রড তৈরির কারখানা। ঐ কারখানার পাশেই আকবর আলী আফ্রিকাওয়ালার তিন ভাই মিলে গড়ে তোলেন ইস্ট বেংগল স্টিল রি রোলিং মিলস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটির নাম বদলে হয় বাংলাদেশ স্টিল রিরোলিং মিলস বা বিএসআরএম। তাদের দেখানো পথ ধরেই গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় প্রায় ১০টি ইস্পাত কারখানা গড়ে ওঠে। শুরুর দিকে কারখানা দুটির মধ্যে মোহাম্মদী আয়রন অ্যান্ড স্টিল ওয়ার্কস এখন আর নেই। সেই কারখানাটিসহ ষাটের দশকে চালু হওয়া পাঁচটি কারখানা কিনে নেয় ইস্ট বেঙ্গল বা বিএসআরএম গ্রুপ। এই গ্রুপ বর্তমানে দেশে ইস্পাত খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৭ সালে দেশে প্রথম আধুনিক ৬০ গ্রেড রড উৎপাদন করে এবং ২০০৮ সালে বহুতল ভবন নির্মাণে উচ্চশক্তির রড এক্সট্রিম ৫০০ ডব্লিউ বাজারজাত শুরু করে।

এদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক দশক পর ইস্পাত খাতের কারখানা নির্মাণে লাইসেন্স নেওয়ার প্রথা তুলে দেওয়া হয়। সে সময় সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙাশিল্পের উত্থান ঘটে। জাহাজভাঙায় যুক্ত হন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। রড তৈরির কাঁচামাল ছিল এই জাহাজভাঙার প্লেট ও লোহার টুকরো। জাহাজভাঙা শিল্পের কারণে সীতাকুণ্ড ও নাসিরাবাদে ছোট ছোট কারখানা গড়ে তোলেন উদ্যোক্তারা। এসব কারখানায় ৪০ গ্রেডের রড তৈরি হতো। কারখানাগুলো ছিল সনাতন। আবার ইস্পাতের মধ্যবর্তী কাঁচামাল বিলেট তৈরির কারখানাও ছিল চট্টগ্রামে। ১৯৬৭ সালে চালু হওয়া চিটাগাং স্টিল মিলস কারখানায় ঢেউটিন ও ইস্পাত পাতের পাশাপাশি বিলেটও উৎপাদন হতো। ১৯৯৯ সালে সরকারি এই কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেলেও তার আগেই বেসরকারি খাত এগিয়ে আসে। ১৯৯৬ সালে বিএসআরএম তৎকালীন বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ বিলেট তৈরির কারখানা গড়ে তোলে।

বর্তমানে সম্ভাবনাময় হওয়ায় ইস্পাত খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ইস্পাতপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জাপানের নিপ্পন স্টিল অ্যান্ড সুমিতমো মেটাল বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। গত বছর নিপ্পনের পরিচালক নমুরা ইউচি ঢাকায় এসে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সঙ্গে ১০০ একর জমি ইজারা নেওয়ার চুক্তি করেছে। যৌথ বিনিয়োগে নিপ্পনের ইস্পাত কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হবে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। যদিও বিদেশি বিনিয়োগ দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের অভিমত, নির্মাণ কাজের ইস্পাত পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশে প্রতিবছর চাহিদা বাড়লেও বিদ্যমান কারখানাগুলো উৎপাদন সমপ্রসারণ করছে এবং তাদের সেই সক্ষমতাও রয়েছে। তাই এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নেই। কারণ দেশে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো নির্মাণে দেশীয় উৎপাদিত টেকসই পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। যার গুণগত মান বিশ্বের সমপর্যায়ের। সেই প্রেক্ষিতেই ইস্পাত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানান, ইস্পাত খাতের কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম হওয়ার মূল কারণ চট্টগ্রাম বন্দর। ইস্পাতের কাঁচামাল আমদানি করতে দরকার বন্দরসুবিধা। এই ভারী কাঁচামাল যাতে দ্রুত ও সহজে কারখানায় নেওয়া যায় সে জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশির ভাগ কারখানা গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা। গত এক দশকে যেসব কারখানা সমপ্রসারণ হয়েছে, তাও চট্টগ্রামে। সেজন্য চট্টগ্রামকে ইস্পাত শিল্পের রাজধানী হিসাবেও উল্লেখ করা যায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি
পরবর্তী নিবন্ধছালেহ আহমদ চৌধুরীর শিল্পোদ্যোগ-শিক্ষা বিস্তারে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা